ছাত্রলীগ ও বঙ্গবন্ধু

সময়ের প্রয়োজনে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন।ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে ঐতিহাসিক বিবর্তন মোদ্দাকথা ছাত্রলীগের গৌরব উজ্জ্বল অর্জন সবকিছু বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে ধরে।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বঙ্গবন্ধু সমমনা আগের ছাত্রনেতা-কর্মীদের নিয়ে নতুন ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেনঃ



নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগে’র নাম বদলিয়ে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ করা হয়েছে। শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই জেনারেল সেক্রেটারি রইলেন। ঢাকায় কাউন্সিল সভা না করে অন্য কোথাও তাঁরা করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটির সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র নয়, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে সংগঠনে নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই। আমরা ঐ কমিটি মানতে চাইলাম না। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত নয়। আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আজিজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালালউদ্দিন, আবদুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্রনেতা একমত হলেন, আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান করা দরকার। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের এ্যাসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হলে, সেখানে স্থির হল একটা ছাত্র প্রতিষ্ঠান করা হবে। যার নাম হবে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হলো।…প্রতিষ্ঠানের অফিস করলাম ১৫০ নম্বর মোগলটুলী (পৃ. ৮৮-৮৯)।

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠান গঠন করার সাথে সাথেই বিরাট সাড়া পাওয়া গেল ছাত্রদের মধ্যে। এক মাসের ভিতর আমি প্রায় সকল জেলায়ই কমিটি করতে সক্ষম হলাম। যদিও নইমউদ্দিন কনভেনর ছিল, কিন্তু সকল কিছুই প্রায় আমাকেই করতে হতো। একদল সহকর্মী পেয়েছিলাম, যারা সত্যিকারের নিঃস্বার্থ কর্মী

ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া সংগঠন। বঙ্গবন্ধু সব সময় ছাত্রলীগ নেতা কর্মী বেষ্টিত অবস্থায় থাকতে পছন্দ করতেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন সময়ে বক্তৃতা দেন।

আসুন দেখে নেই ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু কবে কি বলেছেন…

১৯৭১,৪ জানুয়ারি

১৯৭১ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের ২৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু সুনির্দিষ্টভাবে বলেন,

‘৬-দফা ও ১১-দফা দাবি আদায়ের সংগ্রামে, তোমরা আমাকে সহযোগিতা করো। তোমাদের আশ্বাস দিচ্ছি, ৬-দফা ও ১১-দফা দাবি ব্যর্থ হলে কয় দফা দিতে হবে সেটা আমার জানা আছে। তবে সব কিছুই আমি চাই অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে করতে। বিশ্ব জনমত উপেক্ষা করে নয়। সকলে জানুক আমরা অন্যায় কিছু করিনি। আর সেজন্য চাই শান্তি ও শৃঙ্খলা। আমি তোমাদের আগামী দিনগুলোর জন্য প্রস্তুত হবার আহ্বান জানাচ্ছি।’

১৯৭১ সাল, ৩ মার্চ

বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সমাবেশে বলেছিলেন

‘দানবের সঙ্গে লড়াইয়ে যে কোনো পরিণতিকে মাথা পেতে বরণের জন্য আমরা প্রস্তুত। ২৩ বছর রক্ত দিয়ে এসেছি। প্রয়োজনবোধে বুকের রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব। তবু সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও বাংলার শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করব না।’

১৯৭২, ২১ জুলাই

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের ৩ দিনব্যাপী সম্মেলন শুরুর দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন,

ছাত্রলীগের সঙ্গে বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ছাত্রলীগের মধ্যে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হয়েছিল। জনতার সঙ্গে একাত্মতা ও সংগ্রামী ঐতিহ্যের জন্য ছাত্রলীগের মৃত্যু ঘটেনি। অনুরূপভাবে আওয়ামী লীগ থেকে বহুবার বহু নেতা দলত্যাগ করলেও এ সংগঠনের অপমৃত্যু হয়নি। কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন যে, নেতারা চলে গিয়েছিল কিন্তু নীতি যায়নি। নেতার মৃত্যু হতে পারে কিন্তু আদর্শ বজায় রাখলে সংগঠনের মৃত্যু হয় না। “

ছাত্রসমাজকে লক্ষ্য করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোষণহীন সমাজ কায়েমের আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধু বলেন,

সংগ্রাম শেষ হয়নি। আরেক নতুন সংগ্রাম শুরু হয়েছে। সেটি হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ভিত্তিতে সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের সংগ্রাম

জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু আরও বলেন, বাংলাকে নিয়ে আরেক নতুন খেলা শুরু হয়েছে। ছাত্রসমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছো, রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে।




সম্মেলনে উপস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিরা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা রক্ষার বলিষ্ঠ শপথ গ্রহণ করেন। হাজার হাজার ছাত্রের অবিরাম মুজিববাদ নিয়ে গগনবিদারী স্লোগান উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়। লাল-সবুজ টুপি পরা শত শত ছাত্রছাত্রী আকর্ষণীয় কুচকাওয়াজ ছাড়াও সম্মেলনে যোগদানকারী প্রতিনিধিরা স্লোগান দেন

