ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ও স্থাপত্য নির্দশনসমূহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের না বাংলাদেশের ও সম্পদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে ৫২,৬৯,৭১ নেমে এসেছে বাংলাদেশের বুকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই বাঙালি শিখিয়েছে আত্মমর্যাদা,দিয়েছে আত্মপরিচয় । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণা,ঘাস, পিচ ঢালা রাজপথ হাজার হাজার মুক্তিকামী জনতার রক্তে রঞ্জিত ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুপ্ত আগ্নেয়গিরি যেথায় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হলে অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত থামেনা।এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সংগ্রামে আত্মত্যাগ করা বীর সেনানীদের স্মৃতি রক্ষার্থে অনেক ভাস্কর্য কিংবা স্থাপত্য নিদর্শন নির্মিত হয়েছে। রাজু ভাস্কর্য ,অপরাজেয় বাংলা, স্মৃতি চিরন্তনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটেই বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ভাস্কর্য ও স্থাপনা। এগুলো ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অনেক ভাস্কর্য এবং স্থাপনা আছে যেগুলো বাঙালি জাতির অনেক কীর্তির সাক্ষ্য দেয়।

আসুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত ভাস্কর্য ও স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে নেই..


অপরাজেয় বাংলাঃ

অপরাজেয় বাংলা  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনগণের অবদান

স্মরণে নির্মিত ভাস্কর্য যাতে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বরূপ চিত্রিত।ভাস্কর্যটি বাংলাদেশের সর্বাধিক পরিচিত অন্যতম ভাস্কর্য।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপিত বেদিতে দাঁড়ানো তিন মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি যেন অন্যায় ও বৈষম্য দূর করে দেশে সাম্য প্রতিষ্ঠার গান গাইছে। মুক্তিযুদ্ধের দ্বীপ শিখা হয়ে ‘অপরাজেয় বাংলা’ সারা বাংলার মানুষের চেতনার হৃদয়ে এখনো দোদীপ্যমান। ভাস্কর্যটি সব শ্রেণী পেশার মানুষের একতাবদ্ধ হয়ে শোষকের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়ার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখনো বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে অনুষ্ঠিত হয়।

ছবিঃ প্রথম আলো



ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

অপরাজেয় বাংলার নির্মাতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। ভাস্কর্যটির আয়তন ৫.৫ মিটার,উচ্চতা ১৮ ফুট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের পাদদেশে এটি অবস্থিত, ঐতিহাসিক বটতলার সামনে অবস্থিত । অপরাজেয় বাংলার মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ( বর্তমান চারুকলা অনুষদ) ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু, রাইফেল হাতে দাঁড়ানো মডেল সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে এবং নারী মূর্তির মডেল হাসিনা আহমেদ।অপরাজেয় বাংলার তিনটি মূর্তির একটির ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা ব্যাক্তি বাংলার জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ রুপের প্রতিচ্ছবি। ভাস্কর্যটির চোখেমুখে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অগ্নিকুণ্ড জ্বলন্ত রয়েছে ।


ইতিহাসঃ


বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করে। তাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ও আক্রমণে পাক বাহিনী পরাজিত হয়। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরত্বের প্রতীকী স্মারক ‘অপরাজেয় বাংলা’। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর ভিপি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জি,এস মাহবুব জামান তথা ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৯৭৫ সালের পর অনেকদিন অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ বন্ধ ছিল।অনেকদিন থেমে থাকার পর ১৯৭৫ সালের ১৯ জানুয়ারি অপরাজেয় বাংলার নির্মাণ কাজ পুনরায় শুরু হয়। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করা হয়।

রাজু ভাস্কর্য

বর্তমানে রাজু ভাস্কর্যের নামে জানেনা এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম । রাজু ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে বর্তমানে দেশের সকল বড় বড় আন্দোলন,প্রতিবাদ সভা কিংবা গণজমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। তবে ভাস্কর্যের কাগুজে নাম সন্ত্রাস বিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য ।

