বিশ্বাসঘাতক ভাসানী ওসমানী

প্রায়ই প্রশ্ন শোনা যায় ওসমানী ও ভাসানীকে কেন স্মরণ করা হয় না যথাযোগ্য সম্মান এবং প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়না কেন?উত্তর স্বচ্ছ পানির মত পরিষ্কার! বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ভাসানী ও ওসমানীর বিতর্কিত ভূমিকা আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিবে …আসুন জেনে নেই ওসমানী এবং ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের সাথে কীভাবে প্রতারণা করেছিলেন –

কৃতঘ্ন ওসমানীঃ

ওসমানী প্রচন্ড লোভী ব্যাক্তি ছিলেন,তিনি ১৯৭২ সালে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানদের দায়িত্ব পালন করেন ,১৯৭৩-৭৪ সালে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন সত্ত্বে তিনি ১৯৭৪ সালে আবার সেনাবাহিনীর প্রধান হতে চাইলেন,কিন্তু বঙ্গবন্ধু জেনারেল সফিউল্লাহ কে সেনাপ্রধান করেন তাকে উপেক্ষা করে। এ নিয়ে তিনি বঙ্গন্ধুর উপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন। ওসমানী প্রচন্ড সাম্প্রদায়িক ব্যাক্তি ছিলেন, এ কারণে তিনি আওয়ামীলীগে ও একঘরে হয়ে ক্ষিপ্ত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর উপর।

ওসমানী বঙ্গবন্ধু হত্যার অন্যতম কুশলীব ছিলেন, মোশতাক সরকারের সশস্ত্র বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন!

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পর সশস্ত্র বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড এর দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেন ওসমানী। মোশতাকের সরকারকে অভিনন্দন জানাতে মোশতাকের বাসভবনে ছুটে যায় ওসমানী

মুক্তিযুদ্ধে ওসমানীর উল্লেখযোগ্য কোন অবদান নেই।মেজর সাফায়াত জামিলের ভাষ্য  অনুযায়ী
“ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হওয়া সত্ত্বে ও তিনি সেক্টর কমান্ডারদের সাথে বসে কখনো রণকৌশল নিয়ে আলোচনায় করতেন না।মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্ন সেক্টরের যোদ্ধাদের শাসানো তার একমাত্র কাজ ছিল। সেক্টর কমান্ডাররা ওসমানীর নির্বুদ্ধিতা ও অকর্মণ্য ভূমিকার কারণে খুবই ক্ষিপ্ত ছিলেন”

মুক্তিযুদ্ধে তাজ উদ্দিনের ব্যাক্তিগত সহকারী মইদুল হাসানের মতে
“বাংলােদশ প্রধান সেনাপতির কাছ থেকে স্বভাবত যে উদ্যোগ প্রত্যাশিত ছিল, ওসমানী তা থেকে নিজেকে বহুলাংশে দূরে সরিয়ে ফেলেন , এবং সার্ভিস মানুয়াল মা রচনার মত এমন সব কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন যার সাথে চূড়ান্ত অভিযানের কোন সম্পর্ক ছিল না “

ওসমানী  জাতীয় চার নেতা বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের  কোন প্রতিবাদ করেনি ,অথচ তাজউদ্দিন সৈয়দ নজরুল ইসলাম রা তার প্রধান সেনানীর মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে ছিলেন তার যুদ্ধ পরিচালনায় অক্ষমতা জানা সত্ত্বেও!কিন্তু জাতীয় চার নেতা হত্যায় ওসমানীর দ্বিচারিতা এখনো রহস্য। ওসমানী স্বাধীনতার পর প্রত্যেকটি পদক্ষেপে স্বাধীন বাংলাদেশের শহীদদের সাথে বেইমানি করেছিলেন।তাই উনাকে সম্মান দেওয়ার প্রশ্ন অবান্তর।

বঙ্গবন্ধু ওসমানীকে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রধান সেনাপতির মর্যাদা দিয়েছিলেন যদিও ওসমানী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে নিগৃহীত অবস্থায় দিনাতিপাত করে ১৯৬৯ সালে অবসর গ্রহণে বাধ্য হন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালে ওসমানীকে গণপরিষদের সদস্য করেন কোন রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড না থাকা সত্ত্বেও। ১৯৭২ সনের স্বাধীনতা দিবসে পূর্বদেশের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জেনারেল ওসমানী বলেছেনঃ “২৫শে মার্চ রাত দশটায় বঙ্গবন্ধু আমাকে বলেছিলেন আপনাকে যেন ওরা কোন অবস্থাতেই ধরতে না পারে। তিনি আমার উপর যুদ্ধ পরিচালনার করার নির্দেশ প্রদান করেন।”

