১৫ই আগস্ট ট্রাজেডী ও বঙ্গভবনের অজানা অধ্যায়

“…আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর মূখ্য সচিব পি.এন. হাকসার লন্ডন থেকে ‘৭৫-এর সেপ্টেম্বর মাসে রুহুল কুদ্দুস সাহেবকে দিল্লি নিয়ে যান তাঁকে ব্রিফ করার জন্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনন্ত প্রেরণার উত্‍স শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সাক্ষাতের প্রথমেই তাঁর কাছে বার বার প্রশ্ন করে জানতে চান যে, “শেখ মুজিব কোন সাহায্য চাননি কেন? সব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সাহায্যের জন্য শেখ মুজিব তাঁর কাছে কোন ‘মেসেজ’ দেননি কেন?”

বঙ্গবন্ধুর মূখ্য সচিব জনাব রুহুল কুদ্দুস দিল্লিতে ৪ দিন প্রায় ৮ ঘন্টা শ্রীমতি গান্ধীকে ব্রিফ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে মোগল সম্রাটদের প্যালেসের আদলে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির তলা দিয়ে একটা গোপন সুড়ঙ্গ (গোপনীয়তার সাথে সে সুড়ঙ্গ করে দেবার কথা ছিল চেকোস্লোভাকিয়ার ইঞ্জিনিয়ার ও লেবারদের) করার এবং তার বাড়ির আধা কিলোমিটার দূরে আদর্শ কলেজে একটি মিনি রক্ষীবাহিনী ক্যাম্প করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল বলে শ্রীমতি গান্ধীকে জানান। ইন্ধিরা গান্ধী ৭৪ সালে তা জানতেন। তিনি আগ্রহের সাথে জানতে চান, সে ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়নি কেন? জনাব রুহুল কুদ্দুস জানান যে, উক্ত দুই গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু এই বলে পরিকল্পনাগুলো বাতিল করে দেন যে,

“মৃত্যু  ভয়ে আমি যদি কাতর হই, তাহলে বীর প্রসবিনী বঙ্গজননীর গর্ভে আর কোন সাহসী বীর সন্তান পয়দা হবে না!”



..জনাব রুহুল কুদ্দুসের মুখের বয়ান শেষ না হতেই ..শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী দু’হাত এক করে কপালে তুলে বঙ্গবন্ধুর বিদেহী আত্মার প্রতি সশ্রদ্ধ নমস্কার করেন।

..মামা তাঁকে আরও বলেছিলেন যে, ১৪ই আগস্ট বাংলাদেশ সময় আনুমানিক রাত ১১টা অর্থাত্‍ ১৫ই আগস্টের আগের রাতে বঙ্গবন্ধু নিজেই লন্ডনে আমার মামাকে ফোন করেছিলেন। মামীর সাথেও কথা বলেছিলেন। মামাকে বঙ্গবন্ধু বার বার জলদি চলে আসার জন্য বলেছিলেন। মামা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি হুকুম দিচ্ছেন, চলে আসবো। আপনার হুকুম আমার কাছে সব। তবে এতবার বলছেন কেন?” বঙ্গবন্ধু হঠাত্‍ চুপ করে থাকলেন। প্রায় এক মিনিট/দেড় মিনিট সেই long distance call hold করে রাখলেন। সেটা চিন্তা করে মামা দু’বার “হ্যালো, হ্যালো, আপনি কি ফোনে আছেন” জিজ্ঞাসা করতেই বঙ্গবন্ধু বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, এতবার বলছি এজন্য, এখানে অনেক কিছু ঘটতে যাচ্ছে। তুমি এসে একটু হাল ধরো। আমার পাশে থাকো…।”

…কিন্তু ১৪ই আগস্টের রাতের কণ্ঠস্বর তাঁর কাছে অচেনা মনে হলো। তিনি উদ্বিগ্নচিত্তে বলে ফেললেন, কর্নেল জামিল কি ডি.জি.এফ.আই-এর ডিজি হিসাবে টেকওভার করেছে? তিনি বললেন: “হ্যাঁ, করেছে।” মামা বললেন: “জিয়া-শফিউল্লাহ দ্বন্দ্বের এবং তাজউদ্দিন সাহেব ও মোশতাকের দ্বন্দ্বের অবসান না হলে সব সময় আপনাকে টেনশনের মধ্যে থাকতে হবে।” বঙ্গবন্ধু বললেন, “সব হবে, তুমি কাল-পরশু চলে আসো তো। না আসলে আমাকে কিন্তু আর পাবা না!”…

