আজারবাইজান-আর্মেনিয়া যুদ্ধ: তুর্কি ও শিয়া ইরানের অবস্থানের নেপথ্যে

👥 হাবীবুর রহমান


আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল মূলত পরিচালিত হয় আর্টসাক নামে একটা স্বায়ত্তশাসিত সরকার দ্বারা। যা মূলত আর্মেনিয়ার প্রতি অনুগত। বর্তমান এই সংকট ১৯৮৮ সালে শুরু হলেও এই সংকটের বয়স প্রায় এক শতাব্দী। তখন সোভিয়েতের অন্তর্গত থাকায় সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি। ১৯৮৮ সালে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়াকে স্বাধীনতা দেয়ার কথা বলা হলে এই অঞ্চল নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নাগোরনো-কারাবাখ ভূগত দিক থেকে আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর অধিকাংশ জনগণ আর্মেনিয় খৃষ্টান বলে আর্মেনিয়া এই অঞ্চল দাবী করে। কিন্তু তা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং ১৯৯১ সালে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া নামে দুইটা স্বাধীন দেশ অস্তিত্ব লাভ করে। নাগোরনো-কারাবাখ আজারবাইজানের অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই থেকেই সংকটের শুরু। উত্তেজনা আরম্ভ হয়। যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৯৪ সালে একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও সেই চুক্তি কেউই তেমন গ্রাহ্য করছে না। অবশেষে ২০২০ সালে এসে আবার উত্তেজনা দেখা দেয়। উত্তেজনা গড়ায় যুদ্ধে।

সুইজরল্যান্ডে দুই দেশের মানুষের শান্তির দাবিতে বিক্ষোভ

জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ



এই সংকটে তুরস্ক ও ইরানের কাণ্ডকে ঘিরে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। আজারবাইজান দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া দেশ। দেশটির বেশিরভাগ মানুষ শিয়া। শুধু শিয়া নয়, ইরানের মতো শিয়া ইসনা আশারিয়া। অথচ ইরান সমর্থন দিচ্ছে আর্মেনিয়াকে। আর অন্যদিকে তুরস্ক একটা সুন্নি দেশ হয়ে সমর্থন দিচ্ছে শিয়া আজারবাইজানকে। কি অদ্ভুত সমীকরণ তাই না?

আসলে এটা অতটা আজব কাণ্ড না। মধ্যপ্রাচ্য না শুধু, সাম্প্রতিক সময়ে পুরো পৃথিবীর অধিকাংশ সংঘর্ষে ধর্মের একটা মিনিমাম ইনফ্লুয়েন্স আছে এটা দেখা যায়। যেমন এই নাগারনো-কারাবাখ সংঘর্ষও তার প্রমাণ। এই অঞ্চলের মানুষ আর্মেনিয়ার সাথে যেতে চাওয়ার একটা বড় কারণ তাদের ধর্ম। অস্বীকারের কোনো জো নেই। তবে সবকিছুতে অথবা সব দেশ বা নেতার ক্ষেত্রে ধর্ম সমানভাবে কাজ করে না। তার বড় উদাহরণ এরদোয়ান বা তুরস্ক।

আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সীমান্তে যুদ্ধ।ছবি :euroserver

