সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে

এম এ হান্নান ! বঙ্গবন্ধুর পর সর্বপ্রথম ব্যাক্তি যিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ২৬ শে মার্চ। দীর্ঘকাল অপশক্তি তাকে ইতিহাস থেকে লুকিয়ে রেখেছিল । কিন্তু ইতিহাস লুকিয়ে রাখার বিষয় নয় ,সত্য একদিন না একদিন প্রকাশিত হয়। আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান ২৬ শে মার্চ দুপুরে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ,সামরিক আবহ প্রদান করেন। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পর এম. এ.হান্নানের ভাষণে বাঙালি নিশ্চিত হয় বাঙালি বীরদর্পে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে লড়ছে।

বঙ্গবন্ধুর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণার প্রথম পাঠক এম এ হান্নান

বঙ্গবন্ধু ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা করার সাথে সাথে গ্রেপ্তার হন। টিক্কা খান ”বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা” শোনার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে।বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হবার পরিস্থিতি আঁচ করেছিলেন কারণ ২৫ শে মার্চ বিকাল থেকে সেনারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ির প্রবেশ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।তাই ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে নিজ বাসভবনে স্থাপিত উচ্চ তরঙ্গের ওয়ারেলস ব্যবহার করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে।ঘোষণাটি হল –

“The enemy has struck us.Hit them back.Victory is ours.Insha Allah.Joy Bangla ” Mujibur Rahman

( “শত্রুরা আমাদের আঘাত করেছে ।আপনারা পাল্টা আঘাত করুন। ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের হবেই। জয় বাংলা।” মুজিবুর রহমান)


২৫ শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আরেকটি স্পষ্ট তথ্য জানা যায় শেখ হাসিনা থেকে,শেখ হাসিনার ভাষ্য অনুযায়ী

” ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ গুলির আঘাত ঝাঁঝরা হয়েছিল আমাদের বাড়ি।রাত ১২-৩০ মিনিটে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার নির্দেশ দেন।আর সেই খবর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পৌছে
দেয়া হল পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এ খবর পাকিস্তানী সেনাদের হাতে পৌছাল।তারা আক্রমণ করলো বাড়িটিকে।১.৩০ মিনিটে তারা আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। আজো মনে পড়ে সেই স্মৃতি। লাইব্রেরি ঘরের দক্ষিণে যে দরজা তার পাশে যে টেলিফোন সেটটি ছিল ঐ জায়গায় দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছেন,যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার
নির্দেশ দিয়েছিলেন।”

চট্টগ্রাম শহরে যখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পর্যদুস্ত করে রেখেছিলো লে.কর্নেল রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে। তখন মেজর রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতাদের তথা এম. এ হান্নান, জহুর আহম্মেদ চৌধুরী,এম আর সিদ্দিককে বলেন চট্টগ্রামে বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে সেটা প্রচার করতে এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে সেটা ঘোষণা করতে।বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ইপিআরের ওয়্যারলেসে চট্টগ্রামে পৌঁছে। সেই বার্তা পাঠানো হয় দামপাড়াস্থ আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায়।

কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র।ছবি : ইন্টারনেট

চট্টগ্রামে বাঙালি সেনাদের মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ.হান্নান ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ দুপুর ২ টা ১০ মিনিটে এবং ২ টা ৩০ মিনিটে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি ‘ জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ‘।এম.এ হান্নান তার ঘোষণায় বাঙালিকে আহবান জানান “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে” এবং বিশ্ব বাসীকে পাকিস্তানীদের বর্বর হত্যাকাণ্ড সমন্ধে অবহিত করা অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ক্ষমতা ছিল ১০ কিলোওয়াট যার ব্যাসার্ধ ছিল ৬০ মাইল পর্যন্ত। ফলে বেশিদূরের মানুষ এম এ হান্নানের ঘোষণা শুনতে পায়নি।তবে চট্টগ্রাম বন্দরে মাল খালাসের দায়িত্বে থাকা জাপানি জাহাজ আব্দুল মান্নানের ভাষণটি শুনতে পায় এবং রেকর্ড করে। এম.এ হান্নান ঘোষণাটি চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর পাঠানো নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করে দেন এবং চূড়ান্ত ভাবে সংশোধন করেন ডা.জাফর।

তবে চট্টগ্রামের

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে স্বাধীনতা ঘোষণার ক্ষেত্রে এম. এ হান্নান, জহুর আহম্মেদ চৌধুরী,এম আর সিদ্দিক এবং মেজর রফিকুল ইসলামের অবদান কম নয়।উনাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঙালি জনগন এবং সেনারা পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে তা দেশবাসী জানতে পারে।

কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের এই কক্ষের ট্রান্সমিটার ব্যাবহার করে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন এম এ হান্নান।ছবি : বাংলাদেশ বেতার

মুক্তিযোদ্ধা এম আর আখতার মুকুল যিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের চরমপত্রের পরিচালক, লেখক ও কথক ছিলেন তার ভাষ্যমতে

” ২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমনের পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা পত্রটি টেলিফোনে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জানান।সেখান থেকে এটি চট্টগ্রামের এম এ হান্নানের কাছে পৌছায় যা তিনি বেতারে পাঠ করেন”

১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে তিনি ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে ‘সোয়াত’ জাহাজ থেকে পাকিস্তানিদের অস্ত্র খালাসের বিরুদ্ধে ছাত্র শ্রমিক জনতাকে নিয়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেন।। পরে তিনি আগরতলা যান এবং সেখানে হরিনা যুব শিবির প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।চট্টগ্রাম থেকে হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ভারতের আগরতলায় নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন এম এ হান্নান। তিনি জগন্নাথ কলেজে ( বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যয়নরত অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্ত্বে ও এম.এ হান্নান বেশীদিন স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকতে পারেননি। এম এ হান্নানের জন্ম পশ্চিম বঙ্গের নদীয়ায়,ভারতভাগের পরে তারা সপরিবারে চট্টগ্রামে চলে আসেন।

১৯৭৪ সালের ১১ জুন চৌদ্দগ্রামে সড়ক দূর্ঘটনায় মারাত্নক ভাবে আহত হন এবং পরদিন ফেনী সরকারি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

এম এ হান্নান এদেশের স্বাধীকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয়  অবদানের জন্য ২০১৩ সালে দেশের “সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার” হিসেবে বিবেচিত মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে বাংলাদেশ সরকার।

বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা এম এ হান্নানের অবদান বিস্মৃতপ্রায়। বাঙালির স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং স্বাধীনতার ঘোষণার অন্যতম পাঠক হওয়া সত্ত্বেও ইতিহাসের পাতায় সেভাবে উঠে আসেনি এম.এ হান্নানের অবদান ।

তথ্যসূত্রঃ

লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে – মেজর রফিকুল ইসলাম

শেখ মুজিব আমার পিতা – শেখ হাসিনা

আমি বিজয় দেখেছি – এম আখতার মুকুল

A WITNESS TO SURRENDER – Siddik Salik