‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ মুক্তিযুদ্ধের নির্মোহ ইতিহাসের সন্ধানে

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের জানবার আকাঙ্ক্ষা দূর্বিবার হয়তবা পরম আরাধ্য কিংবা বহুল কাঙ্খিত।প্রায় সময়ে আমরা সঠিক ইতিহাসের মোড়কে মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে আশাহত হই মুক্তিযুদ্ধের নামে বিভিন্ন লেখকের কল্পকথা শুনে।কেন আশাহত হই এ রহস্য খুঁজতে গিয়ে প্রয়োই আবিষ্কার করি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখকেরা অধিকাংশ ব্যাক্তি মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবেই জড়িত ছিলেন না।তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে ছিলেন কিংবা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নিরপেক্ষ অর্থাৎ দেশের স্বাধীনতার পক্ষেও ছিলেন না বিপক্ষে ও ছিলেন না। অধিকাংশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখক দেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক পটভূমি ,সামাজিক প্রভাব কিংবা মুক্তিযুদ্ধের পারিপার্শ্বিক ঘটনাগুলো এড়িয়ে যেতে চান কারণ তারা জানেন না প্রকৃতপক্ষে মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়েছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খানের ভাষায় “মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে দেশের অধিকাংশ লেখক  দেশের স্বাধীনতা নিয়ে কোন কবিতা ,গল্প ,উপন্যাস লেখেননি, এড়িয়ে গিয়েছেন অধিকাংশ সময়, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রশ্নে আপোষ করেছেন তাদের রচনায়”

বইটি কেন অনন্য

মেজর রফিকুল ইসলামের লেখা ‘এ টেল অব মিলীয়নস ‘ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বইতে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের স্বাদ পাওয়া যাবে।তিনি মুক্তিযুদ্ধের পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বশস্ত্র সংগ্রামের নায়ক এবং ১ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
তার বইটি ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত । লেখকের ১৯৭২ সালে প্রকাশিত চট্টগ্রামের পিপলস ভিউ  পত্রিকায় ছাপা লেখা থেকে বইটি লিখিত।তাই  বইটির দেওয়া তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কারণ তিনি একেবারে সজিব ইতিহাসের স্বাদ দিয়েছিলেন সেই ১৯৭২ সালে ।

বইটির ইংরেজি ভার্সন

মেজর রফিকুল তার বইতে মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ভ্রান্ত মতবাদের বিশ্লেষণ করে সত্য জনসম্মুখে প্রকাশ করেছেন।লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বইটিতে রফিকুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক, সামরিক পটভূমি এবং জনসাধারণের ভূমিকা  তুলে ধরছেন।রাজাকার আল বদর আল শামস এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার বর্বর চিত্র তুলে ধরেছেন বইতে।
তিনি বইটিতে দেখিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সবার সম্মিলিত অবদানের কারণে।

তিনি অসাধারণ ভাবে ইতিহাস বর্ণনা করছেন,আমরা প্রয়ই দেখি লেখকরা তাদের মনগড়া ইতিহাস লিখতে গিয়ে কোথাও রাজনৈতিক দের সমালোচনা করেন কোথাও মুক্তিবাহিনীর,কোথাও সামরিক বাহিনীর কোথাও জনসাধারনের।কিন্তু মেজর রফিক তার বইতে অসাধারণ ভাবে দেখিয়েছেন যে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে বাঙালি জাতির ধর্ম বর্ণ পেশা সবার সম্মিলিত আত্মপ্রত্যয়ী সংগ্রামী প্রতিরোধের আগুনে….

সারসংক্ষেপ এবং বিষয় পর্যালোচনা

মেজর রফিকুল ইসলাম বইয়ের শুরুতে জনসাধারণ কে ধন্যবাদ দিয়েছেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে জনসাধারণ এর প্রত্যক্ষ সহয়তার কারণে। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি জনযুদ্ধ রূপে নিপাট  স্বীকৃতি দিয়েছেন।বইতে তিনি দেখিয়েছেন জনগণ কীভাবে অবদান রেখেছেন মুক্তিযুদ্ধে,পাকিস্তানীদের পর্যদুস্ত করতে সহয়তা করেছিলেন।

বইতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের স্থাপন এবং  ২৬ শে মার্চ দুপুর দুটা দশ মিনিটে এম এ হান্নান এর বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার  পাঠ করার ঘটনা উল্লেখ করেছেন। কীভাবে সবার সম্মিলিত অর্থাৎ রাজনীতিবিদ সামরিক কর্মকর্তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়   স্বাধীনতার ঘোষণা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পাঠ করা হয় সেটা উল্লেখ করে দিয়েছেন ।

