পুরনো পচাগলা সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়তে হবে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের শেষ জনসভা যেখানে তিনি বাকশাল কায়েমের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেন..

১৯৭৫ সালের ২৫ শে মার্চ তিনি স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণটি দেন আপামর জনতার উদ্দেশ্যে।

আমার ভাই ও বোনেরা,

আজ ২৬শে মার্চ ১৯৭৫ সাল। একাত্তরের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষকে আক্রমণ করেছিল। হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোককে হত্যা করেছিল। সেদিন রাতে বিডিআর-এর ক্যাম্পে, পুলিশ ক্যাম্পে, আমার বাড়িতে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং চারিদিকে আক্রমণ চালায় ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে পাশবিক শক্তি নিয়ে। বাংলার মানুষকে আমি ডাক দিয়েছিলাম। ৭ই মার্চ আমি তাদের প্রস্তুত করে দিয়েছিলাম। যখন দেখলাম আক্রমণ শুরু হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে আবার আমি ডাক দিয়েছিলাম। আর নয়, মোকাবিলা কর। বাংলার মানুষ যে যেখানে আছ, যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুদের মোকাবিলা কর। বাংলার মাটি থেকে শুক্রকে উৎখাত করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীন করতে হবে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।



দুনিয়ার মানুষের কাছে আমি সাহায্য চেয়েছিলাম। আমার সামরিক বাহিনীতে যারা বাঙালি ছিল, তাদের এবং আমার বিডিআর, আমার পুলিশ, আমার ছাত্র, যুবক ও কৃষকদের আমি আহ্বান করেছিলাম। বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে মোকাবিলা করেছিল। ৩০ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছিল, শতশত বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। দুনিয়ার জঘন্যতম ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানি শোষক শ্রেণী। দুনিয়ার ইতিহাসে এত রক্ত স্বাধীনতার জন্য কোন দেশ দেয় নাই, যা বাংলার মানুষ দিয়েছে। শুধু তাই নয়, তারা। এমনভাবে পঙ্কিলতা শুরু করল। যা কিছু ছিল ধ্বংস করতে আরম্ভ করল। ভারতে আমার এক কোটি লোক আশ্রয় নিয়েছিল। তার জন্য আমরা নিশ্চয়ই কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করব। আমি তাদের স্মরণ করি, খোদার কাছে তাদের মাগফেরাত কামনা করি, যারা এদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে, আত্মাহুতি দিয়েছে। আমি তাদের স্মরণ করব, যে সকল মুক্তিবাহিনীর ছেলে, যেসব মা-বোন, আমার যে কর্মীবাহিনী, যারা আত্মাহুতি দিয়েছিল, শহীদ হয়েছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামে। এদেশ তাদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর যারা জীবন দিয়েছিল বাংলার মাটিতে, আজ তাদের কথাও আমি স্মরণ করি। এখানে একটা কথা আপনাদের মনে আছে, পাকিস্তানিরা যাওয়ার পূর্বে ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে, ১৬ই ডিসেম্বরের আগে, কারফিউ দিয়ে ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গায় আমার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করব, সম্পদ ধ্বংস করব, বাঙালি স্বাধীনতা পেলেও এই স্বাধীনতা রাখতে পারবে না। ইনশাল্লাহ, বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা হয়েছে। বাংলার লোক স্বাধীন হয়েছে। বাংলার পতাকা আজ দুনিয়ায় ওড়ে। বাংলাদেশ আজ জাতিসংঘের সদস্য। বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ গুলোষ্ঠীর সদস্য, কমনওয়েলথের সদস্য, ইসলামি সামিট এর সদস্য। বাংলাদেশ দুনিয়ায় এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে, কেউ একে ধ্বংস করতে পারবে না।

ভাইয়েরা-বোনেরা আমার, আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু একটা ওয়াদা আমি রাখতে পারি নাই। জীবনে যে ওয়াদা আমি আমি চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু একটা ওয়াদা আমি রাখতে পারি নাই। জীবনে যে ওয়াদা আমি করেছি, জীবন দিয়ে হলেও সে ওয়াদা আমি পালন করেছি। আমরা সমস্ত দুনিয়ার রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। আমরা জোটনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বস করি, আমরা কো-একজিস্টেনস-এ বিশ্বাস করি, আমরা বিশ্বশান্তিতে বিশ্বাস করি। আমরা ভেবেছিলাম, পাকিস্তানিরা নিশ্চয়ই দুঃখিত হবে, আমার সম্পদ ফেরত দেবে। আমি ওয়াদা করেছিলাম, তাদের বিচার করব। এই ওয়াদা আপনাদের পক্ষ থেকে খেলাপ করেছি। তাদের আমি বিচার করি নি। আমি ছেড়ে দিয়েছি এই জন্য যে, এশিয়ায়-দুনিয়ায় আমি বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম। দুঃখের বিষয়, পাকিস্তানিরা আমার সম্পদ এক পয়সাও দিল না। আমার বৈদেশিক মুদ্রার কোন অংশ আমাকে দিল না। আমার গোল্ড রিজার্ভের কোন অংশ আমাকে দিল না। একখানা জাহাজও আমাকে দিল না। একখানা প্লেনও আমাকে দিল না। কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদ এক পয়সাও দিল না। এবং যাওয়ার বেলায় পোর্ট ধ্বংস করল, রাস্তা ধংস করল, রেলওয়ে ধ্বংস করল, জাহাজ ডুবিয়ে দিল। শেষ পর্যন্ত কারেন্সি নোট জ্বালিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানিরা মনে করেছিল, বাংলাদেশকে যদি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করতে পারি তাহলে বাংলাদেশের মানুষকে দেখাতে পারব যে, তোমরা কি করছ। ভুট্টো সাহেব বক্তৃতা করেন। আমি তাকে সংবর্ধনা দিয়েছিলাম, লাহোরে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল বলে। ভুট্টো সাহেব বলেন, বাংলাদেশের অবস্থা কী? ভুট্টো সাহেবকে আমি জিজ্ঞাসা করি, ফ্রন্টিয়ারের পাঠানদের অবস্থা কী? ভুট্টো সাহেবকে জিজ্ঞাসা করি, বেলুচিস্তানের মানুষের অবস্থা কী? অ্যারোপ্লেন দিয়ে গুলি করে মানুষ হত্যা করছেন। সিন্ধুর মানুষের অবস্থা কী? ঘর সামলান বন্ধু, ঘর সামলান। নিজের কথা চিন্তা করুন। পরের জন্য চিন্তা করবেন না। পরের সম্পদ লুট করে খেয়ে বড় বড় কথা বলা যায়। আমার সম্পদ ফেরত দেওয়া পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হতে পারে না। তোমরা আমার কী করেছ? আমি সবার বন্ধুত্ব কামনা করি। পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে আমার কিছু বলার নাই। কিন্তু আমার সম্পদ তাকে দিতে হবে। আমরা চাই সকলের সাথে বন্ধুত্ব। আমি দুনিয়ার প্রত্যেক রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, কারো সাথে দুশমনি করতে চাই না। সকলের সাথে বন্ধুত্ব করে আমরা শান্তি চাই। আমার মানুষ দুঃখী, আমার মানুষ না খেয়ে কষ্ট পায়।