যেদিন বঙ্গবন্ধুর খুনিরা রাতে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে পালিয়ে যায়– সেদিন রাতে বাংলাদেশ খুলে তাদের কে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করে ওসমানী ।তখন বিমানবন্দর তেজগাঁওতে বর্তমান জাহাঙ্গীর গেটে ,বি এ, এফ শাহীন কলেজের পাশে। যেটা বিমান বাহিনীর দক্ষলে । আর ঐ সময়ে পুরো বিমান বা বাহিনী ছিল খোন্দকার মোশতাক আর ডালিম চক্রের বিরুদ্ধে ।বিমান বাহিনীর বঙ্গবন্ধু পন্থী অফিসার ঠিক করে খুনিদের বহনকারী বিমানে খুনিরা ওঠার মুহুর্তে সবাইকে মেরে ফেলবে।কিন্তু বিমান ছাড়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ঢাল হয়ে ওসমানী দাড়িয়েছিলো ।খুনিদের বহনকারী বিমান চট্টগ্রাম হয়ে ব্যাংকক দিয়ে পালিয়ে যায় ।

স্বাধীনতার পর অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে ব্যাক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তিনি প্রাপ্য খেতাব থেকে বঞ্চিত করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের হয়ে লড়াই করা এক ডজন বাঙালি সেনাকে পুনর্বাসন করেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে। ওসমানী জিয়ার হ্যাঁ না নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পেইড বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন ১৯৭৭ সালের সাজানো নাটকের সফল মঞ্চায়নের মাধ্যমে।১৯৮১ সালের আরেক প্রহসনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে অবৈধ স্বৈরাচরী শাসক জিয়ার ক্ষমতাকে পাকপোক্ত করার ব্যাবস্থা করেন।

মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিনায়ক কিংবা দেশ স্বাধীনের পর ওসমানী ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু তাকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছিলেন,কিন্তু ওসমানী প্রতিদানের ফল বুলেটেই দিয়েছিলেন।

ওসমানী এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রকৃত মূলধারার  সাথে বেইমানি এবং ছলনার আশ্রয় নেন নিজের সুবিধার জন্য।

কৃতঘ্ন ভাসানীঃ

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ভাসানীর সমর্থন ও অভিনন্দন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে মোশতাক ভাসানীকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান

স্বাধীন বাংলাদেশে ভাসানীর ভূমিকা একাত্তরের রাজাকারদের চাইতে ভয়ানক!মাওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পরে মোশতাক সরকারকে সর্বপ্রথম তারবার্তায় অভিনন্দন জানানো গুটিকয়েক ব্যাক্তি বিশেষের অন্যতম। অথচ বঙ্গবন্ধু খুন হওয়ার এক মাস আগে সন্তোষে গিয়ে ভাসানী থেকে দোয়া দিয়ে আসেন ১৯৭৫ সালের ৮ জুলাই।

সন্তোষে ভাসানীর দোয়া নিতে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫,৮ জুলাই

এক মাসের ব্যাবধানে ভাসানী অকৃতজ্ঞ পিশাচের মত সপরিবারে নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনাকে “সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী” পদক্ষেপ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন ভাসানী।ভোল পাল্টানো বোধহয় একই বলে। এমনকি ৭ নভেম্বর এর সিপাহী বিপ্লবে জিয়াকে প্রকাশ্যে সমর্থন দান করেন ভাসানী। সামরিক শাসক জিয়াকে সমর্থন করেছিলেন ভাসানী। জিয়াকে লেখা একটি চিঠিতে ভাসানী লিখেন-

‘আল্লাহ পাকের দরবারে প্রার্থনা, তুমি বিরাট দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছ, তাহা পালন করিতে সক্ষম হও।’

স্বাধীনতার আগে পরে বিতর্কিত ভূমিকাগুলো ভাসানীর সুবিধাবাদী চরিত্রের প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরে।

