বাঙালি আবেগ ও এরদোগানের রাজনীতি

👤 সোহেল রহমান শাস্ত্রী

তুরস্কের একে পার্টি (একেপি)
ফিলিস্তিনের হামাস
তিউনিসিয়ার ইন্নাহদা পার্টি
কুয়েতের ইসলামি কন্সটিটিউশনাল মুভমেন্ট
জর্ডানের ইসলামি অ্যাকশন ফ্রন্ট
বাহরাইনের মিনবার
ভারত-পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বা ভারতীয় উপমহাদেশের জামায়াত-ই-ইসলামি
মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদারহুড

এই দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রীয় সীমানার ভিন্ন ভিন্ন নেতৃত্বে ও নামে কার্যক্রম চালালেও সবার মূল এক বৃত্তের কেন্দ্রে। ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে এরা অরাজকতা আর সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেয়, নিজেরাও সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম সরাসরি ও গোপনে পরিচালনা করে। এরা না জাতীয়তাবাদী না ইসলামি। এদের মূল লক্ষ্য রাষ্ট্রক্ষমতা দখল ও খেলাফতী আমলের মত বৈশ্বিক শরিয়তি ব্যবস্থা প্রবর্তন। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এরা বিভিন্ন সেক্টরে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। এরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মত শুধু রাজনৈতিক কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিভিন্ন সেক্টর যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- স্কুল, কলেজ-মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক-বীমা, শেয়ার বাজার, হাসপাতাল-ক্লিনিকসহ চিকিৎসাব্যবস্থা, এছাড়া প্রশাসন-আইনবিভাগ-বিচারবিভাগে সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে এসব পার্টি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এরদোগানের নতুন ট্রাম্প কার্ড সোফিয়া জাদুঘর



সংগঠনগুলোর মূলমন্ত্র হয়ে থাকে ‘ইসলাম ইজ দ্য স্যলিউশন’! এই ধর্মীয় ভাবধারায় তারা সামাজিকভাবে সংগঠন গড়ে তুলে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বাস্তবায়ন করে। উল্লেখিত দলগুলোর প্রায় সবই বৈশ্বিকভাবে বিভিন্ন সময় নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন।
আন্তর্জাতিকভাবে একই মতাদর্শের ধারক-বাহক এই সংগঠনগুলো তাত্ত্বিক নেতা মূলত মিশরের হাসান আল বান্না ও উপমহাদেশের মাওলানা আবুল আলা মওদূদী। মূলত মওদূদীবাদী আদর্শই এদেশের জামায়াতপন্থীদের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দলের আদর্শিক সম্পর্ক তৈরি করে দেয় আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ জামাতের বিভিন্ন ইশুতে তাদের নাক গলানোর জন্য রাস্তা প্রসারিত করে।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইশুতে সরাসরি কথা বলতে দেখা যায় পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিশরকে। এক্ষেত্রে মিশরে চিৎকার চেচামেচি যা করার তা করেছে মুসলিম ব্রাদারহুড।
নিজামীর মৃত্যুদন্ডের পর জামায়াতের বড় ভাই মুসলিম ব্রাদারহুড কঠোর ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মুসলিম উম্মাহকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য! একক ব্যক্তি হিসেবে ও রাষ্ট্রের নিয়ন্তা হিসেবে যার গলা সবচেয়ে বেশি শোনা গেছে সে হচ্ছে এরদোগান!

তুরস্ক সেকুলার স্টেট কোন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র নয়


বাংলাদেশের জামায়াত ও মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তুরস্কের একেপির অশুভ আঁতাত দীর্ঘদিনের। মূলত এরা সকলেই একই মাতৃগর্ভজাত-পিতৃবীর্যজাত, যার সাথে শান্তির ধর্ম ইসলামের কোনো সম্পর্ক নাই।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনের বাংলাদেশি শাখা মাত্র। জামায়াতে ইসলামী শুধু বাংলাদেশে নয়, মিশর ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম ব্রাদারহুড এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের তালেবান ও আল কায়েদার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জঙ্গি মৌলবাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করেছে।

