গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ৪ নভেম্বর,১৯৭২।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদের শেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং এ অধিবেশনে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয় । বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র দশ মাসের ভেতর বঙ্গবন্ধুর সরকার বাংলাদেশকে সংবিধান উপহার দিতে সক্ষম হয় যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

আসুন দেখে আসি সেই ভাষণ সংগ্রামের নোটবুক থেকে ।

কি বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে আসুন জেনে নেই

আমার মনে পড়ছে গত ২৫ মার্চের রাতে আমার বাড়ির ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণের মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী আমাকে গ্রেফতার করে। আমার দেশবাসীর রক্ত মাড়িয়ে যেতে বাধ্য করলো তারা। তিনি বলেন, গ্রেফতার করে তাকে যখন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তার কানে আসছিল মেশিনগানের গর্জন। বাড়িঘরে লাগানো আগুনের শিখা দেখেছিলেন। বারবার পাকিস্তানি বাহিনীকে বলেছিলেন তাকে হত্যা করে তার দেশবাসীকে রেহাই দিতে। কিন্তু তারা জনগণকে হত্যা করলো। এই কথা বলার পর বঙ্গবন্ধুর অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। অশ্রু সংবরণ করে চোখের জল মুছে শেষ পর্যন্ত একেবারে ভেঙে পড়ে বলেন, কেউ বিশ্বাস করতে পারে যে মানুষ এত হিংস্র হয়ে যাবে, দুই বছরের মাসুম বাচ্চাকে হত্যা করে মায়ের বুকে ছুড়ে মারবে, কী করে বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ এমন পশু হয়ে যেতে পারে যে আমার দেশের ৭০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষণ করবে।

আওয়ামী লীগ সামরিক শক্তির বলে ক্ষমতায় নেই। আওয়ামী লীগ জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং জনগণ আওয়ামী লীগের সমর্থনে আছে। দুনিয়ার কোনও দেশ বিপ্লবের পর মাত্র ১০ মাসের মধ্যে দেশের সংবিধান দেয়নি।

দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা যায় না, দশ মাসের মধ্যে কোন দেশ শাসনতন্ত্র দিতে পেরেছে। আমি নিশ্চই মোবারকবাদ জানাবো শাসনতন্ত্র কমিটির সদস্যদেরকে। মোবারকবাদ জানাবো বাংলার জনসাধারনকে। রক্তে লেখা এই শাসনতন্ত্র। যাঁরা আজ অন্য কথা বলেন বা চিন্তা করেন, তাঁদের বোঝা উচিত যে, এ শাসনতন্ত্র আলোচনা আজ থেকে শুরু হয় নাই। অনেকে যাঁরা বক্তৃতা করেন, তাঁদের জন্মের আগের থেকে তা শুরু হয়েছে এবং এ জন্য অনেক আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। এই শাসনতন্ত্রের আলোচনা হতে হতে শাসনতন্ত্র কী হবে তার উপরে ভোটের মাধ্যমে, শতকরা ৯৮ জন লোক তাঁদের ভোট আওয়ামী লীগকে দিয়েছেন। শাসনতন্ত্র দেওয়ার অধিকার আওয়ামী লীগের রয়েছে। . . . । শাসনতন্ত্র ছাড়া কোন দেশ- তার অর্থ হল মাঝি বিহীন নৌকা, হাল বিহীন নৌকা। শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকার থাকবে, শাসনতন্ত্রে মানুষের অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যও থাকবে। এখানে চলতে পারে না। শাসনতন্ত্রে জনগণের অধিকার থাকবে, কর্তব্যও থাকবে। এবং যতদূর সম্ভব, যে শাসনতন্ত্র পেশ করা হয়েছে, সেটা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক হয়ে থাকবে, সে সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমাদের আদর্শ পরিষ্কার হয়ে রয়েছে। এই পরিষ্কার আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। এবং সে আদর্শের ভিত্তিতে এদেশ চলবে। জাতীয়তাবাদ-বাঙালি জাতীয়তাবাদ-এই বাঙালি জাতীয়তাবাদে চলবে বাংলাদেশ। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার আকাশ-বাতাস, বাঙালির রক্ত দিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ। আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, জনসাধারণের ভোটের অধিকার বিশ্বাস করি। আমি বিশ্বাস করি সমাজতন্ত্রে, যেখানে শোষণহীন সমাজ থাকবে। শোষক-শ্রেণী আর কোনদিন দেশের মানুষকে শোষণ করতে পারবে না।. . . । আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। . . . । এই চারটি আদর্শের ভিত্তিতে বাংলার শাসনতন্ত্র তৈরি হবে। এটা জনগণ চায়, জনগণ এটা বিশ্বাস করে। জনগণ এই জন্য সংগ্রাম করেছে। লক্ষ লক্ষ লোক এই জন্য জীবন দিয়েছে। এই আদর্শ নিয়েই বাংলার নতুন সমাজ গড়ে উঠবে’।