ছবিঃ উইকিপিডিয়া



ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ,স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশের মাঝখানে তথা প্রাণকেন্দ্রে রাজু ভাস্কর্য অবস্থিত।ভাস্কর্যটিতে ৮ জন প্রতিবাদী মানুষের অবয়ব ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। যাদের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে তারা হলেন মুনীম হোসেন রানা, শাহানা আক্তার শিলু, সাঈদ হাসান তুহিন, আবদুল্লাহ মাহমুদ খান, তাসফির সিদ্দিক, হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল, উৎপল চন্দ্র রায় ও গোলাম কিবরিয়া রনি।এরা সকলে রাজুর বন্ধু ছিলেন। ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী ও গোপাল পাল ভাস্কর্য টি নির্মাণ করেন।শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে।


ইতিহাসঃ

১৯৯২ সালের ১৩ই মার্চ গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্যের সন্ত্রাস বিরোধী মিছিল চলাকালে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীদের গুলিতে মিছিলে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা মঈন হোসেন রাজু নিহত হন। নির্মাণ ও স্থাপনের অর্থায়নে ছিলেন – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আতাউদ্দিন খান (আতা খান) ও মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সমিতির সভাপতি, লায়ন নজরুল ইসলাম খান বাদল। বর্তমানে ভাস্কর্যটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।রাজুসহ বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাস বিরোধী আন্দোলনের সকল শহীদের স্মরণে নির্মিত এই ভাস্কর্য ১৭ই সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ. কে. আজাদ চৌধুরী উদ্বোধন করেন।



স্বাধীনতা সংগ্রাম চত্বর



স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য চত্বর বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস এবং কৃতি সন্তানদের তুলে ধরতে এক জায়গায় নির্মিত বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভাস্কর্যের সমাহার।শতাধিক কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক, বিপ্লবী, রাজনীতিক, বিজ্ঞানীর আবক্ষ মূর্তির সমাহার স্বাধীনতা ভাস্কর্য চত্বরে।

ছবিঃ রণদীপম বসু



ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে সলিমুল্লাহ হল, জগন্নাথ হল ও বুয়েট সংলগ্ন সড়ক দ্বীপে বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারক ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য’টি অবস্থিত। শামীম শিকদার এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন। দেশ বিদেশের বরণ্য প্রায ১১৬ খানেক ব্যাক্তির অবাক্ষ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন তিনি ।এখানের মূল আকর্ষণ “স্বাধীনতা সংগ্রাম” ভাস্কর্যটি বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাসকে ভিত্তি করে নির্মিত। এ ভাস্কর্যটি মহান ভাষা অন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬-র স্বাধিকার আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা সংগ্রামের আহ্বান, ২৫শে মার্চের কালরাত্রি, ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি মুক্তি আন্দোলনে নিহত হয়েছেন এমন ১৮ জন শহীদের মুখাবয়ব দিয়ে পুরো ভাস্কর্য নির্মিত। সবার নিচে ভাষা শহীদের ভাস্কর্য এবং সবার উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য। এ ভাস্কর্যে আরো তুলে ধরা হয়েছে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীক লাল সবুজের পতাকা।

ইতিহাসঃ

ভাস্কর শামীম শিকদার নিজ উদ্যোগে ১৯৮৮ সালে ফুলার রোডে অবস্থিত সেকেলে বাংলো স্টাইলের বাড়ির (বর্তমানে ঢাবি প্রোভিসির বাসভবন) সামনে পরিত্যক্ত জায়গায় ‘অমর একুশে’ নামে একটি বিশাল ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করেন। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রয়াত অধ্যাপক আহমদ শরীফ এটি উদ্বোধন করেন। ১৯৯৮ সালে ওই স্থানে উদয়ন স্কুলের নতুন ভবনের নির্মাণকাজ শুরু হলে ভাস্কর্যটি স্থানান্তরের প্রয়োজন হয়।সাময়িকভাবে ভাস্কর্যটি সড়কদ্বীপে এনে রাখা হয়। পরে ভাস্কর শামীম শিকদার ওই ভাস্কর্যটির অবয়ব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ নাম দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের আলোকে নতুনভাবে নির্মাণ করেন। সে সঙ্গে সড়ক দ্বীপটিকেও তিনি নিজের মনের মতো গড়ে তোলেন। ১৯৯৯ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন। বাংলাদেশ সরকার শামীম সরকারকে পুরো প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।