আমি যখন বাংলাদেশ সরকার পেলাম, যখন জেল থেকে বের হয়ে এলাম, তখন আমি শুধু বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষই পেলাম। ব্যাংকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। আমাদের গোল্ড রিজার্ভ ছিল না। শুধু কাগজ নিয়ে আমরা সাড়ে সাত কোটি লোকের সরকার শুরু করলাম। আমাদের গুদামে খাবার ছিল না। গত তিন-চার বৎসরে না হলেও বিদেশ থেকে ২২ কোটি মণ খাবার বাংলাদেশে আনতে হয়েছে। বাইশ শ’ কোটি টাকার মতো, বিদেশ থেকে হেল্প আমরা পেয়েছি। সেজন্য যারা আমাদের সাহায্য করেছে, সে-সমস্ত বন্ধু রাষ্ট্রকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আর একটি কথা। অনেকে প্রশ্ন করেন, আমরা কী করেছি? আমরা যখন ক্ষমতায় এলাম, দেশের ভার নিলাম, তখন দেশের রাস্তা-ঘাট যে অবস্থায় পেলাম, তাকে রিপেয়ার করবার চেষ্টা করলাম। সেনাবাহিনী নাই, প্রায় ধ্বংস করে গেছে। পুলিশ বাহিনীর রাজারবাগ জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই খারাপ অবস্থা থেকে ভালো করতে কী করি নাই? আমরা জাতীয় সরকার গঠন করলাম। আমাদের এখানে জাতীয় সরকার ছিল না। আমাদের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট ছিল না, বৈদেশিক ডিপার্টমেন্ট ছিল না, প্ল্যানিং ডিপার্টমেন্ট ছিল না। এখানে কিছুই ছিল না। তার মধ্যে আমাদের জাতীয় সরকার গঠন করতে হলো। যারা শুধু কথা বলেন, তারা বুকে হাত দিয়ে চিন্তা করে বলুন, কী করেছি। এক কোটি লোককে ঘরবাড়ি দিয়েছি। রাষ্ট্রের লোককে খাওয়ানোর জন্য বিদেশ থেকে খাবার আনতে হয়েছে। পোর্টগুলোকে অচল থেকে সচল করতে হয়েছে। দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে ২২ কোটি মণ খাবার এনে বাংলার গ্রামে গ্রামে দিয়ে বাংলার মানুষকে বাঁচাতে হয়েছে।

এরপরও কথা আছে। আমি মানুষকে বললাম, আমার ভাইদের বললাম, মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের বললাম, তোমাদের অস্ত্র জমা দাও। তারা অস্ত্র জমা দিল। কিন্তু এক দল লোক আমার জানা আছে, যাদের পাকিস্তান অস্ত্র দিয়ে গিয়েছিল, তারা অস্ত্র জমা দেয় নি। তারা এসব অস্ত্র দিয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করতে আরম্ভ করল। এমনকি, পাঁচজন পালামেন্টের সদস্যকেও তারা হত্যা করল। তবুও আমি শাসনতন্ত্র দিয়ে নির্বাচন দিলাম। কিন্তু যদি বাংলার জনগণ নির্বাচনে আমাকেই ভোট দেয়, তা হলে সেটা আমার দোষ নয়। ৩১৫টি সিটের মধ্যে ৩০৭টি সিট বাংলার মানুষ আমাকে দিল। কিন্তু একদল লোক বলে, কেন জনগণ আমাকে ক্ষমতা দিল? কোন দিন কোন দেশে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে কাউকে এভাবে অধিকার দেয় না। কিন্তু অধিকার ভোগ করতে হলে তার জন্য যে রেসপনসিবিলিটি আছে, সেটা তারা ভুলে গেল। আমি বললাম, তোমরা অপজিশন সৃষ্টি কর। তারা তা সৃষ্টি করল। বক্তৃতা করতে আরম্ভ করল। কিন্তু সেই সঙ্গে অন্ধকারে মানুষ হত্যা করতে আরম্ভ করল। দরকার হলে অস্ত্র দিয়ে আমাদের মোকাবিলা করতে চায়। অস্ত্রের হুমকি দেওয়া হলো।

