“আমার আবার জন্মোৎসব কিরে? আয় আয় আমার কাছে আয়”।

বঙ্গবন্ধু জন্মদিন পালন তত্ত্বে কখনো তেমন বিশ্বাসী ছিলেন না।বঙ্গবন্ধু তার জীবনের ৪৬২৮ দিন কারাগারে অন্তরীত ছিলেন,১৮ বার জেলে গিয়েছিলেন।৩১,৩২ ৪০,৪১,৪২,৪৩,৪৮,৪৯তম জন্মদিন কারাগারে কাটিয়েছেন।তাই তিনি জন্মদিনকে সাধারণভাবে নিতে পারেননি যেভাবে সাধারণ মানুষ পালন করে। স্বাধীনতার পূর্বে তিনি নিজের জন্মদিন পালন করতে পারতেন না দেশ পরাধীন বলে, আর স্বাধীন বাংলাদেশে উদযাপন করতেন না সাধারণ মানুষের দুর্দশা দেখে।তিনি জন্মদিনকে অন্যান্য দিনের মতই হিসেব করতেন। একটি উল্লেখ না করলে নয় যে ঘটনা থেকে জানা যাবে বঙ্গবন্ধু কি পরিমাণ উদাসীন ছিলেন জন্মদিন পালন নিয়ে :-
স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জন্মদিন কেটেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পুনঃগঠনের তাড়নায় অক্লান্ত পরিশ্রমে।অন্যান্যবারের মত ভুলেই গিয়েছিলেন তার জন্মদিন! কিন্তু তার নাছোড়বান্দা সমর্থকরা জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে না, তা কী হয়? সকালেই নেতাকর্মীরা পৌঁছে যান ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসার সেই আঙিনায়। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এসে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বললেন‘আমার আবার জন্মোৎসব কিরে? আয় আয় আমার কাছে আয়।’
বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন পালন তার বিভিন্ন সময়ে অভিব্যাক্তিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় জন্মদিন কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নয় নিজের কাজে মনোনিবেশ করা গুরুত্বপূর্ণ,দেশের মানুষের জন্য কাজ করা দরকারী।দেখে নেই বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ঘটা ঘটনাবলিঃ

প্রথম ঘটনা কারাগারের রোজনামচা থেকে প্রাপ্ত!
১৭ই মার্চ ১৯৬৭, শুক্রবারঃ

আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনদিন নিজে পালন করি নাই–বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। ‘আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস।’ দেখে হাসলাম। মাত্র ১৪ তারিখে রেণু ছেলেমেয়েদের নিয়ে দেখতে এসেছিল। আবার এত তাড়াতাড়ি দেখা করতে অনুমতি কি দিবে? মন বলছিল, যদি আমার ছেলেমেয়েরা ও রেণু আসত ভালই হত। ১৫ তারিখেও রেণু এসেছিল জেলগেটে মণির সাথে দেখা করতে।

ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি নূরে আলম আমার কাছে ২০ সেলে থাকে, কয়েকটা ফুল নিয়ে আমার ঘরে এসে উপস্থিত। আমাকে বলল,এই আমার উপহার, আপনার জন্মদিনে। আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। তারপর বাবু চিত্তরঞ্জন সুতার একটা রক্তগোলাপ এবং বাবু সুধাংশু বিমল দত্তও একটি শাদা গোলাপ এবং ডিপিআর বন্দি এমদাদুল্লা সাহেব একটা লাল ডালিয়া আমাকে উপহার দিলেন।

আমি থাকি দেওয়ানী ওয়ার্ডে আর এরা থাকেন পুরানা বিশ সেলে। মাঝে মাঝে দেখা হয় আমি যখন বেড়াই আর তারা যখন হাঁটাচলা করেন স্বাস্থ্য রক্ষা করার জন্য।

