‘ইতিহাসের রক্তপলাশে’ ইতিহাসের অজানা অধ্যায়

আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ইতিহাসের রক্ত পলাশ আমাদের বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী বিভৎসতার করুণ উপাখ্যান এবং ট্রাজেডির হিরো শেখ মুজিবুর রহমানের  অনেক অজানা ইতিহাস তুলে ধরেছে।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৩ সালে লন্ডন থেকে,তবে লেখা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৬ সাল থেকে ব্রিটেনের বাংলা সংবাদপত্র গুলোতে। পরবর্তীতে তার লেখা থেকে বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয় ১৯৯৩ সালে।

আবদুল গাফফার চৌধুরী

আবদুর গাফফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর অনেক ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তি ছিলেন,এছাড়া তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রত্যেকটি আন্দোলন কিংবা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখার দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন,কিন্তু দুঃখের বিষয় বঙ্গবন্ধুর জীবনী লেখার আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়  বিদেশী ও দেশীয় ঘাতকেরা।

বইটিতে মূলত ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যুদয়, রাজনৈতিক বিবর্তন, রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্র, মুক্তিযুদ্ধের সময় বিদেশী ও দেশীয় চক্রান্ত বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিস্তর নির্মোহ বিশ্লেষন করা হয়েছে।

বইটির মূল উপজীব্য আলোচ্চ বিষয় হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পেছনের কারণ ।বইটিতে লেখক দেখিয়েছেন  মার্কিন পাকিস্তানী চীন ত্রিদেশীয় ষড়যন্ত্রের জাল কীভাবে স্বাধীনতার মূল কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করা হয়েছে ।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও যে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের অন্যতম কারণ সেটিও সুচারুভাবে লেখক দেখিয়েছেন। কীভাবে সাংবাদিকরা বিদেশী লবিষ্ট এর ভূমিকা পালন করেছে অর্থের কাছে বিক্রি হয়েছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুঁজিবাদীদের স্বার্থ কায়েম করেছে সেটা সুচারুভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

তবে লেখক সবচেয়ে সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী কর্মীরা কীভাবে নিজেরা ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দিয়েছিল। মোশতাক জিয়া  গ্যাং কীভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দেওয়ার প্রয়াস নিয়েছিল,প্রায় সফল ও হয়েছিল।

বইটিতে আবদুল গাফফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের ক্ষমাশীলতা ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন।দেশের জনগনের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বঙ্গবন্ধু যেকোন সময় যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন বিদেশী শক্তির চোখ রাঙানির তোয়াক্কা না করেই।বাঙালির ভালোবাসা এবং ভাগ্য উন্নয়ন ছিল বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী জীবনের লক্ষ্য। কিন্তু এই উদারতার সুযোগ নিয়ে  ঘাতকরা  ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল সেটাও লেখক দেখিয়েছেন।

বইটিতে লেখক বাংলাদেশের বিভিন্ন সুযোগ সন্ধানী  রাজনৈতিকদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ভাসানীর বারবার বেঈমানি কিংবা ওসমানীর কপটতা সবই উল্লেখ করে দিয়েছেন তথ্যপ্রমাণ সহ।

এছাড়া লেখক  বইটিতে ১৯৪৭-১৯৭৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগনের সংগ্রামের  ইতিহাসের অনেক অজানা গল্প তুলে ধরেছেন জাতির সামনে।

সবমিলিয়ে বইটিতে লেখক বাংলাদেশের জন্ম থেকে করুণ উপাখ্যানের চিত্র তুলে ধরেছেন,যেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম সম্পদ বলে বিবেচিত হওয়া উচিৎ। কারণ লেখক ঘটনাবলী নিজের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং নিজেও অনেক ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। যা অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাসঙ্গিক।

ইতিহাসের রক্ত পলাশ অসাধারণ একটি বই
যেটি পড়ে ঋদ্ধ  হওয়া উচিৎ বর্তমান প্রজন্মের।