স্মৃতি চিরন্তন

একাত্তরের ২৫ শে মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর অতর্কিত হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী নিহত হয়।মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চড়া মূল্য দিতে হয়,শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং দেশের স্বাধীনতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান সমন্ধে জানানোর জন্য ‘স্মৃতি চিরন্তন’ নির্মাণ করা হয়।

ছবিঃ tarvelkd.com



স্মৃতি চিরন্তন সংক্রান্ত তথ্যঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনের এবং ফুলার রোডের অগ্রভাগে ( ভিসি চত্বর নামে খ্যাত) স্মৃতি চিরন্তন স্থাপিত। কালো গ্রানাইটের ওপর নির্মিত স্মৃতি চিরন্তনীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর সাথে সংশ্লিষ্ট ১৯৫ জন শহীদের নাম নামাঙ্কিত রয়েছে।এটি নির্মাণের দায়িত্বে ছিলেন স্থপতি মহিউদ্দীন শাকের। পাক বাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ড নিষ্ঠুর,অমানবিক নির্যাতনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে কংক্রিটের দেয়ালে বসানো পোড়ামাটির ফলকে । এটির দায়িত্বে ছিলেন শিল্পী রফিকুন্নবী এবং পোড়ামাটির ফলক একেঁছেন আবু সাঈদ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন, শিল্পী নিসার হোসেনের নেতৃত্বে ‘স্মৃতি চিরন্তন’ বর্তমান রূপ নেয় ২০১৫ সালে।

পোড়ামাটির ফলক। ছবিঃ tarvelkd.com



ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শহীদ সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য
স্মৃতি চিরন্তন স্মৃতিফলকটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৫ সালে, আনুষ্ঠানিক উদ্ধোধন করা হয় একই বছরের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসে।বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের নামের তালিকা দিয়ে খোদাইকৃত ছিল জায়গাটি তাই পরিচিতি পায় শহীদ বুদ্ধিজীবী চত্বর নামে। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুননির্মাণ করে নাম পরিবর্তন করে ‘স্মৃতি চিরন্তন’ রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি আ.আ ম.স আরেফিন সিদ্দিক ‘স্মৃতি চিরন্তন স্মৃতিফলক’ উদ্বোধন করেন।





স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বর

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে স্থাপিত ভাস্কর্য অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির সংগ্রাম ও প্রতিবাদের সাক্ষ্য দেয় । একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী চিত্র ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ভাস্কর্যের মাধম্যে একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিরুদ্ধে একটি খণ্ড দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের নৃশংস চিত্র ফুটে উঠেছে এই ভাস্কর্যে


ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পশ্চিম পাশে ডাসের পেছনে , রোকেয়া হলের পূর্বে অবস্থিত। ছয় জন মেহনতি সংগ্রামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধার
সংগ্রামী জীবনের প্রতিচ্ছবিকে উপজীব্য করে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে।চৌকো বেদির ওপর মূল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।এটি নির্মাণ করেছেন বাংলাদেশের কীর্তিমান ভাস্কর শামীম সিকদার।


ইতিহাসঃ


১৯৮৭ সালে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরের নির্মাণকাজ শুরু হয়।এই ভাস্কর্যে চিত্রিত হয়েছে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার বিরুদ্ধে মেহনতি মেহনতি মানুষের প্রতিবাদের স্বরূপ। ভাস্কর্যটির উপরে বামে আছে মুক্তিযোদ্ধা কৃষক আর ডানে অস্ত্র হাতে দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মাঝখানে অস্ত্র হাতে নারী ও পুরুষ যোদ্ধারা উড়াচ্ছে বিজয়ের কেতন। কিন্তু এই পতাকা ওড়ানোর জন্য বাঙালিকে পাড়ি দিতে হয়েছে রক্তগঙ্গা, সহ্য করতে হয়েছে অকথ্য নির্যাতন, যা খণ্ডদৃশ্য বেদিতে অঙ্কিত। ভাস্কর্য বেদির বাম পাশে আছে ছাত্র-জনতার ওপর অত্যাচারের নির্মম চেহারা। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এ ভাস্কর্য নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে।