মানুষ হত্যা থেকে আরম্ভ করে রেল লাইন ধ্বংস করে, ফারটিলাইজার ফ্যাক্টরি ধ্বংস করে, জাহাজ ডুবিয়ে দিয়ে তারা এমন অবস্থার সৃষ্টি করল, যাতে বিদেশি এজেন্ট যারা দেশের মধ্যে আছে, তারা সুযোগ পেয়ে গেল। আমাদের কর্তব্য মানুষকে বাঁচানো। চারিদিকে হাহাকার। স্বাধীনতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত দুনিয়ার সমস্ত জিনিসের দাম আস্তে আস্তে বেড়ে গেল। সমস্ত দুনিয়া থেকে আমাদের কিনতে হয়। খাবার কিনতে হয়, কাপড় কিনতে হয়। ঔষধ কিনতে হয়। তেল কিনতে হয়। আমরা তো কলোনি ছিলাম। দুই শ’ বছর ইংরেজদের কলোনি ছিলাম, পঁচিশ বছর পাকিস্তানের কলোনি ছিলাম। আমাদের তো সব কিছুই বিদেশ থেকে কিনতে হয়। কিন্তু তারপরেও বাংলার জনগণ কষ্ট স্বীকার করে কাজ করতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু তারা তাদের এগুলোতে, কাজ করতে দেয় না। আর একদল বিদেশে সুযোগ পেল। তারা বিদেশ থেকে অর্থ এনে বাংলার মাটিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করল। স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করবার চেষ্টা করল। আজ এদিনে কেন বলছি একথা? অনেক বলেছি, এত বলার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার চোখের সামনে মানুষের মুখ ভাসে। আমার দেশের মানুষের রক্ত ভাসে। আমার চোখের সামনে ভাসে আমারই মানুষের আত্মা। আমার চোখের সামনে সে সমস্ত শহীদ ভাইয়েরা ভাসে, যারা ফুলের মতো ঝরে গেল, শহীদ হলো। রোজ কিয়ামতে তারা যখন বলবে, আমরা রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করলাম, তোমরা স্বাধীনতা। নস্যাৎ করেছ, তোমরা রক্ষা করতে পার নাই, তখন তাদের আমি কি জবাব দেব? আর একটি কথা। কেন সিস্টেম পরিবর্তন করলাম? সিস্টেম পরিবর্তন করেছি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য। সিস্টেম পরিবর্তন করেছি শখলা ফিরিয়ে আনবার জন্য। কথা হলো, এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে, অফিসে গিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে যায়, সাইন করিয়ে নেয়। ফ্রি স্টাইল! ফ্যাক্টরিতে গিয়ে কাজ না করে টাকা দাবি করে। সাইন করিয়ে নেয়, যেন দেশে সরকার নাই। আবার শ্লোগান হলো, বঙ্গবন্ধু কঠোর হও। বঙ্গবন্ধু কঠোর হবে। কঠোর ছিল, কঠোর আছে। কিন্তু দেখলাম, চেষ্টা করলাম। এত রক্ত, এত ব্যথা, এত দুঃখ। তার মধ্যে ভাবলাম, দেখি, কী হয়, কিছু করতে পারি কি-না। আবদার করলাম, আবেদন করলাম, অনুরোধ করলাম, কামনা করলাম, কিন্তু কেউ কথা শোনে না। চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র।

ভায়েরা, বোনেরা আমার, আজকে যে সিস্টেম করেছি, তার আগেও ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুর কম ছিল না। আমি বিশ্বাস করি ক্ষমতা বন্দুকের নলে। আমি বিশ্বাস করি, ক্ষমতা বাংলার জনগণের কাছে। জনগণ যেদিন বলবে, ‘বঙ্গবন্ধু ছেড়ে দাও’, বঙ্গবন্ধু তারপর একদিনও রাষ্ট্রপতি, একদিনও প্রধানমন্ত্রী থাকবে না। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করে নাই। বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে দুঃখী মানুষকে ভালোবেসে, বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছে শোষণহীন সমাজ করার জন্য। দুঃখের বিষয়, তারা রাতের অন্ধকারে পাঁচজন পার্লামেন্টের সদস্যকে হত্যা করেছে, চার হাজার – তন হাজারের মতো কর্মীকে হত্যা করেছে। আরেক দল দুর্নীতিবাজ টাকা-টাকা, পয়সা-পয়সা করে পাগল হয়ে গেছে। তবে যেখানে সেখানে দুর্নীতি ছিল, গত দুই মাসের মধ্যে কিছুটা ইনশাআল্লাহ ইম্প্রভ করেছে। দুর্নীতি বন্ধ করা। আজকে কী হয়েছে? হ্যা, প্রেসিডেন্সিয়াল ফরম অব গভর্নমেন্ট করেছি। জনগণ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। পার্লামেন্ট থাকবে। পার্লামেন্টের নির্বাচনে একজন, দুইজন, তিনজনকে নমিনেশন দেওয়া হবে। জনগণ বাছবে, কে ভালো, কে মন্দ। আমরা চাই শোষিতের গণতন্ত্র, আমরা চাই না শোষকের গণতন্ত্র। (জনতার করতালি।) এটা পরিষ্কার।