আরও কিছু পরে আবার বঙ্গবন্ধুর ফোন। ধরলেন মামী। …”হামিদা ওকে নিয়ে কালই চলে এসো”। মামী বললেন: “ওঁনার শরীরটা এখনো খারাপ।” বঙ্গবন্ধু বললেন: “ওষুধপত্র নিয়ে চলে এসো। এখানে কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না।”

বঙ্গবন্ধুর ফোন ছেড়ে মামী সব বললেন মামাকে। মামা বললেন, “প্রস্তুত হও। দুই-এক দিনের মধ্যে চলে যাই। যেতে হবে। তাজউদ্দিন সাহেব কেবিনেটে না থাকায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা ওয়াক ওভার পেয়ে যাচ্ছে। এবার ফিরে, সবার আগে ৩২ নম্বরের আন্ডার গ্রাউন্ড টানেলটা করতে হবে।”

বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় ফোন আসায় আমার মামা বিচলিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে ডি.জি.এফ.আই-এর ডি.জি.কর্নেল জামিলকে ফোন করলেন। তখন বাংলাদেশ সময় রাত পৌনে বারোটা হবে। কর্নেল জামিলকে ফোনে পেয়ে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলেন: “তুমি ডি.জি.এফ.আই’র পুরো দায়িত্ব বুঝে নিয়েছো?” কর্নেল জামিল উত্তরে বললেন: আজই নিলাম স্যার, তবে কয়েকটি আয়রন সেফের চাবি আমাকে এখনো বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। তার কথা শুনে মামা বিস্মিত হয়ে গেলেন এবং তাঁকে বললেন: “এগুলো ভালো লক্ষণ না। এটা তুমি বুঝতে পারছো না কেন? পরদিন সকালেই অফিসের TOP SECRET সকল ফাইল ও আয়রন সেফের সকল TOP SECRET রিপোর্ট তোমার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেবে। এগুলো হস্তগত ও বাস্তবায়িত করে আমাকে ফোন করে জানাবে। বঙ্গবন্ধুর সাথে এইমাত্র কথা বলে তোমাকে এই নির্দেশ আমি দিচ্ছি। আমি ২/১ দিনের মধ্যে দেশে ফিরে দেখবো চার্জ নিতে তোমার এত দেরি হলো কেন? “something is very abnormal…” কর্নেল জামিল উত্তরে শুধু ছোট করে জানালো, “স্যার কর্নেল রউফ (পাকিস্তান প্রত্যাগত) আমাকে চার্জ দিতে চাচ্ছিল না, time kill করছিল এবং তার delay tactics এ একজন সিনিয়র অফিসার জড়িত আছে। আপনি ফিরে এলে স্যার, আপনাকে সামনা-সামনি বলবো।” (সেই সিনিয়র জেনারেল ছিলেন জেনারেল জিয়া)।

…চেকোস্লোভাকিয়া থেকে প্রয়োজনীয় আধুনিক খনন সরঞ্জামাদি এবং ইস্পাতের অটো টানেলের বডি ঢাকায় এসে পৌঁছে। ‘৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলে মোশতাকের অনুগত পুলিশ সার্ভিসের সাবেক আইজি আব্দুর রহিমকে রাষ্ট্রপতির পদে নিয়োগ দিলে সব অঘটন ঘটতে থাকে। …যোগদানের সাথে সাথে রাষ্ট্রের “TOP SECRET” ফাইলে তার অনুপ্রবেশ ঘটে। তিনি উক্ত টানেলের তথ্য জেনে যান। কিন্তু অগ্রগতির বিস্তারিত না জানতে পেরেও তিনি যোগদান করার এক সপ্তাহের মধ্যে বিদেশি দূতদের জানিয়ে দেন যে, “Sheikh Mujib became unpopular and construction tunnel under his house to flee out of country…” ভিয়েতনাম রাষ্ট্রদূতের কাছে থেকে এ সংবাদ বঙ্গবন্ধুর কানে পৌঁছামাত্র বঙ্গবন্ধু ক্রুদ্ধ হন এবং রুহুল কুদ্দুস মামাকে ডেকে তাঁর অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে দেন। মামা বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে ব্যর্থ হন।…কিন্তু বঙ্গবন্ধু উত্তরে বলেন,

“কিন্তু টানেলের খবর জানাজানি হবার পর তোমরা যদি টানেল করো তাহলে আমার অপমৃত্যু হবে।…”


তথ্যসূত্রঃমুসা সাদিক, ১৫ই আগস্ট ট্রাজেডী ও বঙ্গভবনের অজানা অধ্যায়