বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান

১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোশতাক জিয়া সরকার বাংলাদেশকে ‘ইসলামী রিপাবলিক অব বাংলাদেশ’ ঘোষণা করতে চেয়েছিল,পাকিস্তানে বার্তা পাঠিয়েছিল বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন হবে ইসলামিক দেশ হিসেবে… বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় ভুট্টো খুশিতে গদগদ হয়ে  অনেক উপহার পাঠায় মোশতাক সরকারকে দেশ পরিচালনার জন্য।

জিয়া ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশ রাজাকার ,আল বদর এবং স্বাধীনতা বিরোধীদের এই দেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেয়।

কিন্তু জিয়া মোশতাক কখনো বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজতন্ত্র ঘোষণা করেনি তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল হয়ে যাওয়ায়, মার্কিন – চীনা প্রভুরা অখুশি হবে বিধায় এবং জনরোষে পড়ার আশঙ্কায়।

বাংলাদেশকে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েমের প্রক্রিয়াতো আরো কপটতা ও ভাওতাবাজিতে পূর্ণ।

১৯৭৭ সালে জিয়া বিনা বিচারে ১১৪৩++ সামরিক বাহিনীর সদস্য সহ ৩০০০ জন কে ফাঁসি কার্যকর করার পরপর সংবিধানে বিসমিল্লাহ যোগ করে।যেন ব্যাপারটা নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য না করে। জাতিকে বিভ্রান্ত করে বিসমিল্লাহ সংবিধানে যুক্ত করে চতুর জিয়া!

এরশাদের বিরুদ্ধে ১৯৮৮ সালে  যখন আন্দোলন দুর্বার গতিতে ধাবিত হচ্ছে,এরশাদ পুলিশ দ্বারা অসংখ্য নিরীহ শিক্ষার্থী এবং জনগন হতাহত হল তখন আন্দোলন বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে…! ব্যস এরশাদ জনগণের চাপা ক্ষোভ দমিয়ে রাখতে পারল কিছুদিনের জন্য ।আবারো নিজের অপকর্ম ঢাকার  সেই মোক্ষম অস্ত্র ধর্ম ।

এই হচ্ছে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান।কোন ধর্মপ্রাণ ব্যাক্তি বা মুসলিম এই প্রক্রিয়া সমর্থন করতে পারেনা…ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যাবহার করে অবৈধ স্বৈরাচারী শাসকেরা  দিনশেষে নিজেদের ফায়দা তুলে নিয়েছে।

প্রতিবার স্বৈরাচরী শাসক পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ব্যাবহার করেছে নিজেদের অপকর্ম লুকানোর ঢাল হিসেবে।এতে ইসলামের মর্যাদা বেড়েছে না ক্ষুন্ন হয়েছে সেটা বিবেকবান জনতার কাছে প্রশ্ন!

অবশ্য তাদের কথা ভিন্ন যারা ধর্মনিরপেক্ষ ভারত চান,কিন্তু তারা  আবার বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম চান!

পৃথিবীতে ৪৩ টি দেশে রাষ্ট্রধর্ম আছে,এরকম দেশগুলোতে  মধ্যে  ২৭ টি দেশে রাষ্ট্রধর্ম  ইসলাম। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এই ২৭ টি দেশের কোথাও ইসলামী শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা নেই।
শরিয়া ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা না বলে এটিকে পরিবারতন্ত্রের স্বৈরাচারী রূপ বলা যায়। উত্তরাধিকার সূত্রে ২৭ দেশের শাসকেরা  নিজেদের খেয়াল খুশি মত উত্তরাধিকার নির্বাচন করেন।অথচ ইসলামে এইভাবে উত্তরাধিকার নির্বাচন অনৈতিক, কারণ মহানবী যখন মারা যান তখন ও তিনি কোন উত্তরাধিকার নির্বাচন করে যাননি কিংবা এরূপ শাসন প্রক্রিয়ার কথা বলেননি ।

উপমহাদেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বঙ্গবন্ধুকে হতাশ করেছে বারবার

ধর্মভিত্তিক রাজনীতির  নোংরা খেলায় বীতিশ্রুদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-

‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। সকল ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে, কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন-ব্যভিচার এই বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস।পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না’

বঙ্গবন্ধু মিথ্যে বলেননি স্বাধীনতার আগে, স্বাধীনতার পরে ধর্মকে অধিকাংশ রাজনীতিবিদ নিজেদের অপকর্মকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেছে। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বঙ্গবন্ধু ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ঘাতকেরা তাদের হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছে ধর্মের লেবাস পরে।

মদীনার সনদ যেটি কিনা পৃথিবীর প্রথম সংবিধান হিসেবে পরিগণিত  মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) কোথাও কিন্তু রাষ্ট্র ধর্মের কথা উল্লেখ করেননি কিংবা নুন্যতম ইঙ্গিত প্রদান করেননি!প্রত্যেক দেশে নাগরিকদের ধর্ম পালনের অধিকার থাকা যেমন উচিৎ , ধর্ম না পালনের অধিকার ও থাকা  উচিৎ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা) ও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে মানা করেছেন।

যুগে যুগে কাপুরুষ স্বৈরাচারী শাসকেরা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে রাষ্ট্রধর্ম চাপিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের উপর।