কিন্তু দুঃখের বিষয়। কেন? আমি প্রোগ্রাম দিয়েছি। আজকে আমাদের সামনে কাজ কি? আজ আমাদের সামনে অনেক কাজ। আমি সকলকে অনুরোধ করব, আপনারা মনে কিছু করবেন না, আমার কিছু আজকে উচিত কথা কইতে হবে। কারণ, আমি কোন দিন ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি নাই। সত্য কথা বলার অভ্যাস আমার আছে। মিথ্যা কথা বলার অভ্যাস নাই আমার। কিন্তু কিছুটা অপ্রিয় কথা বলব। বন্যা হলো, মানুষ না খেয়ে কষ্ট পেল, হাজার হাজার লোক না খেয়ে মরে গেল, দুনিয়া থেকে ভিক্ষা করে আনলাম, পাঁচ হাজার সাতশ লঙ্গরখানা খুললাম মানুষকে বাঁচাবার জন্য। সাহায্য নিয়েছি মানুষকে বাঁচাবার জন্য।

আমি চেয়েছিলাম স্বাধীনতা। কী স্বাধীনতা? আপনাদের মনে আছে, আমার কথার মধ্যে দুইটি কথা ছিল। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে। যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তা হলে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না। আজ দুর্নীতিবাজ- কে দুর্নীতিবাজ? যে ফাঁকি দেয়, সে দুর্নীতিবাজ। যে ঘুষ খায়, সে দুর্নীতিবাজ। যে স্মাগলিং করে, সে দুর্নীতিবাজ। যে ব্ল্যাক মার্কেটিং করে, সে দুর্নীতিবাজ। যে হোর্ড করে, সে দুর্নীতিবাজ। যারা কাজের কর্তব্য পালন করে না, তারা দুর্নীতিবাজ। যারা বিবেকের বিরুদ্ধে কাজ করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। যারা বিদেশের কাছে দেশকে বিক্রি করে, তারাও দুর্নীতিবাজ। এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম শুরু করতে হবে। আমি কেন ডাক দিয়েছি? এইযে ঘুণে ধরা ইংরেজ আমলের, পাকিস্তানি আমলের যে শাসন ব্যবস্থা, তা চলতে পারে না। একে নতুন করে সেজে ঢেলে গড়তে হবে। তা হলে দেশের মঙ্গল আসতে পারে, না হলে আসতে পারে না।

আমি তিন বৎসর দেখেছি। দেখে শুনে আমি আমার এটা স্থির বিশ্বাসে পৌছেছি। এবং তাই জনগণকে পৌছিয়ে দিতে হবে শাসনতন্ত্রের মর্মকথা। আজকে জানি, আপনাদের কষ্ট। আমি জানি, আপনারা না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আমার চেয়ে অধিক কে জানতে পারে? বাংলার কোন্ থানায় ঘুরি নাই। বাংলার কোন জায়গায় আমি যাই নাই? বাংলার মানুষকে আমার মতো কে ভালো করে জানে? আপনারা দুঃখ পান, আপনারা না খেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। আপনাদের গায়ে কাপড় নাই। আপনাদের শিক্ষা দেবার পারতেছি না। কিন্তু সবচেয়ে বড় জিনিস খাদ্য। একটা কথা বলি আপনাদের কাছে – এই দুর্নীতিবাজদের – কোনোদিন সরকারি আইন করে দুর্নীতিবাজ দমন করা সম্ভব নয়, জনগণের সমর্থন ছাড়া। আজকে আমার একটি অনুরোধ হবে আপনাদের কাছে। সেটা হল এই – আমি বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল, কেন? জেহাদ করতে হবে, যুদ্ধ করতে হবে- শক্রর বিরুদ্ধে। আজকে আমি বলব বাংলার জনগণকে, এক নম্বর কাজ হবে, যে দুর্নীতিবাজদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। আমি আপনাদের সাহায্য চাই। কেমন করে করতে হবে? আইন চালাব। ক্ষমা করব না। যাকে পাব, ছাড়ব না। একটা কথা আপনাদের করতে হবে জনগণের এমন গণআন্দোলন করতে হবে- আমি গ্রামে গ্রামে নামব। এমন আন্দোলন করতে হবে। যে ঘুষখোর, যে দুর্নীতিবাজ, যে মুনাফাখোর, যে আমার জিনিস বিদেশে চালান দেয়, তারে সামাজিক বয়কট করতে হবে। একথা মনে রাখতে হবে। গ্রামে গ্রামে মিটিং করে দেখতে হবে, ওই চোরা, ওই ব্ল্যাকমার্কেটিয়ার, ওই ঘুষখোর। ভয় নাই, কোন ভয় নাই, আমি আছি। ইনশাল্লাহ, আপনাদের অত্যাচার করতে দেব না। কিন্তু আপনাদের গ্রামে গ্রামে আন্দোলন করে- পারে কে? ছাত্র ভাইরা পারে। পারে কে? যুবক ভাইরা পারে। পারে কে? বুদ্ধিজীবীরা পারে। পারে কে? জনগণ পারে। আপনারা সংঘবদ্ধ হন। ঘরে ঘরে আপনাদের দুর্গ গড়তে হবে। সে দুর্গ গড়তে হবে এইজন্য যে দুর্নীতিবাজদের খতম কর, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচন কর। এই দুনীতিবাজদের যদি খতম করতে পারি, শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ দুঃখ বাংলার মানুষের চলে যাবে।

