মুজিবের জীবনের প্রামাণ্যচিত্র এক ভাষণে

৮ মার্চ ১৯৭৫ টাঙ্গাইলের কাগমারীতে মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু এই ভাষণ দেন..

টাঙ্গাইলের ভাইয়েরা, রাতারাতি কোনও কিছু পৃথিবীতে হয় না। সবকিছুর জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। … টাঙ্গাইলের জনসাধারণ স্বাধীনতা সংগ্রামে যে বীরত্ব দেখিয়েছে সে জন্য টাঙ্গাইলের জনসাধারণকে অভিনন্দন জানাই। আমি জেলখানা থেকে বের হয়ে এসে এখানে আসি। … টাঙ্গাইলের জনসাধারণ জানে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল। কোনও জাতি কোনদিন ত্যাগ ছাড়া বড় হতে পারে না। বাংলার মানুষও ত্যাগ দেখিয়েছে। ত্রিশলক্ষ লোকের জীবনের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। বাংলার কৃষক, বাংলার ছাত্র, বাংলার বিডিআর, বাংলার পুলিশ, বাংলার রাইফেলস, বাংলার আর্মি সাড়া দিয়েছিল যখন আমি ডাক দিয়েছিলাম। পাকিস্তানিরা পঁচিশ বৎসর বাংলার সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। ৭ ই মার্চ আমি বাংলার মানুষকে ডাক দিয়েছিলাম। ২৫ শে মার্চ বাংলার মানুষকে হুকুম দিয়েছিলাম। বাংলার মানুষ অস্ত্র ধরেছিল। আপনারা জানেন, টাঙ্গাইল থেকে ঢাকার রাস্তায় একটা ব্রিজ ছিল না। এক পয়সা বৈদেশিক মুদ্রা পাই নাই … আল্লাহ্র মেহেরবানিতে ভারতবর্ষ, বন্ধু রাষ্ট্রের সহযোগিতায় আরম্ভ হল আমাদের যাত্রা… এক বছর বন্যা… তারপরে হলো … খাবার নাই… জিনিসের দাম বেড়ে গেল… বেশি দামে কিনতে হয়।

গ্রামের মানুষ না খেয়ে আছে। তাদের গায়ে কাপড় নাই। একদল চোর-ডাকাত, সন্ত্রাসবাদী যারা বাংলার মানুষকে হত্যা করে। যারা কালোবাজারি, যারা ঘুষখোর, যারা বাংলাদেশের মানুষকে কষ্ট দেয়, তাদের আমি অনুরোধ করেছি, ভাই বলেছি, বাবা বলেছি তোমরা এ কাজ ছেড়ে দাও। শহিদদের আত্মা শান্তি পাবে না। তোমরা মানুষ হয়ে যাও। বাংলার মানুষকে ভালোবাসো। … বিদেশ থেকে কোটি কোটি মণ খাবার আনতে হয়। এক দুই মণ না কোটি কোটি মণ। এই বছর আমাকে আনতে হবে চার থেকে সাত কোটি মণ খাবার। কোথেকে অনিবো? কে দেবে? ভিক্ষা করে আনতে হবে। ভিক্ষুকের জাতের কোনও ইজ্জত নাই। ভিক্ষা করে অনলে সম্মান থাকে না।… তবু আনতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে হবে। তারপরও একদল আছে আমি বিদেশ থেকে খাবার আনি, জাহাজে করে আনতে হয়, গ্রামে গ্রামে পাঠাতে হয়। তারা চুরি করে খায়।

আজ সাবধান করে দিতে চাই। চোরের সাত দিন সাধুর একদিন। এবার ক্ষমা করি নাই। (সবাই বলে) বঙ্গবন্ধু মাফ করে দাও। আমি মাফ করি। বাংলার কৃষক, বাংলার যুবক, বাংলার শ্রমিক সবাই ঝাপিয়ে পড়েছিলাম… বাংলাদেশের শতকরা ২৫ ভাগ দুঃখ দূর হয়ে যাবে যদি দুর্নীতি বন্ধ হয়।