ভাসানী বঙ্গবন্ধুকে সহ্য করতে পারতেন না,কারণ বঙ্গবন্ধু রাজনীতির ময়দানে তার চাইতে অনেক জুনিয়র হয়েও ভাসানী কে ছড়িয়ে গিয়েছিলেন।বঙ্গবন্ধুর অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ভাসানী আওয়ামীলীগে একঘরে হয়ে আওয়ামীলীগ ছেড়ে দেন এবং ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ এ সাধারণ নির্বাচনে প্রথমে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও পরবর্তীতে ন্যাপ এর অন্ত কোন্দল ও বিভেদের কারণে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। গণ অভ্যুত্থানের সময়ে একদিন উত্তপ্ত বক্তৃতা দেয়া ছাড়া অন্যন্য
উত্তাল সময়ে ভাসানী চরম চাটুকারিতার আশ্রয় নিয়েছিলেন ছয় দফার প্রচন্ড বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলেন। তারপরেও মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার ভাসানীকে প্রাপ্য সম্মান দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি,যদিও সেসময় ভাসানীর দলের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি।তার দলের সাধারণ সম্পাদক যদু মিয়া পাকিস্তানের হয়ে রাজাকার প্রচারণা চালাতে ভারত থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে পালিয়ে চলে আসে।

ভাসানী বিভিন্ন কারণে বঙ্গবন্ধুর উপর ক্ষিপ্ত ছিলেন।বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করে – ভাসানী বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং তিনি হত্যাকাণ্ড সমন্ধে পূর্ব অবগত ছিলেন বলে জানা যায়।এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় তার স্বাধীনতার পক্ষের অবস্থানের ব্যাপারে সংশয় আছে। কারণ মুক্তিযুদ্ধে চীন বাংলাদেশের বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানীদের গণহত্যা কে নীরব সমর্থন দেয়। অথচ ভাসানী ওই সময়ে উপমহাদেশে একমাত্র চীনপন্থী রাজনীতিবিদ হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিত ছিলেন। চীন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা পালন করে। তিনি ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাত্রে তিনি টাঙ্গাইল থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন এবং স্বাধীনতার যুদ্ধের সম্পূর্ণ সময় তিনি ভারতে অবস্থান করে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার কোন ভূমিকা নেই বললে চলে… ভাসানীর দ্বিচারিতার জন্য ভারত সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে নজরবন্দি করে রাখে।

অথচ এত কিছুর পরও বঙ্গবন্ধু ভাসানীকে সরকারি খরচে ভরণ পোষণের ব্যাবস্থা করেছিলেন ৭২-৭৫ সাল পর্যন্ত ,কত বড় বেঈমান ছিল ভাসানী,ভাবুন একবার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি র হত্যাকাণ্ডে খুনিদের প্রশংসা ও অভিনন্দন জানাতে একটিবারের জন্য তার বুক কাপলো না!

ভাসানীর সুবিধাবাদী চরিত্রের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরনো ।১৯৫৮-৬৮ সাল পর্যন্ত আইয়ুব খানের সরকারের প্রকাশ্য দালালিতে লিপ্ত ছিলেন , কারন তাকে চীন থেকে বলা হয়েছিল আইযুব বিরোধী মনোভাব পরিহার করতে। অথচ এই সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দিন সহ আওয়ামী লীগের নেতারা আপোষহীন মনোভাবের কারণে কতবার জেলে গিয়েছিলেন।এমনকি শিক্ষা আন্দোলনে ১৯৬২ এত ছাত্র মারা যাওয়ার পরেও ভাসানী মুখ খুলেননি একবারের জন্য ও।

ভাসানী রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পেরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার প্রস্তাব ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম ভাসানী করেন,এর মাধ্যমে তিনি রাজাকারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। শুধু তা করে ক্ষান্ত হননি ভাসানী ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে একাত্তরের দালাল, পাকিস্তান-পন্থী বাঙালি, ডানপন্থী ও চৈনিক বামপন্থী রাজনীতিকদের নিয়ে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করেন ভাসানী।

ভাসানী কিংবা ওসমানী সরাসরি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত না থাকলেও বঙ্গবন্ধুকে যারা সপরিবারে হত্যায় লিপ্ত ছিলো তাদের সেবাদাসীর ভূমিকা পালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ায় আনন্দ প্রকাশ করে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছিলেন ভাসানী,ওসমানী ।জিয়া এবং  মোশতাক সরকারের  সুবিধাভোগীদের তালিকায় প্রথম সারির ব্যাক্তিবর্গ ছিলেন তারা। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি স্তম্ভের সাথে বেইমানিতে লিপ্ত ছিলো ভাসানী ওসমানী। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বা বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাসী ব্যাক্তি কখনো ভাসানী বা ওসমানীকে কখনো   ক্ষমা কিংবা সম্মান করা উচিৎ না তাদের ভূমিকার জন্য।

তথ্যসূত্রঃ
মুক্তিযুদ্ধ  সত্যের মুখোমুখি – অধ্যাপক আবু সাইয়িদ
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর – কর্নেল শাফায়াত জামিল
মূলধারা ৭১ – মইদুল হাসান

আরো জানুন- বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে ভাসানীর দায়