এত চোরের চোর – চোর কোত্থেকে যে পয়দা হয়েছে জানি না। পাকিস্তান সব নিয়ে গেছে, কিন্তু এই চোরটুক থুইয়ে গেছে আমগের কাছে। এই চোর নিয়ে গেলি আমি বাঁচতাম। কিছু দালাল গেছে, কিন্তু চোর গেলে বাঁচা যাতো। দ্বিতীয় কথা, আমার – আপনারা জানেন, যে আমার দেশের যে জমিতে ফসল হয়, এই এক একর জমিতে জাপানে ফসল হয় তিনগুণ বেশি। তিন গুণ বেশি। আমার এক একরে যে ফসল হয় – জাপানে তার চেয়ে তিনগুণ বেশি হয়। কিন্তু আমার জমি দুনিয়ার সেরা জমি। আমি কেন সেই জমিতে ডাবল ফসল করতে পারব না, দ্বিগুণ করতে পারব না? আমি যদি দ্বিগুণ করতে পারি তাহলে আমাকে খাদ্য কিনতে হবে না, ভিক্ষা করতে হবে না।

ভায়েরা আমার, বোনেরা আমার, ভিক্ষুকের জাতের ইজ্জত নাই। একটা লোককে আপনারা ভিক্ষা দেন এক টাকা কি আট আনা। তার দিকে কিভাবে চান? “ও বেটা ভিক্ষুক, যা বেটা, নিয়ে যা আটা আনা পয়সা।” একটা জাতি যখন ভিক্ষুক হয়, মানুষের কাছে হাত পাতে, “আমাকে খাবার দাও, আমাকে টাকা দাও, ” সে জাতের ইজ্জত থাকতে পারে না। আমি সেই ভিক্ষুকের জাতির নেতা থাকতে চাই না। আমি চাই বাংলাদেশের প্রত্যেকটা কৃষক ভাই-এর কাছে, যারা সত্যিকারের কাজ করে, যারা প্যান্ট-পরা কাপড় পরা ভদ্রলোক, তাদের চাই জমিতে যেতে হবে। ডাবল ফসল করুন। প্রতিজ্ঞা করুন, আজকে থেকে ওই শহীদদের কথা স্মরণ করে ডাবল ফসল করতে হবে। যদি ডাবল ফসল করতে পারি, আমাদের অভাব, ইনশাল্লাহ হবে না। ভিক্ষুক সেজে হাত পাততে আমাদের হবে না। আমি পাগল হয়ে যাই – ভিক্ষুকের জাত। এই এক নম্বর হল আমার দুর্নিতিবাজদের খতম করা। দুই নম্বর হল আমার, কোলে কারখানায় ক্ষেতে খামারে আমার প্রোডাকশন বাড়ানো। তিন নম্বর হল আমার পপুলেশন প্ল্যানিং। চার নম্বর হল আমার জাতীয় ঐক্য।

ভাইয়েরা আমার, একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে। আমার জায়গা হলো ৫৫ হাজার বর্গমাইল। যদি আমাদের প্রত্যেক বৎসর ৩০ লক্ষ লোক বাড়ে, তাহলে ২৫/৩০ বৎসরে বাংলায় কোন জমি থাকবে না হাল চাষ করবার জন্য। বাংলার মানুষ বাংলার মানুষের মাংস খাবে। সেই জন্য আজকে আমদের পপুলেশান কনট্রোল, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। এটা হলো তিন নম্বর কাজ। এক নম্বর হলো, দুর্নীতিবাজ খতম করা। দুই নম্বর হলো, কলে-কারখানায়, ক্ষেতে-খামারে প্রোডাকশন বাড়ানো। তিন নম্বর হলো, পপুলেশান প্ল্যানিং। চার নম্বর হলো, জাতীয় ঐক্য। জাতীয় ঐক্য গড়বার জন্য একদল করা হয়েছে। যারা বাংলাকে ভালোবাসে, এর আদর্শে বিশ্বাস করে, চারটি রাষ্ট্রীয় আদর্শ মানে, সৎ পথে চলে তারা সকলেই এই দলের সদস্য হতে পারবে। যারা বিদেশি এজেন্ট, যারা বহিঃশত্রুর কাছ থেকে পয়সা নেয়, এতে তাদের স্থান নাই। সরকারি কর্মচারীরাও এই দলের সদস্য হতে পারবে। কারণ, তারাও এই জাতির একটা অংশ। তাদেরও অধিকার থাকবে এই দলের সদস্য হওয়ার। এই জন্য সকলে, যে যেখানে আছি, একতাবদ্ধ হয়ে দেশের কাজে লাগতে হবে।

ভাইয়েরা, বোনেরা আমার, এই জাতীয় দলের আপাতত পাঁচটা ব্রাঞ্চ হবে। একটা শ্রমিক ভাইদের অঙ্গদল, কৃষক ভাইদের একটা, যুবক ভাইদের একটা, ছাত্রদের একটা এবং মহিলাদের একটা। এই পাঁচটা অঙ্গদল মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। আমাকে অনেকে বলে, কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ তো হলো। কিন্তু আমাদের কী হবে? আমি বলি আওয়ামী মানে তো জনগণ। ছাত্র, যুবক, শিক্ষিত সমাজ, সরকারি কর্মচারী, সকলে মিলে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ।