২৬-২৭ তারিখ পর্যন্ত তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মাধ্যমে চট্টগ্রাম দখল করে রেখেছিলেন,প্রায় হাজারের অধিক পাকিস্তানী সেনাকে কতলের ইতিহাস উল্লেখ করেছেন। যৎসামন্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে তিনি পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে অবতীর্ণ ছিলেন তার রেজিমেন্ট নিয়ে।

তিনি বইতে সুস্পস্টভাবে গেরিলা বাহিনী,মুজিব বাহিনী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদানের কথা কতজ্ঞ  চিত্তে বর্ণনা করেছেন।তিনি দেখিয়েছেন সবার সম্মিলিত অবদানে কীভাবে নয়মাসে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মানকেশের বুদ্ধিতীপ্ত মাইন্ড গেমে হতবুদ্ধি হয়ে পাকিস্তানীরা মাত্র দুই দিনের ব্যাবধানে আত্মসমর্পন করে এক লক্ষের অধিক সৈন্য রিজার্ভে থাকা সত্ত্বেও।

মুক্তিযুদ্ধের সেনানায়ক বৃন্দ ।সূত্র: বই

তিনি বইতে সেক্টর কমান্ডার সমন্ধে কতিপয় ভুল ধারণা ও ভেঙ্গে দিয়েছেন ।তিনি বইতে পরিস্কার ভাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন
১৯৭১ সালে দেশকে বিভিন্ন সেক্টর ভাগ করা হয়েছিল জুলাই মাস থেকে, তার আগে নয়৷ তিনি জানান, ১০ থেকে ১৭ জুলাই কলকাতায় সেক্টর কমান্ডারদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল৷ সেই সম্মেলনেই নির্ধারন করা হয়, বাংলাদেশকে কয়েটি সেক্টরে ভাগ করা হবে, কে কে সেক্টর কমান্ডার হবেন, কয়টা ব্রিগেড তৈরি হবে, কোনটার কমান্ডার কে হবেন৷

তার বইতে উল্ল্যেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে জনসাধারণের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে যথাযথ মূল্যায়ন করা। খালের উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করে দেওয়া,হাজার হাজার বাঙালিকে হত্যা করা সত্ত্বেও বাঙালিরা শোককে অগ্রাহ্য করে বীর দর্পে সাহায্য করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের, বৃদ্ধ মহিলার পুত্র শোক কাটিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের জন্য  সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ সবই তিনি কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করেছেন।

তিনি বইতে হঠকারী সেনা কর্মকর্তাদের দ্বিচারিতার
ঘটনা প্রকাশ করে দিয়েছেন। মেজর জিয়ার ভুল  সিদ্ধান্তের কারণে ১০০০+ বাঙালি সেনা মর্মান্তিক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কর্তৃক। জিয়ার প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হয়ে লে কর্নেল এ আর চৌধুরী পাকিস্তানীদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। মেজর জিয়া এবং কর্নেল এ আর চৌধুরী নিজের উপরে আঘাত না আসা পর্যন্ত  পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেননি। জিয়া ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনীর অস্ত্র খালাসের জন্য পোর্টের দিকে যাচ্ছিলেন,কিন্তু মেজর রফিকের বদান্যতায়  ওই যাত্রায় প্রাণ রক্ষা পায় জিয়ার।এছাড়া বই থেকে মুক্তিযুদ্ধে জিয়া কর্তৃক ২৬-২৭ মার্চ রাতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ আছে।

১ নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের নিহত সৈনিকদের কবর যারা জিয়ার হঠকারিতার কারণে সেনানিবাসে বন্দী ছিল

মেজর রফিক দেখিয়েছেন বইতে রাজনীতিবিদদের সাথে সেনাবাহিনীর গোপন যোগাযোগ। কীভাবে ড. জাফরের মাধ্যমে তারা বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রতিরোধের বার্তা আদান প্রদান করতেন পাকিস্তানী গোয়েন্দাদের এড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধে এম এল এ ও রাজনৈতিকদের শরণার্থী শিবিরে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ , যাচাই বাছাই করা এবং সংগঠিত করে সুচারুভাবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন করার ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

মেজর রফিকুল ইসলাম বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ঘটনা প্রকাশ করেতে চেয়েছেন,কোন কিছু অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন  করতে চাননি।মুক্তিযুদ্ধের বইগুলোতে সাধারণত অধিকাংশ লেখক নিজেকে নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করতে চান ,কিন্তু মেজর রফিকুল ইসলামের সে প্রচেষ্টা দেখা যায়নি বইটিতে। বইটিতে নিজেকে  উপস্থাপনের চাইতে মেজর  রফিকুল বাঙালি জাতির সকলকে নায়কের আসনে  প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভ্রান্ত মতবাদ এবং দ্বিচারী ব্যাক্তিদের   মুখোশ উন্মোচন করতে তিনি সাহসের পরিচয় দিয়েছেন।