জন্মদিনের শুভেচ্ছা খসে পড়া আশার ফুল

বাংলাদেশ ক্রিকেটের বয়স সময়ের হিসেবে খুব দীর্ঘ নয় কিন্তু এই অল্প সময়ে বিশ্ব ক্রিকেটে যে কয়েকটি রেকর্ডের ধারক, বাহক বাংলাদেশ ক্রিকেট তারমধ্যে অন্যতম রেকর্ডটি প্রায় দুই দশক আগে যেটি এখনো অক্ষত রয়েছে মাত্র ১৭ বছর ৬১ দিন বয়সে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০১ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেন আমাদের বাংলাদেশ ক্রিকেটের উত্থানের সময়কার অন্যতম ফ্রন্টলাইন সৈনিক মোহাম্মদ আশরাফুল..!



১৯৮৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকায় মোহাম্মদ আশরাফুলের জন্ম আজকে তাঁর ছত্রিশতম জন্মবার্ষিকী যদিও পাসপোর্টের তাঁর জন্মতারিখ সেপ্টেম্বর ৯..!

নব্বইয়ের দশকের জন্ম গ্রহণ করা শিশুরাই হয়ত সর্বশেষ যারা আশরাফুল বা প্রিয় অ্যাশকে ভালোভাবে উপভোগ করতে পেরেছে হালের মুশফিক,তামিম,সাকিবের অসাধারণ সব পারফরম্যান্সের ভীড়ে হয়ত আশরাফুলের ২৪ গড়ের টেস্ট ক্যারিয়ার কিংবা ২২ গড়ের ওয়ানডে ক্যারিয়ার কিছুই না কিন্তু আমরা যারা প্রথম ক্রিকেটের প্রেমে পড়েছিলাম যে কেউই স্বীকার করবে আমরা আশরাফুল,মাশরাফিদের খেলা দেখেই প্রথম প্রেমে পড়েছিলাম..!

অভিষেক সবচে কম বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড অক্ষত এখনো।ছবি : espncricinfo


৮ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে অভিষেক এবং অভিষেকেই সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি করার রেকর্ড গড়েন মোহাম্মদ আশরাফুল তিনি প্রথমে সফলতা খুব তাড়াতাড়ি পেলেও খুব শীঘ্রই ফর্মহীনতার কারণে দল থেকে বাদ পড়েন এরপরে তিনি যখন আবার জাতীয় দলের হয়ে ফিরে আসে তখন তিনি ভারতের বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ইনিংসের ১৫৮* রেকর্ডটি নিজের করে নেন যেই রেকর্ডটি টিকে ছিল প্রায় ১২ বছর এবং সেটি প্রথম তাঁর দ্বারাই ভাঙ্গা সম্ভব হয়েছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ ১৯০ করে যদিও ওই ইনিংসেই তাঁর সতীর্থ মুশফিক বাংলাদেশের হয়ে প্রথম দ্বি শতকের রেকর্ডের সাথে সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ড নিজের করে নেন যদি ওইদিন ভাগ্য আশরাফুলকে আরেকটু সহায়তা করতো হয়তবা বাংলাদেশের হয়ে প্রথম দ্বি শতক হাঁকানো খেলোয়াড় হতেন তিনি..টেস্ট ক্রিকেটে ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৭ এবং ৩৭ রানের ইনিংসের মধ্য দিয়ে তাঁর অধিনায়কত্বের শুরু এবং একই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করে বাংলাদেশের হয়ে সর্বপ্রথম টেস্টে চারটি সেঞ্চুরির মালিক হন তাঁর নাতিদীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে ৬১ টি টেস্ট খেলে ২৪.০০ ব্যাটিং গড়ে ৫টি শতক এবং ৮টি অর্ধশতকের সাহায্যে ২৭৩৭ রান করেন যা বাংলাদেশের হয়ে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ..!
তাঁর টেস্ট বোলিং ক্যারিয়ারে তিনি পার্টটাইমার হিসেবেই সার্ভিস দিয়েছেন তিনি ডানহাতি লেগব্রেক বল করতেন ক্যারিয়ারে প্রাপ্ত ২১ উইকেটের মধ্যে ২০০৮ সালে দঃ আফ্রিকা সফরে দুই ড্রপে বলে করে এভিডি ভিলিয়ার্সকে কট এন্ড বোল্ডটি বাংলাদেশের যেকোনো ক্রিকেট প্রেমীর ঠোঁটের কোণায় এক টুকরো মৃদু হাসি এনে দেবে নিঃসন্দেহে..!