‘এবারের বিপ্লব, মুজিববাদের বিপ্লব’



বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক ঘেরাও ও পরীক্ষায় নকলের তীব্র নিন্দা করে বঙ্গবন্ধু ছাত্রদের বেয়াদবি না করার উপদেশ দান এবং লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেরানি সৃষ্টির শিক্ষা চাই না। তাই সমাজতান্ত্রিক দেশের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে শিক্ষা কমিশনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা কমিশনের ছাত্র প্রতিনিধি গ্রহণের দাবি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছাত্র প্রতিনিধিদের কমিশনের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য পরামর্শ দেন।



বঙ্গবন্ধু আরো বলেন,

অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন। আমরা ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসী কিন্তু সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনও আঘাত সহ্য করবো না। যারা গণতন্ত্র চান না তাদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বলেন, গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েমে বাধা-বিপত্তি আছে সত্য, কিন্তু যাদের জনসমর্থন রয়েছে তাদের জন্য কোনও বাধা নেই। আমরা শোষিতের গণতন্ত্র অর্থাৎ জনগণের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। বাংলার সংগ্রামের ইতিহাস ছাত্রলীগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এক ও অভিন্ন ছাত্রলীগকে শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্মেলন শুরু হলে জাতীয় সংগীত ও ২১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন।

১৯৭৩, ১৯ আগস্ট

১৯৭৩ সালের ১৯ আগস্ট রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলনে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের অংশ বিশেষ তুলে ধরা হলো-

‘বাবারা, একটু লেখাপড়া শিখ। যতই জিন্দাবাদ আর মুর্দাবাদ কর, ঠিকমত লেখাপড়া না শিখলে কোন লাভ নেই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু থাকে বাপ-মাকে সাহায্য কর। প্যান্ট পরা শিখেছো বলে বাবার সাথে হাল ধরতে লজ্জা করো না। দুনিয়ার দিকে চেয়ে দেখ। কানাডায় দেখলাম ছাত্ররা ছুটির সময় লিফট চালায়। ছুটির সময় দু’পয়সা উপার্জন করতে চায়।



আর আমাদের ছেলেরা বড় আরামে খান, আর তাস নিয়ে ফটাফট খেলতে বসে পড়েন। গ্রামে গ্রামে বাড়ীর পাশে বেগুন গাছ লাগিও, কয়টা মরিচ গাছ লাগিও, কয়টা লাউ গাছ ও কয়টা নারিকেলের চারা লাগিও। বাপ-মারে একটু সাহায্য কর। কয়টা মুরগী পাল, কয়টা হাঁস পাল। জাতীয় সম্পদ বাড়বে। তোমার খরচ তুমি বহন করতে পারবে। বাবার কাছ থেকে যদি এতোটুকু জমি নিয়ে ১০ টি লাউ গাছ, ৫০ টা মরিচ গাছ, কয়টা নারিকেলের চারা লাগায়ে দেও, দেখবে ২/৩ শত টাকা আয় হয়ে গেছে। তোমরা ঐ টাকা দিয়ে বই কিনতে পারবে। কাজ কর, কঠোর পরিশ্রম কর, না হলে বাঁচতে পারবে না। শুধু বিএ।

এমএ পাস করে লাভ নেই। আমি চাই কৃষি কলেজ, কৃষি স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল, কলেজ ও স্কুল, যাতে সত্যিকারের মানুষ পয়দা হয়। বুনিয়াদি শিক্ষা নিলে কাজ করে খেয়ে বাঁচতে পারবে। কেরানী পয়দা করেই একবার ইংরেজ শেষ করে দিয়ে গেছে দেশটা। তোমাদের মানুষ হতে হবে ভাইরা আমার। আমি কিন্তু সোজা সোজা কথা কই, রাগ করতে পারবে না। রাগ কর, আর যা কর, আমার কথাগুলো শোন। লেখাপড়া কর আর নিজেরা নকল বন্ধ কর।

আর এই ঘুষ, দুর্নীতি, চুরি-ডাকাতির বিরুদ্ধে গ্রামে গ্রামে থানায় থানায় সংঘবদ্ধ হয়ে আন্দোলন গড়ে তোল। প্রশাসনকে ঠিকভাবে চালাতে সময় লাগবে। এর একেবারে পা থেমে মাথা পর্যন্ত গলদ আছে। মাঝে মাঝে ছোট-খাট অপারেশন করছি। বড় অপারেশন এখনো করি নাই। সময় আসলে করা যাবে।

তোমাদের আমি এইটুকু অনুরোধ করছি,

তোমরা সংঘবদ্ধ হও। আর মেহেরবানী করে আত্মকলহ করো না। এক হয়ে কাজ কর। দেশের দুর্দিনে স্বাধীনতার শত্রুরা সংঘবদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতাবাদীরা দলবদ্ধ, তোমাদের সংঘবদ্ধ হয়ে দেশকে রক্ষা করতে হবে।’

ছাত্রলীগের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু