বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি।১৫ আগস্টের অন্তরালের সাক্ষ্য…

১৫ আগস্ট একটু স্বাধীন দেশকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার দীর্ঘদিনের নির্মম মাস্টারপ্ল্যানের সফল এবং নির্ভুল বাস্তবায়ন।১৫ আগস্টের পটভূমি একদিনে তৈরি হয় নি। কয়েক বছরের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মাস্টারপ্ল্যানের সফল মঞ্চায়ন ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু কে সপরিবারে এবং তার আদর্শকে বিলীন করে দেওয়ার  উদ্দ্যেশ্য ছিল মূল কারণ।১৫ আগস্টের দেশীয় অনুঘটক  কারা সেটা আমরা জানলেও পর্দার অন্তরালের  কে কি করেছে সেটা এখনো উন্মোচিত হয়নি।কেন হয়নি সেটাই প্রশ্ন? তবে ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট কেন তৈরি হয়েছিল সেটা খুঁজে বের করতে গেলে অনেক গভীরে যেতে হবে,বের করতে নির্মোহ সত্য।

আসুন দেখে নেই ১৫ আগস্ট কেন এসেছিল,জানবো কিছু প্রেক্ষাপট যেগুলো আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়,তাহলে আমরা বুঝবো কেন , কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতা ভুলন্ঠিত করেছিল অপশক্তি ।


অন্তঃকোন্দল

স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় থেকেই দক্ষিণ তথা মার্কিনপন্থী নেতাদের সাথে  বাংলাদেশের স্বাধীনতা পন্থী নেতাদের মনোমালিন্য দেখা দেয় ক্ষমতার ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই কোন্দল আরো বেড়ে যায়,দিনকে দিন মোশতাক গ্যাং শক্তিশালী হয়ে যায়,মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি দুর্বল হতে থাকে নানা দেশীয় ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্রে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মধ্য বামপন্থী নেতারা জাতীয় চার নেতা বিশেষ করে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দিন আহমেদকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরাতে স্বাধীনতা বিরোধী মোশতাক চক্র এবং বামপন্থী নেতা যারা মুক্তিযুদ্ধে কম্মিনকালেও কোন অবদান রাখেনি তাদের  সাথে আঁতাত করে ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করার সুযোগ করে দেন।এরা সুযোগ পেয়ে আওয়ামীলীগের মধ্যে ভাঙ্গন ধরায়।

স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের একটা অংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে নামক স্লোগানকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।ডাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামান্য স্লোগানে ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের ঐতিহাসিক ভাঙ্গন ১৫ আগস্টের প্রভাব বিস্তার করে। কারণ ছাত্রলীগের তরুণ তুর্কিরা ৬৬ থেকে ৭১ সাল পর্যন্ত নির্ভিকচিত্তে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করেছিল।কিন্তু ছাত্রলীগের বিভক্তি বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।এ অংশের নেতৃত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান। সিরাজুল আলম খানের হঠকারী সিদ্ধান্ত এবং উচ্চাভিলাষী মনোভাবের  কারণে ছাত্রলীগ ভেঙে যায় এবং একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে,সেই থেকে জাসদ ছাত্রলীগের উত্থান।আর জাসদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে সারা দেশে নৈরাজ্য প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।জাসদ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ছেলেখেলা শুরু করে।আওয়ামী লীগের বিরোধিতার জন্য জাসদ সমানে রাজাকার, নিষিদ্ধ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী চরম বামপন্থীদের দলে ভিড়িয়ে সারাদেশে নৈরাজ্য জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।জাসদ , সর্বহারা এবং চরম পন্থীদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টির কারণে ঈদের নামাজে আওয়ামী লীগের কয়েকজন সংসদ সদস্য সহ প্রায় ৩-৪ হাজার নেতাকর্মী ১৯৭৩-৭৪ সালে খুন হন। স্বাধীনতা অর্জন পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের শায়েস্তা করতে   সরকার যেখানে চেষ্টা করেছিল , সেখানে জাসদের উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ড দেশকে একেবারে অস্থিতিশীল করে দিয়েছিল।মূলত স্বাধীন বাংলাদেশে জাসদের উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রবেশ ঘটিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধূলিসাৎ করে,স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রকাশ্য রাজনীতি করার সুযোগ পায় জাসদের উত্থানের কারণে।
স্বাধীনতা বিরোধীরা এই মোক্ষম সুযোগ ব্যবহার করে দেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে দেয়।মূলত আওয়ামীলীগ,ছাত্রলীগের অন্তঃকোন্দলের কারণে
৭২ পরবর্তী নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের দেশে অবাধ বিচরণের সুযোগ সৃষ্টি করে।