একসময়ের বাঙালির আশার ফুল



১১ এপ্রিল ২০০১ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয় এবং তিনি ওই ম্যাচে ৯ রান করেন এবং বাংলাদেশ ও হারার স্বাদ গ্রহণ করে হয়ত মোহাম্মদ আশরাফুলের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি বর্ণিল ছিল ওয়ানডে ক্যারিয়ারে যদিও ১৭৭ ম্যাচ খেলে ৩টি সেঞ্চুরি এবং ২০ টি অর্ধশতকের সাহায্যে ২২.২৩ গড়ে ৩৪৬৮ রান কখনোই তাঁর পক্ষে কথা বলেনা বা এই নগন্য রানগুলোও কখনো বলবেনা তিনি কতটা নান্দনিক ছিলেন.. ব্যাক্তিগতভাবে ২০০৩ বিশ্বকাপে অসফল হলেও ২০০৭ বিশ্বকাপে আমার মত এমেচার দর্শকগণ মাত্রই তাঁর জন্য টিভি সেটের সামনে বসেছি কিংবা বিশ্বকাপে ভারত এবং তৎকালীন এক নম্বর দল দঃ আফ্রিকা বধ দেখেছি..ভারতের সাথে নবাগত কিশোররা তামিম, মুশফিক কিংবা সাকিব সফল হলেও আশরাফুল যে অপরাজিত ২৪ বলে ৮ আমার শৈশব মনে ওই জয়ের চেয়ে বেশি তৃপ্তির ছিলো নিঃসন্দেহে.. ওই বিশ্বকাপে দঃ আফ্রিকার বিরুদ্ধে আন্দ্রে নীলের বলে আউট হওয়ার আগে ১২টি বাউন্ডারির সাহায্যে ৮৩ বলে ৮৭ রান করেন যেটি বাংলাদেশের জয়ের ভিত্তি গড়ে দেয় আর প্রথমবারের মতো সুপার এইটে পদার্পণ ছিল স্বপ্ন বাস্তব হওয়ার মতো আর রাজ্জাকের সাথে কনুই বাঁকা করে এবং মাটিতে সপাং সপাং হাঁটু বাঁকা করে পায়ের আঘাতের উদযাপন এখনো বাঙালি দর্শকপটে চিরস্মরণীয় এবং এক টুকরো সুখের সন্ধান ছিল..২০০৫ সালে কার্ডিফে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পন্টিংদের বধ করার ম্যাচে ম্যাকগ্রা,গিলেস্পে,ব্রাড হগদের তুলোধুনো করে ১০১ বলে ১১টি চারের মারে ১০০ করা যেন তার নান্দনিকতার ছোট্ট একটি উদাহরণই বটে বা ওই একই সিরিজে ট্রেমলেটের হ্যাট্রিক বলে স্ট্যাম্পে লাগা বলে আউট না হওয়া এরপর কলিংউডের বলে বোল্ড হওয়ার উপলক্ষ বাদ দিলে তিনি যতক্ষণ মাঠে ছিলেন ১১ চার ৩ ছয়ের সাহায্য ৫২ বলে ৯৩ রানের ইনিংসটি ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের ভয়ডরহীনভাবে আবির্ভূত হওয়ার প্রথম সংস্করণ ওই ইনিংসটি যেকোনো ক্রিকেট প্রেমীর মনেই লেগে থাকবে অসাধারণ সব হুক,গ্ল্যান্সের সমাহারের জন্য তার ওই ইনিংসটি এখনো আমার কাছে পছন্দের সব ফলের সমাহারে করা দোকান মনে হয়..তাঁর ক্যারিয়ারের ছোট ছোট অনেক ক্যামিও ইনিংস ছিল বিশাল বিশাল পরাজয়ের মধ্যে এক এক টুকরো শান্তি যেমনটা দিনের ক্লান্তিশেষে প্রেমিকার কোলে মাথা গোঁজাতে পাওয়া যায়.. দৃষ্টিনন্দন সব স্কুপগুলো মনে হতো ষোড়শী প্রেমিকার ঠোঁট থেকে মধু আহরণ..শট বলে ভয়ডরহীন হুকগুলো মনে হতো বাঘের খাঁচায় নিজের বুক নিজেই আঁচড় দিয়ে হুঙ্কার প্রদর্শন..হয়ত এখনকার বাচ্চাগুলো কখনো জানবেই না এই আশরাফুল কেমন ছিল তারা হয়ত সাকিব,তামিমদের বা হালের আকবর,হৃদয়দের নিয়ে চোখের অর্গাজম করবে কিন্তু আশরাফুল তিনি ছিলেন অনন্য, অনবদ্য এবং ভয়ডরহীনের মূর্ত প্রতীক..!
নাতিদীর্ঘ এই ওয়ানডে ক্যারিয়ারে হাত ঘুরিয়ে পেয়েছেন ১৮টি উইকেট..!

