ধর্মনিরপেক্ষতা মানে কী????

ধর্ম নিরপেক্ষতার কনসেপ্ট নিয়ে ধর্ম ব্যাবসায়ী এবং তাদের অনুসারীরা প্রতিনিয়ত ট্রল করলেও মাঝে মধ্যে নিজেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যাই ছাত্রলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের গা ছাড়া ভাব দেখলে!!! নব্য লীগাররা আসলে জানেই না ধর্ম নিরপেক্ষতা কি?!? নিশ্চিত করে বলতে পারি নতুন প্রজন্মের(নব্য আওয়ামী, ছাত্রলীগ ) শতকরা ৯০% জানে না আসলে আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষতা কি??? এখন সুযোগের অভাবে দেশে আওয়ামী, ছাত্রলীগের সংখ্যা বেশি তো তাই হয়ত মাঝে মাঝে এরা নিজেদের রূপ প্রকাশ করে দেয়।

আসলে ধর্মনিরপেক্ষতা কি?

নিজের ভাষায় না বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য থেকে দেখে নেই আসলে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কি?

১৯৭২ সালের চার নভেম্বর গণপরিষদের শেষ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন

“ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম কর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবো না। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, তাদের বাধা দেওয়ার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রে কারো নাই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খৃষ্টানরা তাদের ধর্ম করবে তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হল এই যে, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বৎসর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়া,চুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যাভিচার – এই বাংলাদেশের মাটিতে এ-সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা চলবে না।

”হ্যা এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ।এই ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন পাশ্চাত্য থেকে ধার করা সেলকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতা না এই দর্শন বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শন।

কোন জিলাপীর প্যাঁচ না বঙ্গবন্ধুর এই ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শন।

একেবারে সাফ কথা বঙ্গবন্ধুর”ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে না”বঙ্গবন্ধু কারাগারের রোজনামচাতে খুব সুন্দর করে উল্লেখ করে দিয়েছেন

‘জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালবাসে; কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দিবে না এ ধারণা অনেকেরই হয়েছিল। জনসাধারণ চায় শোষণহীন সমাজ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি’(পৃষ্ঠাঃ২৫৮)।

এই দর্শন কোন ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক? কোন ধর্মবেত্তা দেখাতে পারবেন???????কিন্তু এই বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শনকে বাংলার ধর্ম ব্যবসায়ীদের সকলে নাস্তিকতা বলে প্রচার করে বেড়ায়।

ওয়াজ মাহফিলে উন্মাদ হয়ে বর্তমানে এরা বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শনকে “সেকুলার সেকুলার” বলে অনেকটা গালিতে রূপান্তর করে বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শনকে হাস্যরস বানিয়ে ফেলছেন। বিশ্বাস না হলে সাধারণ মানুষ থেকে ধর্ম নিরপেক্ষতা সমন্ধে একটু মতামত শুনবেন , চোখ আরো কপালে উঠবে যখন দেখবেন বর্তমান ছাত্রলীগের ৯০% নেতা – কর্মী ধর্ম নিরপেক্ষতা মানেনা। মানবে কি করে বুঝলে তো জানলে তো??

আমি যদি ভুল না করে থাকি আমাদের মহানবীর সকল ধর্ম সমন্ধে দর্শন ও ছিল এরকম। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর দর্শন ও ছিল এরকম , তিঁনি অনুসারীদের স্পষ্ট ভাবে বলে দিয়েছিলেন ‘ ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ‘”যার ধর্ম সে পালন করবে।

“মহানবী (সা.) আরো বলেছেন,

‘কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুন্ন করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব। ’ –সুনানে আবু দাউদ : ৩০৫২

কুরআনে ও আল্লাহ বলেছেন

কিতাবধারী হে! নিজেদের ধর্ম নিয়ে অযথা বাড়াবাড়ি কোরো না। আর (ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করে) তোমাদের আগে যারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হয়ে ও অন্যদেরকে পথভ্রষ্ট করে সহজ সরল পথচ্যুত হয়েছে, তাদের পথ অবলম্বন কোরো না।’ (সুরা মায়িদা : ৭৭)।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন

‘ধর্মের ব্যাপারে জোরজবরদস্তি নেই। ভ্রান্ত মত ও পথকে সঠিক মত ও পথ থেকে ছাঁটাই করে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। ’ -সূরা বাকারা :২৫৬