রাউফুন বসুনিয়া ভাস্কর্য

স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চিরঞ্জীব নাম রাউফুন বসুনিয়া। যার আত্মত্যাগে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন অন্যরকম মাত্রা পায়। স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে, শিক্ষা ও গণতন্ত্রের দাবিতে প্রাণ উৎসর্গকারী রাউফুন বসুনিয়ার চির ভাস্বর চেতনার প্রতি সম্মান জানাতে অবাক্ষ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়।

ছবিঃ ফেসবুক




ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সামনে ,নীলক্ষেত মোড় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে স্যার এ এফ রহমান হলের পূর্ব পাশে ও হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের খেলার মাঠের
অগ্রভাগে এই বসুনিয়া তোরণ অবস্থিত।
১৯৮৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাউফুন বসুনিয়ার আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ একটি আবক্ষ প্রতিকৃতি ও তোরণ স্থাপন করা হয়, যা ‘বসুনিয়া তোরণ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন।

ইতিহাসঃ


রাউফুন বসুনীয়া ছিলেন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদানকারী অন্যতম প্রধান নেতা। বাকশাল সমর্থিত জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক, সমাজবিজ্ঞান শেষ বর্ষের ছাত্র রাউফুন বসুনিয়া ছিলেন স্বৈরাচারের আতঙ্ক। ১৩ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৫ রাত ১১ টার দিকে স্বৈরাচার বিরোধী এক মিছিলে নেতৃত্বদানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ইউনিভার্সিটি ল্যাবোরেটারী স্কুলের সামনে তৎকালীন সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। তার আত্মত্যাগ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে। যার ফলশ্রুতিতে এরশাদ সরকারের পতন হয়। তার আত্মত্যাগে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্তে স্থাপন করে।



মধুদার ভাস্কর্যঃ

ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর নামে পরিচিত ‘মধুর রেস্তোরাঁ’ যেটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে সর্বাধিক পরিচিত। বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই মধুর ক্যান্টিন। মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রনেতারা বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আলোচনায় বসতেন,এখনো বসেন!তাই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর রোষানলে পড়ে মধুর ক্যান্টিন ১৯৭১ সালে। মুক্তিযুদ্ধের সময় মধুর রেস্তোরাঁ পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং সেই সাথে মালিক মধুসূদন দে কে সপরিবারে হত্যা করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। সবার প্রিয় মধুদার স্মৃতির স্মরণে মধুর ক্যান্টিনের সামনে মধুদার ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।

ছবিঃ প্রথম আলো



ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

ডাকসু ভবনের সামনে এবং কলা ভবনের পেছনে
অবস্থিত একটি রেস্তোরাঁ। এটি “মধুর ক্যান্টিন”‘ নামে অধিক পরিচিত। প্রয়াত মধুসূদন দে’রস্মৃতি স্মরণে স্থাপিত একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁ। ভাস্কর্যটির ভাস্কর হলেন মোঃ তৌফিক হোসেন খান। বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির আঁতুড়ঘর নামে পরিচিত মধুর ক্যান্টিনের আলাদা খ্যাতি রয়েছে  রাজনীতি, সংস্কৃতি চর্চা এবং আড্ডার জন্য।ক্যান্টিনটির সামনেই মধু’দার  ভাস্কর্য রয়েছে। 

ইতিহাসঃ

মুক্তিযুদ্ধে সহয়তা এবং স্বাধীনতাপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের সাথে সুসম্পর্ক থাকার কারণে
১৯৭১ সালে মধুর ক্যান্টিন পাক বাহিনীর রোষানলে পড়ে। এরই সূত্র ধরে ’৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হন মধুদা, তার স্ত্রী, বড় ছেলে ও তার নববিবাহিত স্ত্রী। মধুদার স্মরণে মধুর ক্যান্টিন প্রাঙ্গনেই নির্মিত হয় শহীদ মধুদার স্মৃতি ভাস্কর্য। ভাস্কর্যটির গায়ে লেখা আছে ‘আমাদের প্রিয় মধুদা’ বাক্যটি। ১৯৯৫ সালের ১৮ এপ্রিল তৎকালীন উপাচার্য ড. এমাজ উদ্দীন আহমেদ ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন। পরবর্তীতে ভাস্কর্যটি পুনঃনির্মাণ করা হয় এবং ২০০১ সালের ১৭ মার্চ পুনঃনির্মিত ভাস্কর্যের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য এ. কে আজাদ চৌধুরী।