২০০৭ বিশ্বকাপের পর ভারত সিরিজের সমাপ্ত হওয়ার পরপরই সীমিত ওভারে ক্রিকেটে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দ্বিতীয় কনিষ্ঠতম অধিনায়ক হিসেবে নির্বাচিত হোন..!

১ সেপ্টেম্বরে ২০০৭ কেনিয়ার বিরুদ্ধে তাঁর অভিষেক ঘটে এবং একইমাসে অনুষ্ঠিত দঃ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গেইলের ওয়েস্ট ইন্ডিজদের বিরুদ্ধে ১৬৫ রান তাড়া করতে নেমে আফতাব আহমেদের সাথে ১০৯ রানের পার্টনারশিপ গড়ে তুলেন এবং ব্যাক্তিগতভাবে তৎকালীন রেকর্ড দ্রুততম ২০ বলে অর্ধশতক তুলে নেন এবং ৭টি চার এবং ৩টি ছয়ের মারে ২৭ বলে ৬১ রান করেন এবং দলকে জিতিয়ে ম্যান অব দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হোন..টি টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ২টি অর্ধশতকের সাহায্যে ২৩ ম্যাচে ১৯.৫৭ গড়ে ৪৫০ রান সংগ্রহ করেন আর হাত ঘুরিয়ে নেন ৮ উইকেট..!

ছোট এই জীবনে আইপিএলে এক ম্যাচ খেলে ৫ বলে ২ রান করেন..!

কিন্তু ২০১৩ সালে বিপিএলে ফিক্সিংয়ের কারণে শেষ হয়ে যায় ট্রয় নগরীর প্রধান ডিফেন্ডার হেক্টরের মতো অকালে ক্যারিয়ারের মৃত্যু.. হয়ত যখনই দেশকে কিছু দিতে চেয়েছিলেন এবং নিজের সর্বোচ্চ ধারাবাহিক পারফর্মেন্সের।শুরু করেছেন তখনই পতন ঘটেছে আমাদের আশরাফুলের আমার শৈশব হিরো অ্যাশের হয়ত তিনি কিংবদন্তি নয় কিন্তু আমার কাছে তিনি সবসময় একজন হিরো হিসেবেই থাকবে বলা হয়ে থাকে ভালোবাসতে কারণ লাগে না আর তিনি তো আমাকে আমার শৈশবে ক্রিকেটকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন কিভানে না ভালোবেসে পারি..শেষ করব রবী শাস্ত্রীর আশরাফুলকে নিয়ে করা উক্তি দিয়ে…
”নিজের সব বয়সে ওই বয়সী বিশ্ব ক্রিকেটারদের মধ্যে আশরাফুল সেরা, তাঁর তুলনা সে নিজেই”

সর্বশেষ শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট প্রথম তারকা মোহাম্মদ আশরাফুল.. আমার শৈশবের ভালোবাসা তোমাকে শুভ জন্মদিন.. সবসময় শুভ কামনা এবং আমি প্রতীক্ষায় থাকবো আরো একবার লাল-সবুজ জার্সিতে তোমাকে খেলতে দেখার আকাঙ্ক্ষায়…!🖤

শুভ জন্মদিন 98 লেখা ভরাট জার্সির ASHRAFUL..!❤

লেখক :সাইফুল ইসলাম সজীব, শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়