রক্ষীবাহিনীর অতিরিক্ত পক্ষপাতমূলক মনোভাব এবং অত্যাচার কম দায়ী ছিলো না নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরিতে । রক্ষীবাহিনীর বাজে ব্যাবহারের কারণে জন অসন্তোষ বেড়ে গিয়েছিল।

আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়

বঙ্গবন্ধুর পছন্দে মুক্তিযুদ্ধে সেনাপতি  ছিলেন এজিএম ওসমানী । মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তার ভূমিকা চরম বিদ্বেষ মূলক ছিল সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি… তিনি হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে খেতাব বঞ্চিত করেন। খেতাব থেকে বলতে গেলে একেবারে বঞ্চিত ছিলেন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা যোদ্ধারা।খেতাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল সামরিক বাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা চরম আহত হন।
ব্যাক্তিগত বিদ্বেষের কারণে ৩ জন সেক্টর কমান্ডারকে কোন প্রকার খেতাব দেননি। উল্টো তিনি পাকিস্তান প্রত্যাগত সেনাদের উঁচুস্থানে পুনর্বাসন করে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত স্পর্শকাতর অনেক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর পোষ্য,পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগত অনেক রাজাকার কর্মকর্তার অনুপ্রবেশ ঘটান মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চরম অবমূল্যায়ন করে।
ওসমানী এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের বঞ্চিত করে একাত্তরে মাতৃভূমির সাথে বেইমানি করা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের  পুনর্বাসন করে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে দুর্বল করে দেন।

মূলত অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং নেতাদের অতিরিক্ত পক্ষপাতমূলক মনোভাবের কারণে আওয়ামী লীগের ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়ে ৭৫ এর ১৫ আগস্টের ভিত রচনা করে ।

দুর্ভাগ্য

*প্রকৃতিক দুর্যোগ -১৯৭২ সালে সারাদেশে প্রচন্ড খরা,৭৩ সালে তিনটি উপকূলীয় জেলায় ডিসেম্বরে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়।১৯৭৪ সালে ভয়াবহ এক বন্যার কবলে পড়ে দেশ।দুইবার বন্যায় সেবার দেশের ৩ কোটি লোক আক্রান্ত হয়।এবং এক কোটি টন ফসল নষ্ট হয়। সারাদেশের ভারসাম্য একেবারে ভেঙে যায় প্রকৃতিক দুর্যোগের কারণে।

*দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারন ছিল ১৯৭৩-৭৪ সালে সারাবিশ্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সংকট জনক মুদ্রাস্ফীতি  দেখা দিয়েছিল।সারা বিশ্বে তেলের দাম ৩-৪ গুন বেড়ে যায় ।স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশে ও দাম বেড়ে যায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর।

একদিকে প্রকৃতিক দুর্যোগ অন্যদিকে  বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি সবমিলিয়ে একটু নতুন দেশের জন্য খুবই সংকটপূর্ণ সময় ছিল  এতদাসত্ত্বেও শেখ মুজিবের দৃঢ় পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ সকল দুর্যোগ কাটিয়ে উঠতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল।

কিন্তু দেশীয় ও বিদেশী অপশক্তি প্রকৃতিক দুর্যোগ এর করাল গ্রাসকে রাজনৈতিক অভিলাষ পূরনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্নে প্রকৃতির নির্মম আচরণ ও পরিস্থিতি প্রতিকূলে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ।

দেশীয় চক্রান্ত

বঙ্গবন্ধু খুবই উদারচিত্তের অধিকারী ছিলেন। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য তিনি যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পিছুপা হতেন না। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের খুব বেশি মেধাবী ও দক্ষ জনগোষ্ঠী ছিলো না।ফলে দেশ গঠনে প্রচুর মেধাবী লোকের প্ৰয়োজন ছিল। তাই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সেবা এবং পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া অনেক আমলাকে প্রশাসনে রেখে দেশ গঠনে কাজের সুযোগ দেন। কিন্তু এই আমলারা বঙ্গবন্ধুর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো বিভিন্ন সময়ে কারণ পাকিস্তানকে সেবা দেওয়া আমলারা বাংলাদেশকে সহজে নিতে পারেনি। পদে পদে তারা স্বাধীন বাংলাদেশের স্তম্ভের সাথে বেইমানি করেছে ..একটা  উদাহরণ না দিলেই নয়

