ছাত্ররাজনীতির একাল সেকাল

মোয়াজ্জেম হোসেন সৈকতঃ

ইন্টারনেট থেকে যতদূর জানা যায়, উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনীতিতে ছাত্র রাজনীতি যোগ করে নতুন মাত্রা৷ পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতিতে পূর্ণতা পায় বিশ শতকে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে ছাত্রদের মোটামুটি অংশগ্রহণ থাকলেও ১৯২৮ সালে আগে বাঙালি ছাত্রদের কোনো নিজস্ব সংগঠন ছিল না। তখন কংগ্রেসের উদ্যোগে নিখিল বঙ্গ ছাত্র সমিতি নামে ছাত্রদের একটি সংগঠন গঠিত হয় । তারই ধারাবহিকতায় ১৯৩০ সালের ১২ জুলাই ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম ছাত্রদের একটি সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শহীদুল্লাহ্কে একটি মুসলিম ছাত্র সমিতি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৯৩২ সালে নিখিলবঙ্গ মুসলিম ছাত্র সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়৷


পুরো পাকিস্তানামলে ছাত্র সংগঠনগুলি পেশাজীবি সংগঠন হিসেবে ছাত্র সমাজের শিক্ষা ও শিক্ষা সংক্রান্ত দাবি বাস্তবায়নে কাজ করেছে। সংগঠনের ঘোষণাপত্র, গঠনতন্ত্রের চর্চা, নিয়মিত সম্মেলন এবং নেতৃত্ব নির্বাচনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বিদ্যমান ছিল। এর বাইরে নিজস্ব অবস্থান থেকে দেশ জাতি ও মানুষের স্বার্থে নিজস্ব ব্যানার থেকে ভূমিকা রেখেছে। ভাষার সংগ্রামে অংশ গ্রহণ, ‘৫৪ সালের যুক্ত ফ্রণ্ট নির্বাচনে হক-ভাসানী ও সোহওয়ার্দীকে ঐক্যবদ্ধকরতে এবং ১৯৬৮ সালের ছাত্র শিক্ষক ও শ্রমিকের দাবীসহ পূর্বপাকিস্তানীদের স্বাধীকার ও
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ১১ দফা ঘোষণা এবং ঐতিহাসিক ছাত্র গণ অভ্যূত্থান গড়ে উঠেছিল । অর্থাৎ পাকিস্তান আমলে দু-একটি ছাত্র সংগঠন কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করলেও অঙ্গ সংগঠন হিসেবে কাজ করেনি। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা অংশ গ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ গঠনে অসহায় মানুষের পুনর্বাসনে, কৃষকের বীজতলা  তৈরী এবং বীজ বিতরণের কাজ পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনের ব্যানার থেকে করেছে। ৫২ থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত  হচ্ছে ছাত্ররাজনীতির গৌরবময় সময়।


 একটা সময় ছিল যখন ক্লাসের ভালো ছাত্ররা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ত কারণ পিছনের সারির ছাত্ররা মনে করত ভালো ছাত্রদের দিয়ে যে কোন দাবি দাওয়া পূরন করিয়ে নেওয়া সহজ। অাগে ছাত্ররাজনীতিকে দেশ গঠনের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হত। তখন অনেক সংগঠনের নেতাকর্মীরা ফুল টাইম রাজনীতি করতো। অতীতের ছাত্রনেতারা বাড়ি থেকে টাকা এনে সংগঠনের কাজে ব্যবহার করতো অার বর্তমানের ছাত্রনেতারা রাতারাতি বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে যান। যে ছাত্রনেতারা একসময় ছেঁড়া স্যান্ডেল পায়ে দিয়ে মধুর ক্যান্টিনে যেত অাজ তারা  কোটি টাকার দামি গাড়িতে চড়ে বেড়ায়। বঙ্গবন্ধু ছাত্ররাজনীতি করার সময় পরিবার থেকে টাকা নিতেন। তাকে তার  বাবা এবং সহধর্মিণী বাড়ি থেকে টাকা পাঠাতেন। রাজনীতির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু পড়াশুনা করতেন। বঙ্গবন্ধুর বাব শেখ লুৎফুর রহমান বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ” বাবা রাজনীতি কর ভালো কথা কিন্তু পড়াশুনাটা চালিয়ে যেতে হবে”। কিন্তু বর্তমান ছাত্ররা মনে করে রাজনীতি করলে পড়াশুনা করা যাবে না। অার পড়াশুনা করলে রাজনীতি করা যাবে না।


