দৈনিক সংগ্রাম নিষিদ্ধ নয় কেন?

১৯৭১ সালে দৈনিক সংগ্রাম পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের মুখপাত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করতো… এ পত্রিকা মুক্তিযোদ্ধাদের দুষ্কৃতিকারী হিসেবে ঘোষণা করত আর রাজাকারদের দেশ প্রেমিক হিসেবে উল্লেখ করত। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও কিভাবে এই পত্রিকা এখনো এই দেশে চলে তা আসলে প্রশ্ন এসে যায়!
১৯৭১ সালের রাজাকারদের ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলে দৈনিক সংগ্রামের ও রাজাকারদের সহায়তা করার জন্য বিচার হওয়া উচিত… জামাত নেতাদের বক্তব্য , মুক্তিযোদ্ধাদের হিন্দু আখ্যা দিয়ে কিংবা মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রথম পাতায় প্রধান শিরোনাম করে চরম অপপ্রচার চালাতে এই পত্রিকা…যে সময় বাংলার সাহসী সাংবাদিকরা কলম দিয়ে যুদ্ধ করেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা স্বাধীনতাকামী মানুষের বিপক্ষে,রাজাকার ও পাকিস্তানীদের পক্ষে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তমূলক খবর ছেপে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। সে সময়ে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক ছিলেন-আখতার ফারুক। সাংবাদিকতার নামে দৈনিক সংগ্রামে কুৎসা, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র ছাড়া আর পাকিস্তানের দালালী করা তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল..৭১ সালের অস্থির সময়ে দৈনিক সংগ্রাম এর মতো তাবেদারী বা দালালি অন্য কোন পত্রিকা করেনি… ওদের মিথ্যাচার পাকিস্তানি সংবাদপত্রের চাইতে নোংরা ও ভয়াবহ ছিল।আসুন স্বচক্ষে দেখে নেই দৈনিক সংবাদের ভূমিকা ১৯৭১ সালে…

সংগ্রামের বেহায়াপনার নিদর্শন

গোলাম আযমের পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার চেষ্টা

২৫ মার্চের গণহত্যা নিয়ে একটি শব্দ লেখা হয়নি দৈনিক সংগ্রামে।২৬ শে মার্চ বাংলাদেশে কোন পত্রিকা বের হয়নি শুধুমাত্র দৈনিক সংগ্রাম বের হয়েছিল, এমনকি সব সরকারি পত্রিকা সেদিন বন্ধ ছিল।এরকম অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যেও সংগ্রাম পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো নমাস পাকিস্তানীদের দালালী করে গেছে দৈনিক সংগ্রাম
মুক্তিযুদ্ধের নমাস পাকিস্তানিদের হত্যাকাণ্ডে এভাবেই মদদ দিয়েছে দৈনিক সংগ্রাম

*৮ এপ্রিল:

২৫ শে মার্চে রোকেয়া হলে নারকীয় তান্ডব নিয়ে দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদকীয় পাতায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আড়াল করতে যেন কিছুই হয়নি এমন সংবাদ প্রকাশ করে।

“রোকেয়া হলে কিছুই হয় নি, অন্য হল থেকে দু’চারটা ছেলে এসে আশ্রয় নিয়েছিল মাত্র……..”

*২৫ মার্চের গণহত্যাকে ভারতীয় মিথ্যা অপপ্রচার বলে আখ্যা দিয়ে দৈনিক সংগ্রাম ভারতীয় অপপ্রচারের ব্যর্থতা শিরোনাম দিয়ে সম্পাদকীয় পাতায় লিখলো-

“পূর্ব পাকিস্তানের সব গুরুত্বপূর্ণ শহর
সামরিকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থেকে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরে এলেও ভারতীয় বেতারে এখনও সেগুলোয় যুদ্ধ চলছে।”

ভাতৃদ্বন্দ্বে উদ্যত জাতি শক্রর বিরুদ্ধে গলা মিলিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে। নুতন করে জাতীয় মীর জাফরদের (মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী আতীয় নেতৃবৃদ্দ-লেখক) তারা চিনবার সুযোগ পেয়েছে। ভারত ও তার এজেন্টদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে যে কোন মূল্যে তারা স্বদেশ ও জাতি রক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে।”আলী আকবর টাবীর বই থেকে নেওয়া পেপার কাটিং