সেই আমলাদের  একাংশ পাক – মার্কিন চীন মদদপুষ্ট চক্রান্তকারীদের সঙ্গে মিলিত হয়ে সরকারের অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিলম্বিত করেন। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে কলঙ্কিত হয়। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯৭৪ সালের লবণ সংকট। ওই বছর প্রথম দিকে বাংলাদেশে লবণের ‘দুর্ভিক্ষ’ দেখা দেয়। প্রতি সের লবণের দর লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠে একেবারে ৬০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়। অথচ তখন চট্টগ্রাম বন্দরে প্রচুর লবণ জমা ছিল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে তদন্ত করতে গিয়ে জানতে পারলেন, রেল ওয়াগনের অভাবের অজুহাতে আমলারা চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনতেন না, তাই লবণের দাম আকাশছোঁয়া। বঙ্গবন্ধু আমলাদের ওপর ভরসা না রেখে নিজ উদ্যোগে চট্টগ্রাম থেকে লবণ আনার ব্যবস্থা করেন। তিনি ওই লবণ আনার জন্য রেলের সব ওয়াগন রিকুইজিশন করেন। চট্টগ্রামের গুদামজাত লবণ কয়েক দিনের মধ্যেই সারা দেশে সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। ফলে লবণের দাম কমে যায়। কিন্তু এর আগেই যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। লবণের দাম বেড়ে যাওয়ায় জনরোষ বেড়ে যায়। দেশীয় রাজনীতিবিদ – আমলা – বিদেশী অপশক্তি  লবণের দাম বৃদ্ধি এবং দুর্ভিক্ষকে তাদের কাজে লাগিয়ে দেশকে অশান্ত করে তোলে।

আরেকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয় মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এবং আওয়ামী ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ। মুক্তিযুদ্ধ শেষে সকল মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু অস্ত্র জমা দেয়নি বঙ্গবন্ধুর আদেশ অনুযায়ী। বাম রাজনৈতিক দল , সর্বহারা এবং চরমপন্থী সন্ত্রাসীরা মুক্তিযুদ্ধে ব্যাবহার করা অস্ত্র জমা না দিয়ে দেশের অভ্যন্তরে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে সারা দেশে পরিবেশ অস্থিতিশীল করে  তারা বঙ্গবন্ধুর অস্ত্র জমাদানের নির্দেশ  উপেক্ষা করে। আওয়ামীলীগ নেতৃত্ব এবং ছাত্রলীগের নেতারা কেন মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বাসঘাতক অধিকাংশ বাম রাজনৈতিক দল , সর্বহারা এবং চরমপন্থী সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ দিতে চাননি এবং অস্ত্র তুলে দিতে চাননি কেন সেটা  যে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল তা প্রমাণ  হয়েছিল।

বিপক্ষ দলের রাজনৈতিক রাও কম দায়ী ছিলো না।
ভাসানীর রহস্যময় ভূমিকা কম দায়ী নয় ৭৫ এর ১৫ আগস্টের ঘটনার পেছনে।


স্বাধীনতার পর  ভাসানী রাজনীতিতে সুবিধা করতে না পেরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করার প্রস্তাব ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম ভাসানী করেন,এর মাধ্যমে তিনি রাজাকারদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। শুধু তা করে ক্ষান্ত হননি ভাসানী  ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে একাত্তরের দালাল, পাকিস্তান-পন্থী বাঙালি, ডানপন্থী ও চৈনিক বামপন্থী রাজনীতিকদের নিয়ে ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করেন ভাসানী। এরা সবাই মিলে ঘাতকদের আঘাত হানার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

বঙ্গবন্ধুর আকাশসম জনপ্রিয়তা ঘাতকদের ঈর্ষান্বিত করে তোলে।

বিদেশী চক্রান্ত

বঙ্গবন্ধুর সাফ কথা বলতে খুবই পছন্দ করতেন বৈদেশিক  নীতি  ছিল ‘ সবার সাথে বন্ধুত্ব কারো সাথে বৈরিতা নয়’

বঙ্গবন্ধু কখনো চাননি পুঁজিবাদ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করুক যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে।তিনি
চাননি বাংলাদেশ পুঁজিবাদী দেশগুলোর ঋণের চাপে গোলামী করুক। শুরু থেকে বঙ্গবন্ধু ছেয়েছিলেন বাঙালি আত্মমর্যাদাবান জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। তাই যেকোন দেশের ঋণ সহয়তা যুক্তিসঙ্গত না হলে ফিরিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না বঙ্গবন্ধু।
১৯৭২ সালের ১৯ মে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি- ন্যাপের জাতীয় সম্মেলনে সদর্পে ঘোষণা করেন

