বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যে মুজিববাদ

মুজিববাদ – শেখ মুজিবের জীবনাদর্শের উপর ভিত্তি করে যে মতবাদ বাংলাদেশে প্রচলিত সেটাই মুজিববাদ। জাতীয়তাবাদ,গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র,ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদের সম্মিলন ঘটেছে মুজিববাদে। মুজিববাদের উপর ভিত্তি করেই স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মূলত অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সমাজতান্ত্রিক পন্থা এবং শাসন প্রক্রিয়ায় গনতন্ত্রের উপরে জোর দিয়েছিলেন।জাতির পিতা আমৃত্যু মুজিববাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে সোনার বাংলা বিনির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন।

মুজিববাদ সমন্ধে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল অত্যান্ত পরিষ্কার… মুজিববাদ সমন্ধে বঙ্গবন্ধুর পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭৪ সালের এক সাক্ষাৎকারে…

ভাষণ দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধু

খন্দকার ইলিয়াসের ‘মুজিববাদ’ বই থেকে জানা যায়  তিনি শেখ মুজিবকে জিজ্ঞেস করেন এই মতবাদ সম্পর্কে। 

প্রশ্ন : বঙ্গবন্ধু, আমরা দীর্ঘকাল আপনার রাজনৈতিক জীবনের সংস্পর্শে থেকে লক্ষ্য করে এসেছি যে, বাংলাদেশের নিজস্ব ঐতিহাসিক ধারার বিকাশ ও বাঙালি জাতির চেতনার স্তর বিবেচনায় রেখে আপনি এদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির জন্যে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়ে আসছেন, নিজস্ব একটি মতবাদ ব্যক্ত করে আসছেন। এখন আমার প্রশ্ন আপনি জিন্নাবাদ, গান্ধীবাদ, নাসেরবাদ, ইহুদিবাদ, মাওবাদ, টিটোবাদ, লেনিনবাদ ও মার্কসবাদের আলোকে আপনার মতবাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে কি ভাবছেন?

উত্তর : দেখুন, ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত আমার এই সুদীর্ঘকালের রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রাম কতিপয় চিন্তাধারার উপর গড়ে উঠেছে। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী তথা সকল মেহনতী মানুষের জীবনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সাম্য প্রতিষ্ঠাই আমার চিন্তাধারার মূল বিষয়বস্তু। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। কাজেই কৃষকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে আমি জানি শোষণ কাকে বলে। এ দেশে যুগ যুগ ধরে শোষিত হয়েছে কৃষক, শোষিত হয়েছে শ্রমিক, শোষিত হয়েছে বুদ্ধিজীবীসহ সকল মেহনতী মানুষ। এ দেশে জমিদার, জোতদার, মহাজন ও তাদের আমলা-টাউটদের চলে শোষণ। শোষণ চলে ফড়িয়া-ব্যবসায়ী ও পুঁজিবাদের। শোষণ চলে সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের। এ দেশের সোনার মানুষ, এ দেশের মাটির মানুষ শোষণে শোষণে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের মুক্তির পথ কি? এই প্রশ্ন আমাকেও দিশেহারা করে ফেলে। পরে আমি পথের সন্ধান পাই।

আমার কোনো কোনো সহযোগী রাজনৈতিক দল ও প্রগতিশীল বন্ধুবান্ধব বলেন শ্রেণী সংগ্রামের কথা। কিন্তু আমি বলি জাতীয়তাবাদের কথা। জিন্নাবাদ এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিষবাষ্প। তার জবাবে আমি বলি যার যার ধর্ম তার তার-এরই ভিত্তিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের কথা। সেই সঙ্গে বলি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কথা। শোষণহীন সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সমাজতন্ত্র চাই। কিন্তু রক্তপাত ঘটিয়ে নয়- গণতান্ত্রিক পন্থায়, সংসদীয় বিধিবিধানের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠা করতে চাই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। আমার এই মতবাদ বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিস্থিতি বিচারবিশ্লেষণ করেই দাঁড় করিয়েছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, যুগোশ্লাভিয়া প্রত্যেকে নিজ নিজ পথে, নিজ নিজ অবস্থা মোতাবেক গড়ে তুলছে সমাজতন্ত্র। আমি মনে করি বাংলাদেশকেও অগ্রসর হতে হবে জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র এই চারটি মূল সূত্র ধরে, বাংলাদেশের নিজস্ব পথ ধরে।

আমার উপরোক্ত মতবাদকে অনেকে বলছে ‘মুজিববাদ’। এ দেশের লেখক, সাহিত্যিক কিংবা ঐতিহাসিকগণ আমার চিন্তাধারার কি নামকরণ করবেন সেটা তাঁদের ব্যাপার, আমার নয়। নামকরণের প্রতি আমার কোনো মোহ নেই। আমি চাই কাজ। আমি চাই আমার চিন্তাধারার বাস্তব রূপায়ণ। আমি চাই শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। আমি চাই আমার স্বপ্ন ‘সোনার বাঙলা’ নির্মাণের পূর্ণ বাস্তবায়ন।

এ সাক্ষাতকার থেকে বোঝা যায় স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির জনকের একমাত্র পরম আরাধ্য বিষয় ছিল যেকোন ধরণের বৈষম্য থেকে বাংলার মানুষের স্থায়ী মুক্তি।

তথ্যসূত্রঃ
মুজিববাদ-খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস।
পৃষ্ঠা. – ১৭০-৭১ .