অনলাইন ক্লাসঃ- এগ্রেসিভ ডিসক্রিমিনিশন থেকে সিম্পেথেটিক ডিসক্রিমিনিশনের পথে অগ্রযাত্রা

👱 তামিম মুনতাসির –


আপনি কোন সময় ৫ তলা বিল্ডিং এর ভিত্তিপ্রস্তরে ১৫ তালা বিল্ডং করবেন? কাঠের পুলে কি মালবাহী লড়ী অথবা ট্রাক ঢুকাবেন। অথবা পূরান ঢাকার রাস্তায় F1 রেসিং করবেন। সম্ভব? কোনভাবেই সম্ভব না। যদি করতে চান তাহলে বুঝতে হবে হয় আপনার মস্তিকের স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম লোপ পেয়েছে অথবা গরু ছাগলের কাছাকাছি কোন প্রাণী। মোরাল অফ দ্যা স্টোরি ইজ আপনাকে কোন কাজ পরিচালনা করার পূর্বশর্ত হিসেবে কাজটি করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ধরনের অবকাঠামো সুবিধা থাকতে হবে। তা না হলে ঐ কাজটি করার চিন্তাও মাথায় আনতে পারেন না এটা পলেসি মেকিং এর খুব সিগফিকেন্ট একটা নীতি।

পলেসি মেকিং এর আরেকটা বিষয় হচ্ছে আপনি যে পলেসি গ্রহন করছেন সেটি অবশ্যই ইনক্লোসিভ এবং জনমুখি হতে হবে। অর্থাৎ আপনার প্রণীত পলেসির মাধ্যমে যাতে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ সুবিধা ভোগ করতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। এটা পলেসির একটা গণতান্ত্রিক এপ্রোচ।

একটা পলিসিতে বিভিন্ন ধরনের স্টেকহোল্ডার ( অংশিজন) থাকে। এই পলেসিকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের লক্ষে স্টেকহোল্ডারদের একটা সুস্পষ্ট নীতিমান বা গাইডলাইন দিতে হয়। এই গাইডলাইনিটি পলেসি মেকিং এ বিভিন্ন ধরনের কনফিউশন তথ্যগত ত্রুটি মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পলেসি নির্ধারণের ক্ষেত্রে উপরিউক্ত পদক্ষেপগুলো না নিয়ে কারও উপর যদি কোন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় সেটা হবে স্বৈরাচারী মনোভাব যেটা ব্রিটিশরা করেছে কলোনাইজেশনের যুগে। সান্ধ আইন, নীল চাষ, আযাচিত কর নির্ধারণ, অথবা শরীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে। তারপর তা করেছে পাকিস্তানি শোষকেরা।

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম এগুলু হচ্ছে প্রসঙ্গের পূর্ব অবতারণা। এখন আসল কথায় আসি। প্যান্ডিমিক কভিড – ১৯ এর প্রকোপের কারনে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। খুব ভাল কথা। তবে

আমাদের অনলাইন ক্লাসের কারিগরি সক্ষমতা কতটুকু ভেবে দেখেছেন? যেখানে অনেক গ্রামে অথবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঠিকমত কথাই বলা যায় না ঘরে বসে সেখানে 4G নেট কিভাবে পাব? ওহির মাধ্যমে?

বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ – সামাজিক অবস্থা অনলাইন ক্লাসের জন্য কতটা প্রস্তুত? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশিরভাগ পরিবার মধ্যবিত্ত, নিন্ম মধ্যবিত্ত। অনেক পরিবারই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাস করে। যাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। ইনকাম শূন্য এই অবস্থায় তাদের ভাবতে হয় পরেরদিন কি খাবে সেখানে এই অবস্থায় অনলাইন ক্লাস অন্ধের দেশে চসমা বিক্রি করার মত না? বর্তমান টেলি কমিউনিকেশন কোম্পানি গুলা যে পরিমাণ গলাকাটা দাম রাখে ডেটা প্যাকের সেটা বহন করার ক্ষমতা অনেক ফ্যামিলির নেই। একটি ঘটনা দেখলাম মেয়ের অনলাইন ক্লাসের সরঞ্জাম সরবরাহ করতে না পারা বাবা আত্নহত্যা পর্যন্ত করেছে।এই পারিবারিক অশান্তির সমাধান আপনি কিভাবে দিবেন।বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক টিচারই ত ইনক্লোসিভ পলেসির কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। এই পলিসি কি ইনক্লোসিভ হল? কিছু হলেই ত সংবিধানে চলে যান। জাতীয় শিক্ষানীতিতে ত বলা আছে শিক্ষার মাধ্যম হতে হবে জনমুখী। এটা কি জনমুখি শিক্ষা মাধ্যমের নমুনা? সহজ কথায় বললেইত আপনাদের পলেসি টাকাওয়ালাদের জন্য দারিদ্র্য পরিবারের সেখানে জায়গা নেই।

এই করোনা পরিস্থিতি আমাদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কি পরিমাণ অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বৈষম্য, মানবিক অবক্ষয় আমাদের সমাজে বিদ্যমান। আমাদের উচিত ছিল এর থেকে শিক্ষা নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরন থেকে বাহির হয়ে আসা কিন্ত এই অনলাইন ক্লাসকে বৈষম্যের এক অভিনব টুল হিসেবে করছি। কি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড স্ট্যানবাজি!! আসলে বৈষম্য আগেও ছিল। এখনো আছে। আগে বৈষম্য করলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তা প্রকাশ্যে করত। বলে কয়েই করত। বিষয়টা এগ্রেসিভ ছিল। কিন্ত এখন সেটা সিম্পেথেটিক। মানে আপনার প্রতি বৈষম্য করছি কিন্ত আপনকেই বৈষম্য বিরুদ্ধ বয়ান শোনাচ্ছি। তোমার প্রতি বৈষম্য করছি হাসিমুখে। তলে তলে যেটা আক্রমণাত্মক, প্রকাশ্য বৈষম্য থেকে খারপ। মানে বিষয়টা ” BlackLivesMatter” বলে কালো মানুষকে ট্রল করার মত। আমাদের শিক্ষক তথা বুদ্ধিজীবীরা কথায় কথায় ডি – কলোনাইজেশনের ছবক দ্যান। এটা কি তার নমুনা? আপনারা কি দেশের সিচ্যুয়েশন, স্টুডেন্টসদের পালস বুঝেন না? যদি বুঝেও না বুঝার ভান ধরেন তাহলে আপনি আসলে শিক্ষকই না। আপনি একটা রোবট যার চিন্তা করার ক্ষমতা নাই যেভাবে চালায় সেভাবে চলেন।

অপরিকল্পিত, অপ্রস্তুত, পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব, ইন্টারনেট সেবার অবকাঠামোগত ত্রুটি, অনলাইন ক্লাসে অসামর্থ্যদের বাদ রেখে বৈষম্যমুলক পন্থায় অনলাইন ক্লাস চালু রাখাটা কতটা উচিত হবে সেটা মাথায় ধরে না। আমার কথায় কিছু যায় আসে না। কিডনি বিক্রি করে হলেও ক্লাস করা লাগবে কিছু করার নাই। এটেন্ডেন্স আর এসাইনমেন্ট বাদে এই অনলাইন ক্লাস কি ভ্যালু এড করবে শিক্ষার্থীদের সেটা সর্বজনবিদিত নির্মম পরিহাসের পলিসি মেকিং বলার অপেক্ষা রাখেনা।