স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার

“বিদেশে গেলে হয়ত নিজের জীবনের পরিবর্তন হবে, সে দেশকেও অনেক কিছু দেওয়া যাবে। কিন্তু আমার দেশকে? আমার দেশকে তো কিছু দিতে পারব না। দেশে থেকে দেশের জন্য কিছু করে যেতে পারলে দিন শেষে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আসে। এটা তো বিদেশে গেলে পাব না”

রেজা স্যার ।ছবি :ইন্টারনেট


এক ছাত্রের স্যার বিদেশ যাননি কেন প্রশ্নের উত্তরে ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর কি সুন্দর সাবলীল দেশপ্রেমে ভরপুর জবাব।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি দিলে কজন পারে কাড়িকাড়ি অর্থ জাকজমকপূর্ণ জীবনের প্রলোভন এড়াতে? কজন পারে দেশের কথা ভেবে স্বদেশে ফিরে আসতে! কজন দেশের উন্নতির জন্য নিজের জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন!
অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী এরকম একজন মহাপুরুষ! বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য যান তাদের খুব অল্পসংখ্যক দেশে ফিরে আসে, স্বাধীনতার পর থেকে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য পাড়ি জমান তাদের মধ্যে ৮০% বিদেশে স্থায়ী আবাস গড়েছেন।কিন্তু জামিলুর রেজা চৌধুরী এদেশের কথা ভেবে এদেশে সারা জীবন কাটিয়ে গেছেন। আমরা হয়ত তাকে চিনি যমুনা বা পদ্মা সেতুর নির্মাণে ভূমিকার জন্য। কিন্তু এর বাইরে কজন চিনি বিশ্ববিখ্যাত এই পুরাকৌশলীকে!তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ,প্রকৌশলী
পলিসি মেকার,গবেষক, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কোনটি ছিলেন না। দেশের প্রয়োজনে একেক সময়ে একেক রকম ভূমিকা রেখেছেন যা মৃত্যু অবধি অব্যাহত রেখেছেন। এই মহামানব দেশ গড়তে যে ভূমিকা রেখেছেন তা হয়ত লিখে বা বলে শেষ করা যাবেনা। অবিসংবাদিতভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা প্রকৌশলী ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার।

ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেটে জন্ম গ্রহণ করেন ।তার বাবা ছিলেন বিখ্যাত পুরকৌশলী আবিদ রেজা চৌধুরী । সে সময়ের অনেক বিখ্যাত ব্রিজ ও স্থাপনা তার বাবার নিজ হাতে তৈরী ছিল। বাবা সরকারি চাকুরে হাওয়ায় তার শৈশব কেটেছে আসাম ,সিলেট,ঢাকা ও ময়মনসিংহে। জামিলুর রেজা অনেক স্কুল ও পাল্টেছেন ময়মনসিংহের জিলা স্কুল,প্রিয়নাথ হাইস্কুল (নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল),সেন্ট গ্রেগরিজ হাই স্কুল স্কুলে পড়েছেন। ১৯৫৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন বোর্ডে ১২ তম স্থান অধিকার করে। এরপর বুয়েটে (ততকালীন আহসাউল্লাহ ইঞ্জনিয়ারিং কলেজ) ভর্তি হন পুরাকৌশল বিভাগে।১৯৬৩ প্রথম শ্রেণীতে স্নাতক সম্পন্ন করে কোন নিয়োগপত্র পাওয়া ছাড়াই ফলাফল পাওয়ার পরেরদিন থেকে বিভাগে শিক্ষকতা শুরু করেন বিভাগীয় প্রধানের নির্দেশে ।
১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বার্মা অয়েল কোম্পানির বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। সেখান থেকে তিনি এমএসসি করেন অ্যাডভান্স স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। থিসিসের বিষয় ছিল, ‘কংক্রিট বিমে ফাটল’ । একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে তিনি ‘কম্পিউটার এইডেড ডিজাইন অব হাইরাইজ বিল্ডিং’ বিষয়ে পিএইচডি করেন।

সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া জামিলুর রেজা চৌধুরী।ছবি: সমকাল

পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরে তিনি বুয়েটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।যুক্তরাজ্যের সারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসাবে এক বছর অতিবাহিত করেছিলেন ১৯৭৪ সালে।সময়ের পরিক্রমায় তিনি বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের প্রধান হোন ১৯৭৮-৮৯ এবং ১৯৮১-৮৩ সালে, অনুষদের ডিনের দায়িত্ব পালন করেন ১৯৮৩-৮৫ পর্যন্ত এবং দীর্ঘ দশ বছর(১৯৮২-১৯৯১) বুয়েটের কম্পিউটার সেন্টারের পরিচালক ছিলেন। ২০০১ সালের মার্চ মাসে তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এর প্রথম উপাচার্য হিসাবে যোগদান করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসফিকের উপাচার্য ছিলেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা প্রকৌশলী..ছবি : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

এইতো সেদিন ও বাংলাদেশের কোন মেগা প্রজেক্টের কাজে বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ দেওয়া হতনা। ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী এই কুপ্রথা ভাঙেন, সর্বপ্রথম তিনি বাংলাদেশী প্রকৌশলী হিসেবে যমুনা সেতুর দেশীয় বিশেষজ্ঞ দলের তিনি ছিলেন চেয়ারম্যান। এছাড়া সেতুর সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দীর্ঘ ২৭ বছর বুয়েটে শিক্ষকতায় তিনি হাজার হাজার প্রকৌশলী বানানোর কারিগর তিনি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সরকার তাঁকে বিভিন্ন সরকারি বিশ্বিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক কারণে তিনি দায়িত্ব নেননি।১৯৬৮ সালে বিশ্বখ্যাত সিয়ার্স টাওয়ারের নকশা প্রণয়নকারী বাংলাদেশের স্থপতি ড. এফ আর খান জামিলুর রেজা চৌধুরীকে তার সঙ্গে কাজ করার আমন্ত্রণও জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে আসবেন বলে ড. এফ আর খানের নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করেন। বিদেশে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সুযোগ উপেক্ষা করছেন,নামকরা কোম্পানিতে চাকরির সুযোগ অবলীলায় ছেড়েছেন বুয়েটে শিক্ষকতা করবেন বলে,দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে।তিনি তার আন্তজার্তিক খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে ইচ্ছে করলেই প্রাইভেট ফার্ম বা ডেভেলপার কোম্পানি করে কোটি কোটি টাকা কামাতে পারতেন,কিন্তু তিনি তা না করে সারাজীবন শিক্ষক হয়ে থাকার ব্রত বেছে নিয়েছেন ।
গত ৪০ বছর ধরে বাংলাদেশে মেগা প্রজেক্ট গুলো তার হাত ধরেই হয়ে আসছে।
ঢাকার নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রধানের দায়িত্ব,চট্টগ্রাম বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প, কর্ণফুলি টানেল ,এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রোরলের প্রধান সমন্বয়ক, ২০০৬ সাল থেকে মৃত্যু অবধি পদ্মা সেতুর ডিজাইন ও নির্মাণে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সভাপতি,১৯৯৩ সালে বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার প্রোগ্রামের টিম লিডার ছিলেন এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলির জন্য মাস্টার প্ল্যান তৈরি করেছিলেন।এরকম বহু দায়িত্ব তিনি এক হাতে সামলেছেন ।তার অবদানে বাংলাদেশ যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারছে তেমনি উঠতি প্রকৌশলীদের নিকট দৃষ্টান্ত স্থাপন করে রেখে গেছেন যাতে তারা দেশের স্বার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করে। তিনি উঁচু ইমারতের শিয়ার ওয়াল ডিজাইনের সহজ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পদ্ধতিটি ‘কুল অ্যান্ড চৌধুরী মেথড’ নামে পরিচিত। উঁচু ইমারত ডিজাইনে কম্পিউটার মেথড জনপ্রিয় না হওয়া পর্যন্ত এ পদ্ধতিই সারাবিশ্বে ব্যবহার হতো। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সরকার, বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এবং ওইসিএফ, জাপানকে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
প্রায় ৭৫টি গবেষণাপত্র লিখেছেন, যা দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গিয়েছেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী।ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তার অবদান বলে শেষ করা যাবেনা।তিনি সফটওয়্যার ও ডেটা প্রসেসিং সার্ভিস এক্সপোর্ট কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন(১৯৯৭-২০০২) , বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি কর্মপন্থা বিষয়ক কমিটির আহ্বায়ক (১৯৯৯ ও ২০০৮), শিক্ষা মন্ত্রনালয় দ্বারা গঠিত উচ্চশিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার সংক্রান্ত কমিটির আহবায়ক (২০০৫) ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আইটি টাস্কফোর্সের (২০০১-০৯) সদস্য ছিলেন, ২০০৭ সালে ছবি সহ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরিতে তিনি আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা শহরের শ্রী ফিরিয়ে আনতে তিনি অনেক কর্মপরিল্পনা করেছিলেন,কিন্তু ভূমি দস্যুদের দৌরত্বে ও দুর্নীতির কারণে তার কর্মপরিকল্পনা আলোর মুখ দেখেনি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন,বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের দায়িত্বে ছিলেন অনেক বছর।বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্ট ২০২১ সালে হবে,এ প্রতিযগিতা বাংলাদেশে হওয়ার নেপথ্যে ভূমিকা করেছেন রেজা স্যার।১৯৭০ সালে হওয়া ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এর সময়ে মানবিক দায়িত্ব পালন করেন।সে সময় সহকর্মী ও ছাত্রদের নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কাজ করেছিলেন। মোদ্দাকথা তিনি তার জীবনের সকল ক্ষেত্রে সমিহমায় ভাস্বর ছিলেন। যে শাখায় কাজ করেছেন যে শাখায় নিজের শতভাগ নিংড়ে দিয়েছেন,রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় অবদান।

জাপানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার রাইজিং সান গ্রহণ কালে।ছবি : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম


রেজা স্যার তার কর্মের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ এবং জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশের অন্যান্য প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার জন্য তিনি জাপানের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার রাইজিং সান অর্জন করেন। ২০১৭ সালে তিনি একুশে পদক অর্জন করেন তার কর্মময় জীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ।২০১৮ সালে সরকার তাকে দেশের জাতীয় অধ্যাপকের স্বীকৃতি দেয়।


সারাটা জীবন ধরে তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে দিয়ে গেছেন।না বিনিময়ে কিছু চাননি। অর্থ বিত্ত কিছুই তার চাওয়া ছিল না তার একটাই চাওয়া ছিল রাতে যেন শান্তিতে ঘুমাতে পারেন,আর কিছু না। হ্যাঁ এখন তিনি সেই শান্তির ঘুমই দিচ্ছেন,কাউকে কিছু না বলে সবাইকে ছেড়ে চলে গেছেন ২৮ এপ্রিল চিরতরে….

আমাদের দেশে কীর্তিমান দেশপ্রেমিকের সংখ্যা বেশি নয়। গুটিকয়েক বিদ্যমান। গুটিকয়েকের মধ্যে অন্যতম সেরা ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার ও চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে।তার এ প্রয়াণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ আমাদের দেশ।যোগ্য প্রকৌশলীর প্রচন্ড অভাব যে এদেশে! বেশীদিন না স্যার আর কিছুদিন থেকে গেলে পারতেন , আপনার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল স্বপ্নের পদ্মা
সেতু তো প্রায় শেষ পর্যায়ে… ভাল থাকবেন স্যার।