অনেক কলেজ করেছি। এই চার বছরে এত কলেজ করেছি দুনিয়ার কোনও দেশে হয়তো তা অসম্ভব। তারা মানুষকে মানুষ করতে চায়। আমার ছেলেদের মানুষ করতে চাই। তাই ছেলেরা নকল আর চলবে-টলবে না। … লেখাপড়া শেখো। মানুষ হও। … লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়, যখন শুনি … করতে নকল সাপ্লাইয়ের জন্য। এদিকে আপনাদের মনে রাখা দরকার যে আমরা মানুষ পয়দা করবো, নিজে যদি অমানুষ হই তো মানুষ পয়দা করবো কী করে? আর দুঃখ হয় আমার এই জন্য যে বাংলার কৃষক ঘুষখোর বা দুর্নীতিবাজ নয়। বাংলার মজদুর আমার দুর্নীতিবাজ নয়। আর আমরা শতকরা পাঁচজন লোক শিক্ষিত। আমরা হলাম সব থেকে বেশি দুর্নীতিবাজ। খুন খারাবির মধ্যে, স্মাগলিংয়ের মধ্যে, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মধ্যে …। ভালো লোক আছে। অবশ্যই ভালো লোক আছে। না হলে আজকে আমি পারতাম না। আজ তাই আপনাদের কাছে অনুরোধ ভাই আপনারা কাজ যদি না করেন আমার পক্ষে সম্ভব না ভাই। শেখ মজিবরকে বাইটা খাওয়ালেও সোনার বাংলা হবে না। সোনার বাংলা করতে পারবো না যদি সোনার মানুষ আপনারা আমাকে না পয়দা করে দেন।

তবে আমি অনুরোধ করবো যে আপনারা মানুষ করার চেষ্টা করেন। খালি লেখাপড়া দিয়ে পাস করলেই মানুষ হয় না। যার মধ্যে মনুষ্যত্ব আছে সেই মানুষ হয়। সেই জন্যে আমি চাই মনুষ্যত্ব ফিরে আসুক। আজ দুঃখের সঙ্গে আমাকে বলতে হয় যে আজকে যারা আমরা অনেকে দুর্নীতিবাজ হয়ে গেছি। তারপর আমরা দুর্নীতিবিরোধী বক্তৃতা করি। লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায় আমার। আমি অনুরোধ করবো যে আত্মশুদ্ধি করে … মানুষ হও। তাহলে মানুষকে মানুষ করতে পারবা। আমার অনুরোধ ভাইয়েরা যে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সংগ্রাম চাই। উৎপাদন বাড়াতে হবে। ছেলেরা, খালি লেখাপড়া করলে শিক্ষা হয় না। মাঠে কাজ কর বাবাদের সাথে। বাবারা লুঙ্গি পইরা ধান বেইচা, পাট বেইচা কলেজে পাঠায়। ওই কষ্টের টাকা দিয়া প্যান্ট পরো। প্যান্টটা খুলে লুঙ্গি পরে মাঠে নামো। কাজ শেখো। ভুলে যাও। অনেক সময় বলে আহারে, ছেলেটা আমার বিএ পাস করছে, মেট্রিক পাস করছে, চাকরি পায় না। লেখাপড়া না শিখালে মাঠে-ঘাটে কাজ করতেও পারত। তা না। বি.এ পাস করে, এম.এ পাস করে সমস্ত বসে খায়। মানুষ মাঠে কাজ করে। কাজ করে যারা খায়, ইজ্জত থাকে। চাকরির থেকে তার সম্মান অনেক বেশি। আমাদের সমাজে ব্রিটিশ আমলের যে কলোনিয়াল, যে একটা ইয়ে আছে সেটি এখন পর্যন্ত দূর হয় নাই। আমরা কাজ করলে আমাদের সম্মান চলে যায়। আমরা বোঝা টানলে আমাদের সম্মান চলে যায়। আমরা মাটি কাটলে আমাদের সম্মান চলে যায়। আমরা রিক্সা চালালে আমাদের সম্মান চলে যায়। সম্মানই যদি দিতে হয়, ঐ রিক্সাওয়ালা সম্মানী। সম্মানই যদি দিতে হয়, ঐ কৃষক যে মাঠে কাজ করে সে সম্মানী। সম্মানই যদি দিতে হয়, তাহলে যে কাজ করে খায় সে সম্মানী।