আমি এই যে দুর্নীতির কথা বললাম, তা কারা করে? আমার কৃষক দুনীতিবাজ? না। আমার শ্রমিক? না। তা কে? তাহলে ঘুষ খায় কারা? স্মাগ্লিং করে কারা? বিদেশি এজেন্ট হয় কারা? বিদেশে টাকা চালান দেয় কারা? হোড করে কারা? এই আমরা, যারা শতকরা ৫ জন শিক্ষিত লোক – এই আমাদের মধ্যেই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ। এবং আমাদের চরিত্রের সংশোধন করতে হবে, আত্মশুদ্ধি করতে হবে। যে আপনাদের আমাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয় নাই। একজন কৃষক যখন আসে খালি গায়ে, লুঙ্গি পইড়া, আমরা বলব, “এই বেটা, কোথেকে আইছিস, বাইরে বয়, বাইরে বয়।” একজন শ্রমিক যদি আসে বলি “ঐখানে দাঁড়া।” “এই রিক্সাওয়ালা, এভাবে চলিস না।” “এই (অস্পষ্ট একটি শব্দ) করিস না।” তাচ্ছিল্যের সঙ্গে কথা বলেন। তুচ্ছ করেন। পরিবর্তন করতে হবে। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমি গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন। ওরাই মালিক। ওদের সংসারই চলে। এ ব্যাটা কোত্থেকে আসলি? সরকারি কর্মচারীদেরকে বলব, মনে রেখ, এ স্বাধীন দেশ। এ ব্রিটিশ কলোনি নয়। পাকিস্তানি কলোনি নয়। যে লোককে দেখবা তার চেহারাটা তোমার বাবার মতো, তোমার ভাইয়ের মতো। ওর পরিশ্রমের পয়সায় – ওরাই হবে – সম্মান বেশি পাবে। কারণ, ওরা নিজেরা কামাই কইরে খায়। আর তোমরা কাজ কইরা। একটা কথা আমি জিজ্ঞাসা করি আপনাদের কাছে, মনে করবেন না কিছু। আমাদের কাছে জিজ্ঞাসা করি, আপনাদের বলব কেন – আমি তো আপনাদের একজন। আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছে কেডা? আমার বাপ-মা। আমরা বলি, বাপ-মা। আমাদের লেখাপড়া শিখাইছে কে? আজ ডাক্তারি পাশ করায় কে? আজ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করায় কে? আজ সায়েন্স পাশ করায় কে? আজ বৈজ্ঞানিক করে কে? আজ অফিসার করে কে? কার টাকায়। বাংলার দুঃখী জনগণের টাকায়। আপনাদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা – শিক্ষিত ভাইয়েরা, যে আপনার লেখাপড়ার খরচ দিয়েছে, শুধু আপনাদের সংসার দেখবার জন্য নয়। আপনার ছেলে মেয়েদের দেখার জন্য নয়। দিয়েছে তাদের জন্য আপনি কাজ করবেন, সেবা করবেন। তাদের আপনি কী দিয়েছেন? কী ফেরত দিয়েছেন, কতটুকু দিচ্ছেন? তার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাহেব, তার টাকায় ডাক্তার সাহেব, তার টাকায় অফিসার সাহেব, তার টাকায় রাজনীতিবিদ সাহেব, তার টাকায় মেম্বার সাহেব, তার টাকায় সব সাহেব। সমাজ যেন ঘুণে ধরে গেছে। এসমাজকে আমি চরম আঘাত করতে চাই। এ আঘাত করতে চাই যে আঘাত করেছিলাম পাকিস্তানিদের, সে আঘাত করতে চাই এই ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থাকে।



এই যে নতুন সিস্টেমে যাচ্ছি আমি, গ্রামে গ্রামে বহুমুখী কোঅপারেটিভ করা হবে। ভুল করবেন না। আপনাদের জমি আমি নেব না। ভয় পাবেন না যে, জমি নিয়ে যাব। তা নয়। পাঁচ বৎসর প্ল্যানে বাংলাদেশের ৬৫ হাজার গ্রামে একটি করে কো-অপারেটিভ হবে। প্রত্যেকটি গ্রামে গ্রামে। এই কো-অপারেটিভ – জমির মালিক জমি থাকবে। কিন্তু তার অংশ যে বেকার, প্রত্যেকটা মানুষ, যে মানুষ কাজ করতে পারে, তাকে সেই কো-অপারেটিভের সদস্য হতে হবে। এগুলি বহুমুখী কোঅপারেটিভ হবে। আলটিমেটলি ৬৫ হাজার ভিলেজে একটা করে কো অপারেটিভ করা হবে। ৫ বচ্ছরের প্ল্যান নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছে পয়সা যাবে তাদের কাছে ফার্টিলাইজার যাবে তাদের কাছে টেস্ট রিলিফ যাবে তাদের কাছে ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে। আস্তে আস্তে ইউনিয়ন কাউন্সিল – ঐ টাউটের দল – বিদায় দেওয়া হবে। তা না হলে দেশ বাঁচানো যাবে না। এই জন্যই ভিলেজে কো-অপারেটিভ হবে। আমি ঘোষণা করছি আজকে যে, পাঁচ বৎসরের প্ল্যানে প্রত্যেকটি গ্রামে – ধরেন পাঁচ শত থেকে হাজার ফ্যামিলি পর্যন্ত কম্পালসারি কোঅপারেটিভ। আপনার জমির ফসল আপনি নেবেন, অংশ যাবে কো-অপারেটিভে, অংশ যাবে গভর্নমেন্টের হাতে। দ্বিতীয়ত, থানায় থানায় একটি করে কাউন্সিল হবে। এই কাউন্সিলে রাজনৈতিক কর্মী বা সরকারি কর্মচারী যে হয় – একজন তার চেয়ারম্যান হবে। এই জাগাতে থাকবে ঐ ডিপার্টমেন্টের সকল কর্মচারী, আর তার আমাদের কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি থাকবে, যুব প্রতিনিধি থাকবে, কৃষক প্রতিনিধি থাকবে। তারা থানাকে চালাবে। আর, জেলা থাকবে না, সমস্ত মহকুমা জেলা হয়ে যাবে। প্রত্যেকটা মহকুমাকে জেলা করব। সেই মহকুমায় একটি করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল হবে। তার একজন চেয়ারম্যান থাকবে। সব কর্মচারী এক সঙ্গে তার মধ্যে থাকবে। এর মধ্যে পিপলস রিপ্রেজেন্টেশন থাকবে। পাটি রিপ্রেজেন্টেশন থাকবে। তারা সেখানে সরকার চালাবে। এইভাবে আমি একটা সিস্টেম চিন্তা করেছি এবং করব বলে ইনশাল্লাহ আমি ঠিক করেছি। আমি আপনাদের সাহায্য ও সহানুভূতি চাই।