সুতরাং ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য, আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য। ’ -সূরা কাফিরুন : ৫

এতগুলো রেফারেন্স দেয়ার উদ্দেশ্যে হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ধর্মিরপেক্ষতা যা ধর্ম ব্যাবসায়ীদের কাছে সেকুলারিজম নামক গালি তাদের কাছে প্রশ্ন বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতার দর্শন বাংলাদেশের সংবিধানে লিখিত সেকুলারিজম তথা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ আপনাদের চোখে গালি কিংবা নাস্তিকতা হলেও কুরআন সুন্নাহর আলোকে বাংলাদেশের সংবিধানে লিখিত বঙ্গবন্ধুর ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদ কীভাবে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক???

প্রকারান্তে বঙ্গবন্ধু ধর্ম নিরপেক্ষতার বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্তির মাধ্যেমে কুরআন হাদীস অনুযায়ী যথাপোযুক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং সকল ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে।ধর্ম ব্যবসায়ীদের সমস্যা দেশে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকলে, বঙ্গবন্ধুর দর্শন অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হলে এদের মুখোশ উন্মোচিত হবে এবং এদের ধর্ম ব্যাবসা করে জীবিকা নির্বাহ সম্ভব হবেনা।

সবচে বড় কথা হচ্ছে এদের দর্শন ” বাংলা হবে আফগান ,আমরা হবো তালেবান “ অর্থাৎ বাংলাদেশকে জঙ্গিস্থান বানানো সম্ভব হবে না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে।এজন্যই ধর্ম ব্যাবসায়ীদের এত ক্ষোভ আওয়ামীলীগের উপর!

ধর্ম ব্যবসায়ীদের প্রতি একটা আরজি যদি আপনাদের সৎ সাহস থাকে তাহলে রাজনীতির কথা বলে রাজনীতি করেন,হুদাই শান্তির ধর্ম ইসলামকে নিয়ে নোংরা রাজনীতি করবেন না। ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করে রাজনীতি করেন বলেই বাংলাদেশের ইতিহাসে কিংবা আপনদের পুত পবিত্র পাকিস্থানে থাকাকালেও শতকরা ৫% ভোট পাননি কখনো কখনো অথচ দেশের ৯০% মানুষ মুসলিম! এই ৯০% মুসলিম সহজ, সরল, ধার্মিক আপনাদের ভন্ডামি ওরা বারবার বোঝে বলেই প্রত্যেকবার আপনাদের প্রত্যাখ্যান করেছিল ,করেছে,করবে।

সাহস থাকলে রাজনীতির কথা বলে রাজনীতি করুন,লেবাস পরে আর কতদিন থাকবেন?

আর ধর্ম ব্যাবসায়ীদের আস্ফালনের জন্য আমরা ক্ষমতাসীনরা কম দায়ী না! ধরুন ছাত্রলীগের কথাই বলি।পোলাপান বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতা শিখবে কই থেকে? কেউ শেখায় তাদের ?? শুধু শেখায় নেতার পিছে পিছে ঘুরঘুর ,সারাদিন প্রটোকল,নেতার সাথে সহমত পোতানো , দাসবৃত্তি,অন্য সবার অধিকারের কথা বাদ দিলাম নিজের অধিকারের কথাই বলতে পারেনা কেউ।মাঝে মাঝে অবশ্য কিছু গৎবাধা বক্তব্য দেখা যায় যেগুলো শুনে সবাই হাসে আরকি, এর ফলে নিজেরা হাইলাইট হয় মিমার হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ,দর্শন শেখানোর চাইতে তাদের কাছে ক্ষমতার মেয়াদ বৃদ্ধিই মুখ্য! এই যদি হয় উপরের অবস্থা সংগঠনের কর্মীদের অবস্থা কি রকম হবে কল্পনা করুন!

এখনো সময় আছে কিনা জানিনা এখনো আপনারা আপনাদের কর্মীদের শেখাতে,জানাতে পারছেন না বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দর্শন দেশের মানুষকে কীভাবে শেখাবেন? নিজেদের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দাবি করা সৈনিকেরা যদি অন্তত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নূন্যতম ধারন করতো তাহলে অন্তত উগ্র মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক ধর্ম ব্যাবসায়ীদের আস্ফালন ঘটতো না।