তুরস্কের আজারবাইজানের সমর্থনের রহস্য

শিয়া অধ্যুষিত দেশ হওয়া সত্ত্বেও এরদোগান আজারবাইজানের পাড় ভক্ত



এরদোয়ান সাহেবকে আমাদের দেশের দিরিলিস আরতুরুল দেখা মানুষজন খলিফা বা সুলতান মনে করলেও তিনি আদতে একজন জনতুষ্টিবাদী নেতা। যার আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদ। জনতুষ্টের জন্যে তিনি ধর্মকে মাঝেমধ্যে ব্যবহার করেন মাত্র। আমি কখনোই উনাকে একজন প্রকৃত আদর্শবান মুসলিম শাসক মনে হয় না। তার দল তাকেই রিপ্রেজেন্ট করে। তাদের মূল লক্ষ্য তুরস্কের ক্ষমতায় থাকা ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিষ্ঠা করা। তাদের দলের ম্যানিফেস্টো, সংবিধানের প্রতি তাদের নিঃশর্ত আনুগত্য এই দাবীর পক্ষে বড় প্রমাণ। তাই এটা আশা করা বোকামি হবে যে এরদোয়ানের পররাষ্ট্রনীতি উৎসারিত হবে ইসলামিক ভাবধারা থেকে। বরং যখন যেভাবে করে গেলে জনগণকে বাগে আনা যায় তা করাই এমন নেতাদের ন্যাচার। আর সে কারণেই ঐতিহাসিক বন্ধু আজারবাইজানকে এরদোয়ানের সমর্থন দেয়া। এক্ষেত্রে তারা সামনে নিয়ে আসে নৃতাত্ত্বিক সম্পর্ক ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ। আজারবাইজান ও তুরস্ক দুইটা দেশের অধিকাংশ মানুষ তুর্কি জাতির। শুধু তাই নয় তারা উভয়ই ওউজ তুর্কির উত্তরপুরুষ। ওসমানীয় খেলাফাত ছিলো এই ওউজ তুর্কি গোত্রের খেলাফাত। যা কায়েম করেছিলো কায়ি ট্রাইব। অন্যদিকে দুইটা দেশের শাসকগোষ্ঠীই ধর্মনিরপেক্ষ। এসব কারণেই তুরস্ক প্রথম থেকেই আই মিন ১৯৯১ থেকেই আজারবাইজানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তারাই প্রথম আজারবাইজানকে স্বীকৃতি দেয়। তারা আর্মেনিয়ার সাথে সীমান্ত সিলগালা করে দেয় আজারবাইজানের সাথে আর্মেনিয়ার লড়াইয়ের কারণে। জাতীয়তাবাদ এই সকল কর্মকাণ্ডের পিছনে বড় অবদান রেখেছে। তার উপর আর্মেনিয়ার সাথে তুরস্কের রয়েছে ঐতিহাসিক শত্রুতা। সবমিলিয়ে জনতুষ্টিবাদী একনায়ক এরদোয়ান সবসময়ের মতো নিজের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও জাতীয়তাবাদকে আদর্শিক ভিত্তি হিশেবে মেনে নিয়ে। যে ভিত্তিতে এসে আজারবাইজান ও এরদোয়ানের তুরস্ক এক হয়ে মিশে গেছে। তাছাড়াও অর্থনৈতিক স্বার্থ তো রয়েছেই। তাই এসব আমলে নিলে তুরস্কের আজারবাইজানকে সমর্থন দেয়া একেবারেই আশ্চর্য হওয়ার বিষয় নয়।

ইরানের আর্মেনিয়া সমর্থনের রহস্য



ইরান ও আজারবাইজান উভয়ে শিয়া হলেও উভয় দেশের জনগণ ও শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। আজারবাইজান কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ দেশে। পিউ রিসার্চের সেন্টারের এক জরিপে এই দেশের ৪৬% মানুষ জানায় ধর্ম তাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা কোনো মুসলিম দেশের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ। তার উপর সম্পর্ক কায়েম হয় সরকার ও সরকারে। জনগণ ও জনগণে সম্পর্ক হয় এটা একটা ভাঁওতাবাজি। এর বড় প্রমাণ সিরিয়া। সিরিয়ার অধিকাংশ মানুষ সুন্নি হওয়ার পরেও আসাদ যেহেতু শিয়া। ইরান মাঠে নেমেছে শিয়া আসাদকে রক্ষা করতে। জনগণ এখানে নস্যি। আজারবাইজান সরকার কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ অন্যদিকে ইরান সরকার কট্টরভাবে শিয়াবাদে বিশ্বাসী। একটা ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সাথে কট্টর শিয়াবাদে বিশ্বাসী সরকারের মিল হয়নি। অন্যদিকে আর্মেনিয়া ইরানের সীমান্ত ঘেঁষা। সুন্নি তুরস্কের দুশমন। সরকারও ধর্মনিরপেক্ষ। অর্থনৈতিক স্বার্থও জড়িত। এতসব কারণে ইরান আর্মেনিয়াকে সমর্থন দেয়। এখানে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। আজ যদি আজারবাইজানে কট্টর শিয়াজমে বিশ্বাসী কেউ ক্ষমতায় আসে কালকেই ইরান তাদের নীতি বদলে ফেলবে। এতে অন্তত সন্দেহ নেই…

লেখকঃ শিক্ষার্থী ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়