জামায়াতে ইসলামী এবং মুসলিম ব্রাদারহুড ও তুরস্কের এরদোগানের দল একেপির এক ও অভিন্ন দর্শন হচ্ছে, ‘ধর্মের নামে ক্ষমতায় যাওয়া বা থাকার জন্য যে কোনো ধরনের হত্যা, নির্যাতন ও সন্ত্রাস ইসলামসম্মত।’ মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠন, যার বলয় মিসর পেরিয়ে সারাবিশ্বেই বিস্তৃত। নামে ভিন্নতা থাকলেও আদর্শগত মিলের কারণে বিশ্বের তাবৎ জঙ্গি মৌলবাদী দলগুলোর সঙ্গেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান।

আটকাবস্থায় মৃত্যু ও এর পর পর্যন্ত এই নেটওয়ার্কের মূখ্য মুখ ছিল মিশরের মুরসি। মুরসির মৃত্যুতে এদেশীয় মওদুদীবাদীদের অশ্রুপাত দেখে আমাদের বোঝার বাকি ছিল না তাদের প্রভাব কতটা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। একই কাহিনী দেখা গিয়েছিলো তুরস্কে ভুয়া অভ্যুত্থানের নাম করে বিরোধীমত দমন করে এরদোগানের একনায়ক হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায়। এরদোগানের এদেশীয় বীর্যসৌর্যজাতসন্তানেরা তাকে ইসলামি দুনিয়ার বাপ সাজানোর চেষ্টা পূর্ব থেকেই করে আসলেও সেই সাজানো বিপ্লবে ষড়যন্ত্র পূর্ণতা পেয়েছিলো। এরদোগানের বৈশ্বিক মুসলিম ও ইসলাম সংশ্লিষ্ট বাছাই করা কিছু বিষয়ে নাক গলানোকে সামনে এনে জামাতি প্রোপাগাণ্ডা মোতাবেক তাকে বিশাল মহীরুহ হিসেবে দেখানো হয়।
অথচ লাখো তুর্কি-কুর্দির রক্তরঞ্জিত এরদোগানের হাতকে লুকিয়ে রাখা হয় অত্যন্ত সযত্নে।

বিশ্বব্যাপী এই নেটওয়ার্ক যে ধর্মীয় কার্ড বারবার ব্যবহার করে এসেছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সেই ক্ষমতাকে সুসংহত করা আর স্থায়ী করার জন্য, এরদোগান এর বাইরে আর কি করবেন? হায়া সোফিয়া নৈতিকভাবে ফিরে যাওয়া উচিত ছিল খ্রিস্টানদের হাতে, কারণ এটা তাদের সম্পদ। দখলদারিত্বের মাধ্যমে শক্তি প্রয়োগ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়নি, এই দাবীও করবো আবার সেই দাবীর বিরুদ্ধে কাজ করে সেটাকে ইসলামের খেদমতি দেখিয়ে স্বয়ং খলিফা সাজার চেষ্টা করবো! এরকম দ্বিচারিতা জামায়াতি মওদুদীবাদী মুসলিম ব্রাদারহুড নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই সম্ভব!

এরদোগানের এরকম উদ্যোগ এদেশে জামায়াতের ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে শহিদবাড়িয়া করার উদ্যোগের সাথে কোনো ফারাক নাই। এই আবেগ বাঙালিকে কেন, তুর্কিদেরও তাড়িত করে। এই তাড়নাকেই কাজে লাগায় একেপি-হামাস-মিনবার-ব্রাদারহুড আর জামায়াতে ইসলামি।

পুনশ্চঃ এরদোগান এত বছর ক্ষমতায় থাকার পরেও তুরস্ক কিন্তু সেকুলার
স্টেট।কোন রাষ্ট্র ধর্ম নেই তুরস্কে। ইসরাইল কে স্বীকৃতি দেয়া একমাত্র এবং সর্ব প্রথম মুসলিম দেশ তুরস্ক।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়