ভাই ও বোনেরা আমার, আজকে আর একটা কথা বলি। আমি জানি, শ্রমিক ভাইয়েরা আপনাদের কষ্ট আছে। কী কষ্ট, আমি জানি। তা আমি ভুলতে পারছি না। বিশেষ করে ফিক্সড ইনকাম গ্রুপের কষ্টের সীমা নাই। কিন্তু কোথা থেকে কী হবে? টাকা ছাপিয়ে বাড়িয়ে দিলেই তো দেশের মুক্তি হবে না। ইনফ্লেশন হবে। প্রোডাকশন বাড়াতে পারলে তার পরেই আপনাদের উন্নতি হবে। না হলে উন্নতি হবে না। আমি এই-ই জানি। যেমন আমরা আজকে দেখছি। কপাল, আমাদের কপাল! আমরা গরিব দেশ। আমাদের কপাল, আমার পাটের দাম নাই, আমার চায়ের দাম নাই। আমরা বেচতে গেলে অল্প পয়সায় আমাদের বিক্রি করতে হয়। আর, আমি যখন কিনে আনি, যারা বড় বড় দেশ, তারা তাদের জিনিসের দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়। আমরা বাঁচতে পারি না। আমরা এই জন্য বলি, তোমরা মেহেরবানি করে যুদ্ধের মনোভাব বন্ধ কর। আরমামেন্ট রেস বন্ধ কর। তোমরা অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ কর। ওই সম্পদ দুনিয়ার দুঃখী মানুষকে বাঁচাবার জন্য ব্যয় কর। তাহলে দুনিয়ায় শান্তি ফিরে আসবে। আজকে তোমরা মনে করেছ, আমরা গরিব, আমাদের তাই কোন মূল্য নাই। কিন্তু

হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান,

অপমানে হতে হবে তাদের সবার সমান।

তোমরা মনে করেছ, আমরা গরিব, আমাদের তাই যে দামেই হোক, বিক্রি করতে হয়। কিন্তু এই দিন থাকবে না। আমরা বাংলাদেশের মানুষ, আমাদের মাটি আছে, আমার সোনার বাংলা আছে, আমার পাট আছে, আমার গ্যাস আছে, আমার চা আছে, আমার ফরেস্ট আছে, আমার মাছ আছে, আমার লাইভস্টক আছে। যদি ডেভেলপ করতে পারি, ইনশাআল্লাহ এ দিন থাকবে না। তোমরা আজকে সুযোগ পেয়ে জাহাজের ভাড়া বাড়িয়ে দাও। জিনিসের দাম বাড়িয়ে দাও। আর তাই আমাদের কিনতে হয়। আমরা এখানে না খেয়ে মরি, আমাদের ইনফ্লেশন হয়, আমরা বাঁচতে পারি না। ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে যাই; তোমরা কিছু খয়রাত দিয়ে একটু মিষ্টি হাস। হাস, হাস, হাস। দুঃখে পড়েছি, বিক্রিত হয়েছি। তোমাদের কাছে হাত পাততে হবে, হাস। অনেকে হেসেছ, যুগ যুগ ধরে হেসেছ। হাস! আরব ভাইয়েরাও গরিব ছিল।

আরব ভাইদের সঙ্গে আমরা একাত্মতা ঘোষণা করেছি। প্যালেস্টাইনের আরব ভাইদের ন্যায্য দাবি সমর্থন করে বাংলার মানুষ। আরব ভাইদের পিছনে তারা থাকবে প্যালেস্টাইন উদ্ধার করবার জন্য। এও আমাদের পলিসি। যেখানে নির্যাতিত দুঃখী মানুষ, সেখানে আমরা থাকব। শ্রমিক ভাইয়েরা, আমি শ্রমিক প্রতিষ্ঠান করছি। আপনাদের প্রতিনিধি, ইন্ডাস্ট্রিজ ডিপার্টমেন্ট, লেবার ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি বসে একটা প্ল্যান করতে হবে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী কী করে আমরা বাঁচতে পারি, তার বন্দোবস্ত করতে হবে।