আমি বিরাট দায়িত্ব থেকে মুক্ত হলাম। দেশের নিজস্ব সংবিধান হয়ে গেলো। পরিষদের এক ঐতিহাসিক ভাষণ শেষে বঙ্গবন্ধু তার নিজ কক্ষে ফিরে এলে মন্ত্রীবর্গ ও গণপরিষদের সদস্যবৃন্দ তাকে অভিনন্দন জানাতে আসেন। তখন বঙ্গবন্ধুকে অবসাদগ্রস্ত দেখা যাচ্ছিল। তবে তিনি বলেন, এর চেয়ে আনন্দের দিন আর হয় না। আমি অত্যন্ত সুখী যে দেশবাসীর কাছে দেওয়া আমার ওয়াদা পূরণ করতে পেরেছি।

সংবিধান বিল গৃহীত হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন,

জনাব স্পিকার সাহেব, আজই প্রথম সাড়ে সাত কোটি বাঙালি তাদের শাসনতন্ত্র পেতে যাচ্ছে। বাংলার ইতিহাস বোধ হয় এই প্রথম যে বাঙালিরা তাদের নিজেদের শাসনতন্ত্র দিচ্ছে। বোধ হয় না- সত্যিই এই প্রথম যে, বাংলাদেশের জনগণের প্রতিনিধিরা জনগণের ভোটের মারফতে এসে তাঁদের দেশের জন্য শাসনতন্ত্র দিচ্ছেন। . . . । এই শাসনতন্ত্র শহীদের রক্ত দিয়ে লেখা। কোন দেশে কোন যুগে আজ পর্যন্ত এত বড় রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরে এত তাড়াতাড়ি শাসনতন্ত্র দিতে পারে নাই। . . .। তাই মানুষের মৌলিক অধিকার যাতে তাড়াতাড়ি ফিরে আসে, তারই জন্য আমাদের পার্টি এই শাসনতন্ত্র প্রদান করল। আশা করি, জনগণ এই শাসনতন্ত্র গ্রহণ করবেন এবং করেছেন। …। এই শাসনতন্ত্রের জন্য কত সংগ্রাম হয়েছে এই দেশে। . . . । শাসনতন্ত্র এমন একটা জিনিস, যার মধ্যে একটা আদর্শ, নীতি থাকে। সেই শাসনতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে আইন করতে হয়।. . . । এই মৌলিক আইন বিরোধী কোন আইন হতে পারবে না।. . . । এটা জনতার শাসনতন্ত্র।…। ভবিষ্যৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে আমার জীবন সার্থক হবে, শহীদের রক্তদান সার্থক হবে’।

গণপরিষদে দেওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে পরিগণিত হয়। ৪ নভেম্বর এর গুরুত্ব অনুধাবন করে বিভিন্ন মহল থেকে ৪ নভেম্বরকে বাংলাদেশের সংবিধান দিবস হিসেবে ঘোষণা করার দাবি উঠেছে।

আর্টিকেল তৈরি করতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং বাংলা ট্রিবিউন এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।