এই দেশের ছাত্ররাজনীতিতে মূল বিভক্তি অাসে ১৯৭২ সালের জাসদ ছাত্রলীগ গঠনের মাধ্যমে। ছাত্ররাজনীতিতে অাবার অন্ধকার ঘনিয়ে অাসে ৭৫ এর ১৫ অাগস্টের কালো রাতের পর। পঁচাত্তর পরবর্তী  ছাত্ররাজনীতিতে অাবির্ভাব হয় ইলিয়াস বাহিনী, ওভি এবং নিরু বাহিনীর। জিয়াউর রহমানের সময়ে ছাত্রদের সমুদ্রের প্রমোদ ভ্রমনে নিয়ে গিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেওয়াতেন। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অস্ত্রের মহড়া শুরু হয়, ছাত্ররাজনীতিতে অর্থের ঝনঝনানি জিয়া শুরু করেন বাংলাদেশে। তবে ছাত্ররাজনীতিতে অাবার প্রাণ ফিরে অাসে এরশাদের বিরুদ্ধে সব ছাত্রসংগঠনের অান্দোলনের মাধ্যমে৷ 


নব্বই পরবর্তী ছাত্ররাজনীতিতে দলীয় লেজুড়বৃত্তি শুরু হয়। নব্বই পরবর্তী ছাত্ররাজনীতি এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে তৎকালীন বিচারপতি এবং  রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন অাহমেদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন ” শুধু মাত্র ছাত্রনেতা হয়ে ছাত্রজীবনেই যদি বাড়ি গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হওয়া যায় তাহলে ছাত্ররা কষ্ট করে পড়ালেখা করবে কেন? অাসলেইতো তাই। বর্তমান কোন পিতামাতা তার সন্তান রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ুক তা চান না। কারন ছাত্ররাজনীতি অার অাগের মত নাই। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির সবচেয়ে খারাপ দিক হলো অসৎভাবে টাকা উপার্জনের মোক্ষম সুযোগ,টেন্ডারবাজি ইত্যাদি। ছাত্ররাজনীতি হওয়া উচিত ছাত্রদের কল্যাণের স্বার্থে।  কিন্তু ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারনে গত ২৮  বছর ছাত্রনেতারা মূল দলের হয়ে কাজ করা শুরু করেছে যার কারনে ছাত্ররাজনীতি  তার অতীত গৌরব হারিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির অধঃপতনেনর কয়েকটা কারন হচ্ছেঃ

১।স্বাধীনতার পর জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের রাজনীতিতে মূল রাজনীতিবিদদের মত ছাত্র নেতাদেরও নৈতিক অবক্ষয় শুরু হয়।


২. নব্বইয়ের পর থেকে ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্বাচন না দেয়ার ফলে ছাত্র রাজনীতি অনেকটা বেকার হয়ে গেছে। নির্বাচন জিততে হলে ছাত্র নেতাদের সাধারণ ছাত্রদের কাছে আসতে হতো। নির্বাচণ বন্ধ হওয়ার পর ছাত্র নেতাদের সেই প্রয়োজনীয়তা না থাকায় ক্ষমতা বা পদ পেতে তারা দলের সাথে যোগাযোগ বাড়ায়।দলীয় নেতারা ছাড়া ছাত্রনেতাদের জবাবদিহিতার আর কোনো জায়গা তখন থাকে না৷


৩. অতীতে মেধাবী ও নিয়মিত ছাত্ররা রাজনীতি করতো এবং ছাত্রদের স্বার্থে কাজ করার একটা নৈতিকতা কাজ করতো। পরবর্তীতে পেশি শক্তির রাজনীতিতে মেধাবীরা অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং অনিয়মিত ছাত্ররা রাজনীতির দিকে ঝু্ঁকে পড়ে।


৪. রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ছাত্র নেতাদের বেশি ব্যবহার করার ফলে তাদের নিয়ন্ত্রনেও অনেক সময় ছাড় দেয়া হয়।


৫. পদ পেতে কিংবা পদ ধরে রাখতে দলীয়
লেজুড়বৃত্তি বৃদ্ধি পাওয়া।


৬. রাজনীতিকে ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া। যার ফলে বেড়ে যায় চাঁদা বাজি, টেন্ডারবাজিসহ পেশি শক্তি প্রদর্শন।


নানাবিধ কারণে এখন ছাত্র রাজনীতি কুল হারিয়েছে। ছাত্র রাজনীতির উপর অনাস্থা এখন ছাত্র রাজনীতিকে নিষিদ্ধের দাবিকেও জোড়ালো করছে। তবে যে দেশের স্বাধীনতাসহ সকল আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির গৌরবউজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে সেখানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয় বরং জাতীয় রাজনীতিসহ সার্বিক রাজনীতিতে বড়সর সংস্কার দরকার। ডাকসু’র মত অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়া এবং তা নিয়মিত করা। লেজুড়বৃত্তির চক্র থেকে বেড়িয়ে ছাত্র রাজনীতিকে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীর বদলে ছাত্রদের কল্যাণে ব্যবহার করতে হবে। ছাত্র নেতাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে মূল দলকে। তবেই হয়তো সুদিন ফিরে পাবে বর্তমানে পথ হারা ছাত্র রাজনীতি। সমৃদ্ধ হবে জাতীয় রাজনীতি।

লেখক : শিক্ষার্থী , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়