ছাত্রদের মানুষ করতে হবে। ছাত্র ভাইয়েরা, লেখাপড়া করুন। আমি দেখে খুশি হয়েছি, আপনারা নকল-টকল বন্ধ করেছেন একটু। কিন্তু একটা কথা আমি বলব। আমি পেপারে দেখেছি যে, এবারে প্রায় এক পার্সেন্ট পাস, দুই পার্সেন্ট পাস, তিন পার্সেন্ট পাস। শিক্ষক সম্প্রদায়ের কাছে আমার আকুল আবেদন, ফেল করাবেন না। নকল বন্ধ করেছি। আপনাদের একটা কর্তব্য আছে। বলতে পারেন, দুই পার্সেন্ট পাস করিয়ে আপনাদের কর্তব্য পালন করলেন। আপনাদের কর্তব্য আছে, ছেলেদের মানুষ করতে হবে। ফেল করানোতে আপনাদের তেমন বাহাদুরি নাই, পাস করালেই বাহাদুরি আছে। আপনাদের কর্তব্য পালন করুন। খালি ফেল করিয়ে বাহাদুরি নেবেন, তা হয় না। তাদের মানুষ করুন। আমি তো শিক্ষকদের বেতন দেব। আমরা সব আদায় করব। আপনারা লেখাপড়া শেখান, আপনারা তাদের মানুষ করুন। শঙ্খলা ফিরিয়ে আনুন, রাজনীতি একটু কম করুন। তাদের একটু মানুষ করবার চেষ্টা করুন। একটু সংখ্যা বাড়ান। শুধু এক পার্সেন্ট, দুই পার্সেন্ট, পাঁচ পার্সেন্ট দিয়ে বাহাদুরি দেখিয়ে বলবেন, খুব স্ট্রিক হয়েছি। আমিও স্ট্রিক্ট চাই। নকল করতে দেবেন না। তবে, আপনাদের কাছে আবেদন, মেহেরবানি করে আপনাদের কর্তব্য পালন করুন। ছেলেদের মানুষ করবার চেষ্টা করুন। পাসের সংখ্যা বাড়াবার চেষ্টা করুন। ওদের মানুষ হিসাবে তৈরি করুন। সেটাই ভালো হবে। রাগ করবেন না। আপনারা আবার আমার উপর রাগ করেন। আমি বুদ্ধিজীবীদের কিছু বলি না। তাদের সম্মান করি। শুধু এইটুকুই বলি যে, বুদ্ধিটা জনগণের খেদমতে ব্যয় করুন। এর বেশি কিছু বলি না। বাবা, ওদের কিছু বলে কি বিপদে পড়ব! আবার কে কী বই লিখে ফেলবে! খালি সমালোচনা করলে লাভ হবে না।

আমার যুবক ভাইয়েরা, আমি যে কো-অপারেটিভ করতে যাচ্ছি গ্রামে গ্রামে, এর ওপর বাংলার মানুষের বাঁচা নির্ভর করবে। আপনাদের ফুলপ্যান্টটা একটু হাফপ্যান্ট করতে হবে। পাজামা ছেড়ে একটু লুঙ্গি পরতে হবে। আর, গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই কো-অপারেটিভকে সাকসেসফুল করবার জন্য কাজ করতে হবে। এ-কাজে যুবক চাই, ছাত্র চাই, সকলকে চাই। বিচার ব্যবস্থার পরিবর্তন চাই আর একটি কথা বলতে চাই। বাংলাদেশের বিচার ইংরেজ আমলের বিচার। আল্লাহর মর্জি যদি সিভিল কোর্টে কেস পড়ে, সেই মামলা শেষ হতে লাগে ২০ বছর। আমি যদি উকিল হই, আমার জামাইকে উকিল বানিয়ে কেস দিয়ে যাই। ওই মামলার ফয়সালা হয় না। আর, যদি ক্রিমিনাল কেস হয়, তিন বছর, চার বছরের আগে শেষ হয় না। এই বিচার বিভাগকে নতুন করে গড়তে হবে। থানায় ট্রাইব্যুনাল করবার চেষ্টা করছি। সেখানে যাতে মানুষ এক বছর, দেড় বছরের মধ্যে বিচার পায়, তার বন্দোবস্ত করছি। আশা করি, সেটা হবে। এখন আমি আপনাদের কাছ থেকে একটি কথা জানতে চাই। এই যে চারটি প্রোগ্রাম দিলাম, এই যে, আমি কো-অপারেটিভ করব, থানা কাউন্সিল করব, সাবডিভিশনাল কাউন্সিল করব, আর, আমি যে আপনাদের কাছ থেকে ডবল ফসল চেয়েছি, জমিতে যে ফসল হয়, তার ডবল চাই, কলে-কারখানায় কাজ চাই, এ-সম্পর্কে আপনাদের মত্ কি? সরকারি কর্মচারী ভাইয়েরা, একটু ডিসিপ্লিন এসে গেছে। অফিসে যান, কাজ করুন। আপনাদের কষ্ট আছে, আমি জানি। দুঃখী মানুষ আপনারা। আপনারা কাজ করুন। জনগণের পেটে খাবার নাই। তাদের ওপর ট্যাক্স বসিয়ে আমি আপনাদের পুষতে পারব না। প্রোডাকশন বাড়লে আপনাদেরও এদের সঙ্গে উন্নতি হবে। এই যে কথাগুলি আমি বললাম, এতে আপনারা আমাকে সমর্থন করেন কিনা, আমার ওপর আপনাদের আস্থা আছে কিনা, আমাকে দুই হাত তুলে দেখিয়ে দিন।

ভাইয়েরা, আবার দেখা হবে, ইনশাআল্লাহ, আবার দেখা হবে। আপনারা বহু দূর থেকে কষ্ট করে এসেছেন। গ্রামে গ্রামে ফিরে যান। গিয়ে বলবেন, দুর্নীতিবাজদের খতম করতে হবে। ক্ষেতে-খামারে, কল-কারখানায় প্রোডাকশন বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মচারী ভাইয়েরা, আপনারাও কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের সদস্য হবেন। আপনারা প্রাণ দিয়ে কাজ করুন। ইনশাআল্লাহ, বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে। খোদা হাফেজ। জয় বাংলা।

ক্রেডিট: বঙ্গবন্ধুর ভাষণসমগ্র, সংগ্রামের নোটবুক