… এ জন্য আমি চাই মাঠে-ঘাটে যে যেখানে আছেন, আপনারা পয়দা করেন। ফসল উৎপাদন করেন। ভিক্ষা করে জাত বাঁচতে পারে না। ভিক্ষা যে করে তার ইজ্জত নাই। আমি ভিক্ষুকের মতো চাইয়া খাইতে চাই না। দ্বিতীয়, ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে। না হলে এই যে মাঠ-টাঠ দেখেন, এগুলো কিছু থাকবে না। বৎসরে ত্রিশলক্ষ লোক যদি বাংলাদেশে বাড়ে তাহলে কুড়ি বৎসর পরে বাংলাদেশের মানুষ মানুষকে খাবে। ধান তো দূরের কথা ফসলের দানা পর্যন্ত থাকবে। না। সেই জন্য আজকে ফ্যামিলি প্ল্যানিং প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আপনারা শিক্ষিত যে যেখানে আছেন, যারা যেখানে আছেন, মানুষকে বুঝাবার চেষ্টা করবেন। আর তৃতীয়, যদি জাতীয় ঐক্য চান, হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলে যারা আছেন বাংলার মাটিতে ছাত্র, যুবক, কৃষক, মজদুর সব এক হবেন এবং একটা কথা এক হয়ে আপনারা দেশের কাজ করেন।

একটা মানুষ, আপনারা কেন দুর্নীতি করেন আমাকে বুঝায়া বলেন তো। আজ হোক, কাল হোক, এই যে কথা বলেছি, এই যে আপনারা বসে আছেন, কেউ কি বলতে পারেন বুকে হাত দিয়ে যে কাল সকালে আমি বেঁচে থাকবো? ওটা আল্লাহর হাতে আপনার মৃত্যু। আজও মরতে পারি। একঘণ্টা পরেও মরতে পারি। তাহলে কেন আপনারা দুর্নীতি করবেন? মরার সময় কী নিয়ে যাবা? কতটুক মাটি আর কয় হাত কাপড়। এছাড়া তো কিছু সঙ্গে যাবে না। না যাবে? তাহলে কেন দুনীতি করবেন? রাত্রে যদি চিন্তা করেন যে আজ ঘুমের মধ্যে আমরা মরতে পারি তাহলে আর দুর্নীতি করতে পারবেন না।

হুজুর (মাওলানা ভাসানিকে), আপনি এখানে একটা কথা বলেছেন যে, পুরুষদের কথা বলেছেন। হুজুর আপনি জানেন না যে আমি যখন ডাক দিয়েছিলাম, মানুষ সব জায়গায় ভালো মন্দ থাকে। সমস্ত জায়গায়ই ভালো মন্দ থাকে। কিন্তু আপনি যদি রাজারবাগ দেখতেন, আর পিলখানা বিডিআরের ফাড়ি দেখতেন, আর আমার আর্মি ক্যান্টনমেন্ট যেখানে বাঙালিরা থাকে দেখতেন, দেখতেন রাজারবাগে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত থ্রি নট থ্রি বন্দুক দিয়া আমার হুকুম মতো পুলিশ যুদ্ধ করছে পাকিস্তান বাহিনীর সামনে। ছত্রিশ জন সেনা মারা যায়। এরাও বাংলার ছেলে। এরাও বাংলার মানুষ। এদের আমি ভালোবাসি। আমার কথায় এরাও জীবন দিয়েছে। বিডিআর দিয়েছে, রক্ষীবাহিনী দিয়েছে, ছাত্র দিয়েছে, যুবক দিয়েছে। মানুষ ভালো-মন্দ দুনিয়ার সব জায়গায়ই থাকে। পাহারা? মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে। কিছু করার নাই। এটা যখন সময় আসবে, এটা আমার কাছে বলে লাভ কী?

তিনবার আমাকে ফাসি দেবার নেছে। আমি তো মাথা নত করি নাই। আমি তো আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করি নাই। আর করলে আমি আইয়ুব খানের আগরতলা কেস থেকে আসতে পারতাম না, আর ইয়াহিয়া খানের জেল থেকে আসতে পারতাম না। আর আমার দরজার কাছে কবর কইরা আমার বঙ্গবন্ধুর মাথা কিনতে পারে নাই। ফাসি দেবার দিন ঠিক করেছিল। কিন্তু আল্লাহ আমাকে বাঁচায় এনেছে। বোধহয় এই বাংলাদেশের দুঃখি মানুষের দোয়ায় আমি বেঁচে আসছিলাম। এই বাঙালিদের কোটি কোটি দোয়ায় আমি বেচে আসছিলাম। সে জন্য আমি জানের ভয় করবো। কেন? আমি জানি তো যে কোনও সময় আমি মরতে পারি। অন্তত আমি গর্ব করে বলতে পারি যে, আমার জানের ভয় সবচেয়ে কম। কারণ আমি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস করি এবং মনে করি মৃত্যু যখন আসবে তখন কেউই রুখতে পারবে না।