ঘৃণা স্তম্ভ

মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা বাঙালি হয়েও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছে ,রাজাকার,আল বদর, আল শামসের হয়ে পাকিস্তানীদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি হত্যা করেছে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের জন্যে নির্মিত হয়েছে ঘৃণা স্তম্ভ।

ছবিঃ campuslive24.com



ভাস্কর্য সংক্রান্ত তথ্যঃ

ঘৃণা স্তম্ভ ডাকসু ভবনের সামনে ,কলা ভবনের পূর্ব পাশে অবস্থিত।২০১৭ সালে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে এই স্তম্ভের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মো. আখতারুজ্জামান।


ইতিহাসঃ

২০০৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর রাজাকারদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের লক্ষ্যে ঘৃণা স্তম্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৈয়ব হাবিলদারের নেতৃত্বে স্থাপিত হয়েছিলো।২০০৮ সালে রাতের অন্ধকারে অপশক্তি স্তম্ভটি ভেঙে দিলে আবারও তা নির্মাণ করা হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে উত্তাল যখন বাংলাদেশ ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে ঘৃণাস্তম্ভটি আবার ভেঙে ফেলে অপশক্তি।২০১৬ সালে পুনরায় নির্মাণ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে।

সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত ভাস্কর্য। সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে এবং নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত হয়েছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা’ নামের স্থাপনাটি।

ছবিঃ সংগ্রহীত

স্মৃতিফলক সংক্রান্ত তথ্যঃ

স্মৃতিফলকটি শামসুন্নাহার হলের পূর্বে এবং টিএসসির পশ্চিম পাশে টিএসসির সড়কদ্বীপে অবস্থিত। সড়ক দুর্ঘটনা স্মৃতিস্থাপনা ভাস্কর্যের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও নির্মাণ করেছেন ওই দুর্ঘটনায় আহত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের শিক্ষক শিল্পী ঢালী আল মামুন। স্মৃতিস্থাপনাটির নকশা প্রণয়ন করেছেন স্থপতি সালাহউদ্দিন আহমেদ।

ইতিহাসঃ

২০১১ সালের আগস্টে মানিকগঞ্জে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের সিইও সাংবাদিক মিশুক মুনীর। তাঁদের দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটির বিভিন্ন অংশ ভাস্কর্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো অসংখ্যমানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য স্থাপনাটি তৈরি হয়েছে।তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, ব্র্যাক ও ব্র্যাক ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছে স্মৃতিফলকটি। ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর স্মৃতিফলকটি উন্মোচন করা হয়।


বাংলাদেশ যতবার অত্যাচারী শাসকের অত্যাচারে থমকে গিয়েছে কিংবা হোঁচট খেয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ততবার বাংলাদেশকে পথ দেখিয়েছে। বাঙালিকে আত্মপরিচয়ে উদ্বেলিত করেছিল সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বপ্রথম বাঙালিকে নিজ অধিকার আদায়ের পথ বাতলে দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ৫২,৬৯,৭১,৮৯ সহ সকল অর্জনের সূত্রপাত বাঙালির জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরে। দোর্দন্ড প্রতাপে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেটা বাঙালি শিখেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ একরের প্রাঙ্গণ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ভাস্কর্য কিংবা ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শনগুলো আপনাকে ক্ষণিকের জন্য অতীতে নিয়ে গেলেও আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিবে
বাংলাদেশের মুক্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোবাসা কিংবা ত্যাগের পরিমাণ পরিমাপযোগ্য নয়! ভাস্কর্য কিংবা স্থাপনাগুলো কত ত্যাগের নিদর্শন সে হিসেব সম্ভবত ইতিহাস ও সঠিকভাবে দিতে পারবেনা।