‘স্বাধীনতার বিনিময়ে আমরা এধরনের কোনও সাহায্য গ্রহণ করতে পারি না। শর্তযুক্ত কোনও সাহায্য আমরা নেবো না।’

বঙ্গবন্ধুর এই আত্মসম্মানবোধের কারণে বিদেশী প্রভুরা বঙ্গবন্ধুর উপর রুষ্ট হয়। বঙ্গবন্ধু চাইতেন বাঙালি সবসময় আত্মমর্যাদায় বলিয়ান হোক।

বঙ্গবন্ধুর আত্ম মর্যাদার কারণে আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংক,আমেরিকা এবং অন্যান্য দাতা গোষ্ঠী বাংলাদেশে  সাহায্য দেওয়া কমিয়ে / বন্ধ করে দেয়  বাংলাদেশকে দাসত্ব করানো যাবেনা বলে।

৮০ এর দশকে আমেরিকা ছিল বিশ্বে প্রধান খাদ্য নিয়ন্ত্রক দেশ। যেদেশে সর্বশক্তি দিয়ে আমেরিকা নিজের প্রভাব বিস্তর করতে পারতোনা সেদেশে ফুড পলিটিক্স এর নোংরা রাজনীতিতে উন্মত্ত থাকতো।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমেরিকার এই নোংরা ফুড পলিটিক্স এর জন্য লাখ লাখ মানুষ মারা যায় ।

১৯৭৩-৭৪ এর প্রাকৃতিক দুর্যোগের দরুণ বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ  সৃষ্টি হলে নিক্সন সরকার বাংলাদেশের সাথে কেনা খাদ্য সামগ্রী পাঠানো বন্ধ করে দেয় এবং দুর্যোগে কোন প্রকার সাহায্য দেয়নি।

জনতার নেতা শেখ মুজিব কখনো বিদেশী শক্তির কাছে নত হননি।

Mandatory Credit: Photo by Royle/AP/Shutterstock (7322569a) Sheikh Mujibur Rahman Sheikh Mujibur Rahman, center on Rostrum, leader of East Pakistan’s powerful Awami League, addresses an election rally in Dacca, East Pakistan, . Pakistan’s population goes to the polls Monday, in the first general election since independence more than 25 years ago, and Rahman is expected to become East Pakistan’s premier Bangladesh Independence/Sheikh Mujibur Rahman, Dacca, Bangladesh

অন্যদিকে আমেরিকার পিএল-৪৮০ কার্যসূচি অনুযায়ী বাংলাদেশে খাদ্য সাহায্য পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ওই বছরই কিউবার কাছে পাট বিক্রি করায় আমেরিকা ক্ষিপ্ত হয়ে বাংলাদেশে খাদ্য-সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দেয়। পরে অবশ্য মার্কিন অফিসাররা গোপনে অনেক পরামর্শ করে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে খাদ্য পাঠান। তত দিনে দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে  গিয়েছিল।

সাংবাদিক পরেশ সাহার ‘মুজিব হত্যার তদন্ত’ বই থেকে কিছু তথ্য দেখুন :

‘১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় শেখ মুজিব কোনো রাতেই ঘুমাতে পারেননি। সারা রাত তিনি তাঁর বাসভবনের বারান্দায় পায়চারি করেছেন। খাদ্যমন্ত্রী মোমিন সাহেবকে ডেকে বলেছেন, কিছুই লুকিয়ো না। না খেতে পেয়ে আমার বাংলার কত লোক মরছে, তার সত্য হিসাব জাতীয় সংসদে পেশ করো। দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলে সফর করতে গিয়ে ক্ষুধার্ত মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরে তিনি কেঁদেছেন আর কেঁদেছেন।’ (পৃষ্ঠা-৬৫)