এখানে আসছি। হাজার হাজার লোক দুইপাশ দিয়ে। আমি তো তাদের মধ্যে দিয়ে। ভয়-টয় আমি করি-টরি খুব কম। তবে, রাষ্ট্রপতি হলে কিছুটা ফর্মালিটি আছে। এটা তো আমাকে মানতেই হয়। না করলে অন্যায় হয়। ওদেরও (নিরাপত্তাবাহিনী) কিছু কর্তব্য আছে। ওদের পালন করতে হয়। ওদের ডিউটি আছে। যদি বাই চান্স কিছু হয়ে যায়, ওদেরই চাকরি যাবে। আর কেউতো কাছে বোমাও পাওয়া যাবে না। কিন্তু ওদের কিছু কর্তব্য আছে সেখানে। যাই হোক, আমি খুশি হয়েছি যে, মাওলানা সাহেব অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি আমার মুরব্বি। তাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করি। এ কলেজ উনি অনেক কষ্ট করে করেছিলেন। আমার জানা আছে। আমাকে উনি বলেছিলেন পার্লামেন্টের কাছে টাকা আনতে। আমি এনে দিয়েছিলাম। তাই দিয়ে কলেজ তিনি শুরু করেন। আর আজও এ কলেজে উনি এসেছেন। সমস্ত টাঙ্গাইলের নেতৃবৃন্দ, আপনাদের রেজিস্টার মান্নান সাহেবসহ যা আছেন, সকলে বলেছিলেন যে, হুজুরের ইচ্ছা আমরা পূরণ করছি।

কাগমারিতে হোক, টাঙ্গাইল শহরের ওপর না হোক, এটাও শহরের ওপর হয়ে যাবে। আমার আপত্তি নাই। সে জন্য সকলেই দাবি করতে পারে যে, সকলেরই মত আছে এই কাগমারিতে কলেজকে সরকারি কলেজ করা। কারণ মাওলানা সাহেব সুখী হয়েছেন। সন্তুষ্ট হয়েছেন। তাকে সন্তুষ্ট করা আমার কর্তব্য। তিনি আমার মুরব্বির মতো। তাকে আমি শ্রদ্ধা করি। ভক্তি করি। আমি বহুদিন একসঙ্গে কাজ করেছি। এক কামরায় মাসের পর মাস জেল খেটেছি। আমি নিশ্চয়ই এ কলেজে বহু টাকা খরচ হবে। হোক।

আমার শুভেচ্ছা রইল। আর আমি আশা করি যে এই কলেজ থেকে যেন মানুষ পয়দা হয়। আমি আশা করি এই কলেজ যেন টাঙ্গাইলবাসীর একটা গর্বের বস্তু হয়। যেখান থেকে সোনার মানুষ পয়দা হয়। না হলে আমি সোনার বাংলা করতে পারবো না। আপনারা সুখে থাকেন। আপনারা আমাকে দোয়া করেন। আমি বক্তৃতা করলাম। আমি আসতে পারতাম না। আমার আব্বা খুব অসুস্থ খুলনাতে। সেখান থেকে আমি কালকে আসছি। এখান থেকে আমার খুলনা যাওয়ার কথা। জানি না হেলিকপ্টার রাজি হবে কি না। তবু আসছি কারণ বহুদিন আপনাদের সাথে দেখা হয় না। আপনারা আমাকে দোয়া করেন আল্লাহ যেন সুস্থ রাখে।

আর আমার চারটা কথা মনে রাখেন:

এক- দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ
দুই- ক্ষেতে, খামার, কারখানায় উৎপাদন বাড়াতে হবে
তিন- ফ্যামিলি প্ল্যানিং করতে হবে
চার- জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে।

কিন্তু-টিন্তু নাই। ফ্রি স্টাইল আর চলবে না। বহুদিন ফ্রি স্টাইল চলছে। বহুদিন যার যা ভালো লাগছে তাই করছে। চলবে না বেশিদিন। ওটা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য চেষ্টা হচ্ছে এবং চেষ্টা হবে। কারণ জনগণ আমাকে ভালাোবাসে আমি জানি। আমি বিদায় নিচ্ছি। আপনারা আমাকে মাফ করবেন। আমি খুব ক্লান্ত। খোদা হাফেজ।

জয় বাংলা।