*১৭ এপ্রিল:
শান্তিকমিটির আয়োজিত মিছিলের পক্ষে সাফাই গেয়ে এদিনও বেশ কয়টি রিপোর্ট করা হয়। এমনই একটি রিপোর্টে বলা হয়-
‘পাকিস্তান রক্ষার সংগ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তিকমিটি গঠনের পর পুরো পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ এখন একই পতাকাতলে জড়ো হচ্ছে। পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ ফুঁসে উঠেছে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের জবাব দিতে।’
একই দিন পুরো পূর্ব-পাকিস্তানে এরকম শান্তিকমিটি গঠনের জন্য জামাত এবং মুসলিম লীগকে আহবান জানানো হয়। এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে মোট ৩৭বার জিহাদ এবং মুজাহিদ শব্দটি উল্লেখ করা হয় পত্রিকাটিতে। দৈনিক সংগ্রাম একাত্তরে সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে ভারতকে বল্লম এবং ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো।শুধু অপপ্রচার চালিয়ে ক্ষান্ত হতো না ওরা চরম সাম্প্রদায়িক উস্কানির প্রচারণা চালাতো।আলী আকবর টাবীর বই থেকে নেওয়া পেপার কাটিং

*১৮ এপ্রিল :

শেখ মুজিবের রেফারেন্ডম ছিলো স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা নয়’ বোল্ড হরফে বড়সড় একটা আর্টিকেল ছাপা হয় সংগ্রামের উপ-সম্পাদকীয়তে। যেখানে শেখ মুজিবের নামে কল্পনাপ্রসূত সব অবাস্তব এবং অবান্তর কথা লেখা হয়। বলা হয়,

শেখ মুজিব সত্যিকার অর্থের ভারতীয় দালাল এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ক্ষমতা লোলুপ এজেন্ট। দেশের জনগণকে মুক্তির কথা বলে অত্যুক্তির বুলি শিখিয়ে ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখার এক অভিনব নকশা তৈরি করেছে ভারতের দালালেরা। বাংলাদেশের জনগণ এখন ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফরকে দেখতে পাচ্ছে। মুজিবকে সাথে নিয়ে নয়াদিল্লির ষড়যন্ত্র দেখে মনে হচ্ছে আগরতলা ষড়যন্ত্রও সত্যিকারের ঘটনা ছিলো।”

*১৯ এপ্রিল:

১৮ এপ্রিল ঢাকাতে জয়বাংলা শ্লোগানে বিশাল এক মিছিল বের করে মুক্তিকামী জনগণ। যেখানে জয়বাংলা লেখা খচিত লাল সবুজ পতাকা বহন করা হয় এবং জিন্নাহর ছবি পদদলিত করা হয় এবং পোড়ানো হয়। এ ঘটনার পরেই দৈনিক সংগ্রামের খবর প্রকাশের ধারা পাল্টে যায়। কারণ, বিদেশী মিডিয়া এই মিছিলের বেশ কভারেজ দেয়। ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রায় সব খবরের মর্মার্থ ছিলো, ‘পুরো পূর্ব-পাকিস্তান ভারতীয় অনুপ্রবেশে ভরে গেছে। পথে পথে এখন ভারতীয় গুপ্তচর। ভারত থেকে লোক আনিয়ে মিছিল করানো হয়েছে ঢাকার পথে পথে।’

“পাকিস্তান সেনা বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়- ‘সময় এসেছে নড়েচড়ে বসার। পুরো পাকিস্তানকে ভারতীয় চর মুক্ত করতে হবে।”

*২ মে:

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা ২৫ মার্চ সর্ম্পকে লিখে-পাক সেনাবাহিনীর আগমনের অপেক্ষা করেছে। সেই পাকবাহিনীকেই জনগণের ভাগ্য বিধাতা বানিয়ে দৈনিক সংগ্রাম ২ মে “হিন্দুস্তানী সৈন্যের বর্বরতা” শীর্ষক সম্প্রাদকীয়তে উল্লেখ করলো-

“যেখানে যে অঞ্চলেই ভারতীয় সৈন্যেরা অনুপ্রবেশ করেছে, সেখানকার জনগণ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আমাদের পাক সেনাবাহিনীর আগমণের অপেক্ষার করেছে। পাকবাহিনীর আগমণে শান্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।”

*৩ মে:

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা পত্রিকাটি বাঙালি জাতির কালো রাত্রিটিকে পাকিস্তানিদের মুক্তি দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগম পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিটি দৈনিক সংগ্রাম ৩ এপ্রিল প্রথম পাতায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। ২৬শে মার্চ পাকিস্তানিদের জন্য মুক্তি দিবস শিরোনাম দিয়ে রইসী বেগমের বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়-

১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের সাত কোটি পাকিস্তানিদের জন্য মুক্তি দিবস

শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুচরেরা চিরদিনের জন্য মঞ্চ থেকে অপসারিত হয়েছে। শয়তানী শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার শক্তি যেন আমাদের অজেয় সশস্ত্র বাহিনীকে আল্লাহ দান করেন।