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা যে নানা উপায়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে খাদ্য কেনেন এবং সেগুলো নষ্ট করে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, এর প্রমাণ সাংবাদিক পরেশ সাহার বইয়েও উল্লেখ আছে। পরেশ সাহার ভাষায়, ‘১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর আমি বাংলাদেশে যাই। তখন ঢাকার অন্তর্গত সাভার বন্দরের জনৈক ব্যবসায়ী আমাকে জানান, তিনি কটি বিদেশি সংস্থাকে চাল সরবরাহ করতেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, ওই সংগৃহীত চাল বাংলাদেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য বিতরণ করা হবে। কিন্তু তিনি জানতে পেরেছেন, ওই চাল দুঃখী মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়নি, বাংলাদেশের খাদ্য সংকট আরো শোচনীয় করার জন্য ওই সব চাল সুন্দরবনের নদীগর্ভে ডুবিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, গোপন সূত্র থেকে ওই খবর পাওয়ার পর তিনি বিদেশি সংস্থাকে চাল সরবরাহ বন্ধ করে দেন।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই খাদ্য নিয়ে কুট রাজনীতির  জন্য সারা দেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয় এবং দেশীয় মার্কিন পেইড এজেন্ট দ্বারা সংবাদ মাধ্যমে বিভিন্ন মিথ্যা প্রপাগান্ডা  প্রচার করে দেশের মানুষকে উন্মত্ত করে তোলে।ফলে সারাদেশে বিভিন্ন জায়গায় খাদ্যের জন্য প্রতিনিয়ত হানাহানি লেগে থাকতো।

এতো গেল খাদ্য রাজনীতির কথা এবার আসি কুটিল নির্মম রাজনীতির উপাখ্যানে –


বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল ঘাতক মোশতাক  ছিল মার্কিন পন্থী রাজনীতিবিদ। মোশতাকের অনুসারী ছিল তাহের ঠাকুর, চাষী নজরুল ইসলাম। এরা বঙ্গবন্ধু হত্যার বিভিন্ন প্ল্যান নিয়ে আমেরিকান দূতাবাসের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখতো।কুমিল্লার বার্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় এরা বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে ঘাতক সেনা কর্মকর্তাদের সাথে অনেকবার মিটিংয়ে বসে মার্কিন দূতাবাসের যোগসাজশে অনেকবার। মার্কিন কূটনতিক বোস্টারে র সাথে মোশতাক এবং তার গ্যাংয়ের হত্যা নিয়ে আলোচনা হয়।

আরেক ঘাতক জিয়া ছিল সি আইয়ের এজেন্ট , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সত্তরের দশকে গিয়ে গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যায় পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিল কারণ বঙ্গবন্ধু হত্যায় সবচেয়ে বেশি লাভবান ছিল জিয়া ।
অ্যান্থনি মাসকরহানসের ভাষায় জিয়া ছিল ‘বঙ্গবন্ধু হত্যায় পর্দার অন্তরালের ঘাতক এবং সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি ” । বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে জিয়া বিভিন্ন সময় ঘাতকদের সাথে আলোচনায় বসে এবং গোপনে মার্কিন ইন্টিলিজেন্স এর সাথে আতাত করতেন। বঙ্গবন্ধুর যারা ঘাতক তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যোগসূত্র হলো ,মোশতাক ছিল বাংলাদেশে মার্কিনপন্থী রাজনীতিবিদ,আর সেনা কর্মকর্তা জিয়া সহ অন্যান্য ঘাতকদের পূর্বে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সাথে পূর্বেকার সম্পর্ক।

মূলত মার্কিন দূতাবাসের যোগসাজশে এদেশীয় বিপদগামী রাজনৈতিক নেতা এবং সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সপরিবারে   বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল নকশা নির্ভুলভাবে বাস্তবায়িত হয়।

বঙ্গবন্ধু কে হত্যার পরে ২৪ ঘণ্টা এভাবেই ফেলে রাখে ঘাতকেরা। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ বাংলাদেশ স্বাধীন করা!

সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিশদ অনুসন্ধান করতে গেলে অনেক কারণ বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর যাদের বিশ্বাস করে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন  ( মোশতাক, জিয়া সহ অনেকে) তারা বঙ্গবন্ধুর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো,সেই সাথে ছিল দেশীয় এবং বিদেশী অপশক্তির  অনেকদিনের ষড়যন্ত্রের সফল মঞ্চায়ন। তবে আরো বিশদভাবে গবেষণা করার জন্য মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী গবেষক এবং যারা সে সময়ের ঘটনা প্রবাহে জড়িত ছিলেন তাদের ভাষ্য খুবই ভাষ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বঙ্গবন্ধু হত্যা অনেক দিনের মাস্টার প্ল্যানের ফসল,এর পেছনে অনেক দেশীয় ও বৈদেশিক শক্তি জড়িত থাকতে পারে, এদের মুখোশ উন্মোচন করে বিচারের আওতায় আনতে হলেও একটি নির্মোহ গবেষণা দরকার।

তথ্যসূত্রঃ
ইতিহাসের রক্ত পলাশ – আবদুল গাফফার চৌধুরী
হু কিল্ড মুজিব – বি এল খতিব
মুজিবের রক্ত লাল – এম আখতার মুকুল
মুজিব হত্যার তদন্ত – পরেশ সাহা