খবরের কাগজ পড়া শেষ করতে চারটা বেজে গেল। ভাবলাম ‘দেখা’ আসতেও পারে। ২৬ সেলে থাকেন সন্তোষ বাবু, ফরিদপুরে বাড়ি। ইংরেজ আমলে বিপ্লবী দলে ছিলেন, বহুদিন জেলে ছিলেন। এবারে মার্শাল ল’ জারি হওয়ার পরে জেলে এসেছেন, ৮ বৎসর হয়ে গেছে। স্বাধীনতা পাওয়ার পরে প্রায় ১৭ বৎসর জেল খেটেছেন। শুধু আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময় মুক্তি পেয়েছিলেন। জেল হাসপাতালে প্রায়ই আসেন, আমার সাথে পরিচয় পূর্বে ছিল না। তবে একই জেলে বহুদিন রয়েছি। আমাকে তো জেলে একলাই অনেকদিন থাকতে হয়েছে। আমার কাছে কোনো রাজবন্দিকে দেওয়া হয় না। কারণ ভয় তাদের আমি ‘খারাপ’ করে ফেলব, নতুবা আমাকে ‘খারাপ’ করে ফেলবে। আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, ২৬ সেলে যাবেন। দরজা থেকে আমার কাছে বিদায় নিতে চান। আমি একটু এগিয়ে আদাব করলাম। তখন সাড়ে চারটা বেজে গিয়েছে, বুঝলাম আজ বোধ হয় রেণু ও ছেলেমেয়েরা দেখা করার অনুমতি পায় নাই। পাঁচটাও বেজে গেছে। ঠিক সেই মুহুর্তে জমাদার সাহেব বললেন, চলুন আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলেমেয়েরা এসেছে। তাড়াতাড়ি কাপড় পরে রওয়ানা করলাম জেলগেটের দিকে। ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা আমি রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওঁকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলেমেয়েদের চুমা দিলাম। দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেটে থেকে। ও সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলে থেকেও।

আর একটা কেক পাঠাইয়াছে বদরুন, কেকটার উপর লিখেছে ‘মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে’। বদরুন আমার স্ত্রীর মারফতে পাঠাইয়াছে এই কেকটা। নিজে তো দেখা করতে পারল না, আর অনুমতিও পাবে না। শুধু মনে মনে বললাম, ‘তোমার স্নেহের দান আমি ধন্যবাদের সাথে গ্রহণ করলাম। জীবনে তোমাকে ভুলতে পারব না।’ আমার ছেলেমেয়েরা বদরুনকে ফুফু বলে ডাকে। তাই বাচ্চাদের বললাম, ‘তোমাদের ফুফুকে আমার আদর ও ধন্যবাদ জানাইও।’
ছয়টা বেজে গিয়াছে, তাড়াতাড়ি রেণুকে ও ছেলেমেয়েদের বিদায় দিতে হলো। রাসেলও বুঝতে আরম্ভ করেছে, এখন আর আমাকে নিয়ে যেতে চায় না। আমার ছোট মেয়েটা খুব ব্যথা পায় আমাকে ছেড়ে যেতে, ওর মুখ দেখে বুঝতে পারি। ব্যথা আমিও পাই, কিন্তু উপায় নাই। রেণুও বড় চাপা, মুখে কিছুই প্রকাশ করে না।

ফিরে এলাম আমার আস্তানায়। ঘরে ঢুকলাম, তালা বন্ধ হয়ে গেল বাইরে থেকে। ভোর বেলা খুলবে।




১৯৭১ এর ১৭ মার্চঃ
বঙ্গবন্ধুর ৫২তম জন্মদিন। সেসময়কার অস্থির সময়ে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের মানুষ বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়িতে এসেছিল,সেদিন তিনি আরো তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন “তাঁর জীবনটাই জনগণের জন্য। তাই তাঁর জীবন-মৃত্যু জনগণের জন্যই উৎসর্গীকৃত। জনগণের মুক্তিই যে তাঁর একমাত্র লক্ষ্য”।সেদিন বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে বলেন –

” তিনি জন্মদিন পালন করেন না। জন্মদিনে মোমবাতি জ্বালান না এবং কেকও কাটেন না”

১৭ মার্চ ১৯৭২ঃ
স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্ত হাওয়ায় জাতির জনকের প্রথম জন্মদিন। ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষের ভিড় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের আঙিনায়। বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এসে স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বললেন “আমার আবার জন্মোৎসব কিরে? আয় আয় আমার কাছে আয়”।১৭ মার্চ ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ভবিষ্যতে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ছুটি থাকিবে না’ শিরোনামে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গতকাল (বৃহস্পতিবার) বলেন যে, ভবিষ্যতে তাঁহার জন্মদিন আর সরকারী ছুটির দিন হিসেবে উদযাপিত হইবে না। এই দিনটি কঠোর শ্রম ও বৃহত্তর কল্যাণে আত্মনিয়োগের দিন হিসাবে পালিত হইবে।”বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিদেশ সফরে ভারত যান,তিনি ভারত থেকে আসার সময় ইন্দিরা গান্ধীকে দেশে আসার অনুরোধ করেন তার জন্মদিনে।তাঁর জন্মদিনে তিনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছে দুটো জিনিসের আবদার করেছিলেন।ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফর এবং সফরের আগেই ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেওয়া। ইন্দিরা গান্ধী দুটো কথাই রেখেছিলেন। ভারত সেনা প্রত্যাহার করে ১২ মার্চ। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য সরিয়ে সম্ভবত বাংলাদেশের জনগনের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার নিয়েছিলেন । ইন্দিরা গান্ধী আমন্ত্রণ রক্ষা করে ১৭ মার্চ বাংলাদেশে আসেন এবং তিনি জন্মদিন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুকে ফলমূল ও মিষ্টান্ন উপহার দেন।এদিন দেশের সবচেয়ে বড় জনসভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সেখানে ইন্দিরা গান্ধী বক্তৃতায় বলেন-