* ৮ মে:

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা সম্পাদকীয়তে ছাপে যে,

” পাকিস্তান সেনা বাহিনী পাকিস্তান ধ্বংসের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করেছে”

দৈনিক সংগ্রাম সামরিক জান্তা কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সর্মথন করে এবং খুনি পাক সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠে। পত্রিকাটি পাক সামরিক সরকারের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সর্মথনে নানা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করায় এবং তাদের নিন্দনীয় কাজে গর্ববোধ করে ৮ মে “সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা” শিরোনাম দিয়ে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করে-

“অবৈধ আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গত ২৬শে মার্চ সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীন বাঙলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এঁটে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। সামরিক সরকার তা জানতে পেরেই পঁচিশে মার্চ দিবাগত রাতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাঁর সে পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেন এবং পাকিস্তানকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন”

আরও প্রকাশ করে, এ পরিকল্পনার পেছনে ভারতের সক্রিয় সহযোগীতা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র থেকেই….জাতির পিতা কায়েদে আজমের নাম নিশানা মুছে নতুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠা অভিযান চলেছিল। পাকিস্তানের জাতীয় সংঙ্গীতের বদলে বাংলাদেশের জাতীয় সংঙ্গীত চালু করা হয়েছিল। অবশেষে তেইশে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়ে বাঙলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে শুধু মুখেই ঘোষণাটি বাকি রাখা হয়েছিল ২৫শে মার্চের জন্য।এরূপ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রশ্নাতীত সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর উপরই ন্যস্ত। আমাদের বীর পাকসেনারা পঁয়ষট্টির ভারতীয় প্রত্যক্ষ হামলা ও একাত্তরের ভারতীয় পরোক্ষ হামলা যেরূপ অলৌকিককভাবে প্রতিহত ও বিধ্বস্ত করলো তাতে সত্যিই আমরা গর্ববোধ করছি।

* ৬ জুন:

দৈনিক সংগ্রাম ২৫শে মার্চ গণহত্যার জন্য পাকিস্তানিদের অভিনন্দন জানায়

*২৬ শে আগস্ট:

“মুক্তিযুদ্ধের কারণ হিসেবে মুজিবের হঠকারিতা”

কে দায়ী করে একটি প্রতিবেদন ছাপা দৈনিক সংগ্রাম।
*১ সেপ্টেম্বর :
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মতিউর রহমানকে খলনায়ক ও বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দিয়ে দৈনিক সংবাদ সংবাদ প্রচার করে..

* ২৪ সেপ্টেম্বর:

নিজামীর উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক সংবাদ প্রচার করে “দেশপ্রেমিক রাজাকাররাই মুক্তিযুদ্ধাদের নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম”…

*২৬ শে সেপ্টেম্বর :

জামায়াত নেতা গোলাম আযমের উদ্ধৃতি: “পাকিস্তান যদি বেঁচে না থাকে তাহলে জামায়াতকর্মীদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন সার্থকতা নেই” নামক উদ্ধৃতি প্রথম পাতায় গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়…

*৭ নভেম্বর :

“সেনাবাহিনীর পর রাজাকারদের স্থান”

নামক একটি সম্পাদকীয় ছাপায় দৈনিক সংবাদ….

*১২ নভেম্বর:

দৈনিক সংগ্রাম এক উপসম্পাদকীয়তে দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হয়..

 ” বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে যারা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী তাদেরকে খুঁজে বের করা হোক,আর এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র মাটিকে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করা যাবে, অনুরূপভাবে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস থেকে সকল ছদ্দবেশী দুষ্কৃতিকারীকে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে, তাহলে শান্তি ফিরে আসবে”

স্বাধীন বাংলাদেশ কিংবা পরাধীন বাংলাদেশে সংগ্রামের ভূমিকা কখনোই পরিবর্তন হয়নি…যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় যথেষ্ট উস্কানি দিয়েছিল দেশের সাধারণ মানুষকে এই পত্রিকা… বারবার সম্পাদক বদল মালিকানা বদল হলেও এদের আদর্শের কোন পরিবর্তন হয়নি..জামাত যেমন যুদ্ধাপরাধী দল ঠিক তেমনি তাদের এই মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকাটি যুদ্ধাপরাধীর দায়ে সমান ভাবে দুষ্টু। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাথে সাথে এই পত্রিকারও বিচার হওয়া উচিত। আশা করি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সাথে সাথে এই পত্রিকার সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে।

তথ্যসূত্র: দৈনিক সংগ্রামের তৎকালীন সময়ের পেপার কাটিং , দৈনিক সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা- আলী আকবর টাবী, ও ইন্টারনেট।