ফুল দিয়ে ইন্ধিরা গান্ধীকে বরণ বঙ্গবন্ধুর

‘আজকের দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদিন বটে। কারণ, আজ শেখ মুজিবুরের জন্মদিন। তিনি হলেন এদেশের মুক্তিদাতা। আমি তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। কামনা করি তিনি দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করুন।’


১৭ মার্চ ১৯৭৫ঃ
ভোর থেকে জাতির পিতাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য বাসভবন অভিমুখে ছিল জনস্রোত। বঙ্গবন্ধুর শেষ জন্মদিনে তার বাসভবনে কমপক্ষে ৫০ হাজার লোকের সমাগম হয় বিভিন্ন পত্রিকার ভাষ্যমতে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনতার নেতা,কোন সিরিয়াল বা প্রটোকল এড়ানো লাগতে না তার সাথে দেখা করতে।খুব ভোর হতে ৩২ নং রোডস্থ বাসভবনে নেতার সাক্ষাৎপ্রার্থীদের ভিড় শুরু হয়। ফুলের মালা, পুষ্পস্তবক,কেক, মিষ্টিসহ বিভিন্ন উপহার সামগ্রী নিয়ে জাতির জনকের বাসভবনে উপস্থিত হন এবং শুভেচ্ছা জানান, মঙ্গল কামনা করেন দেশের সর্বস্তরের জনগণ। সকাল ৭টা হইতে সোয়া ১১টা পর্যন্ত ৪ ঘণ্টা যাবৎ বঙ্গবন্ধু আগতদের সকলকে
(বাকশাল, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সর্বস্তরের জনগণ)সাক্ষাৎকার দেন ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।বঙ্গবন্ধু জন্মদিনে প্রাপ্ত পুষ্পস্তবকগুলো পাঠিয়ে দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, মরহুম তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক ও ভাষা আন্দোলনের শহীদানের মাজারে, শহীদ মিনারে এবং সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে। বঙ্গবন্ধু আগত সকলকেই দেশ গঠনে কঠোর পরিশ্রম করার উপদেশ দেন।সকাল ১১টার দিকে বঙ্গবন্ধু সমবেত সকলের উদ্দেশে বলেন-

‘আমার জন্মদিনে আমি ছুটি ঘোষণা করি নাই। তাই আজ আমি অফিসে যাইব, অল্পক্ষণের জন্য হইলেও অফিসের কাজ করিব।’

উপস্থিত সকলকে তিনি নিজ নিজ অফিসে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সকাল প্রায় সোয়া ১১টার সময় বঙ্গবন্ধু গণভবনের উদ্দেশ্যে বাসভবন ত্যাগ করেন।”
( ইত্তেফাক ১৮ মার্চ ১৯৭৫)

বঙ্গবন্ধু জন্মদিন পালনের চাইতে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা পছন্দ করতেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে জাতির জনকের জন্মদিনে যেখানে ছুটি থাকে, বঙ্গবন্ধু চাইতেন না তার জন্মদিনে কোন ছুটি থাকুক,দেশের মানুষের জন্য দেশ গড়ার কাজেই তিনি মনোনিবেশ করতে পছন্দ করতেন। আবারো সে উক্তিটি দিয়েই শেষ করি “আমার আবার জন্মোৎসব কিরে? আয় আয় আমার কাছে আয়”
দেশের মানুষের মুক্তি ছিল যার আজন্ম লালিত স্বপ্ন তার কাছে নিজ জন্মদিন অতি তুচ্ছ ঘটনা নয় কি?!? আজ দেশের যত্রতত্র যেভাবে মুজিবের শততম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হয়ত বেঁচে থাকলে কিছুই করতে দিতেন না বলতেন।বলতেন “এত টাকা আমার জন্মদিনে খরচ না করে দেশের মানুষের জন্য খরচ কর,আমার বাংলারে সোনার বাংলা বানায়া দে,এখনো আমার স্বপ্ন পূরণ করতে মেলা দূর যাইতে হইবো”



তথ্যসূত্র :
কারাগারের রোজনামচা – শেখ মুজিবুর রহমান- ২১০-১১ পৃষ্ঠা।
ইত্তেফাক ১৮ মার্চ ১৯৭৫
ইত্তেফাক ১৭ মার্চ ১৯৭২