স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশ্যে তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ।তাজঅউদ্দিন সহ জাতীয় চার নেতার দক্ষ নেতৃত্বে বাঙালি মাত্র নয় মাসের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে ছলে যায়। ভারত এবং ভুটান স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতি দেওয়ার পরে তাজউদ্দীন রেডিওতে ভাষণ দেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জাতির উদ্দেশ্যে তার ভাষণের লিখিত রূপ নিচে দেয়া হলো-

“দেশবাসী সংগ্রামী ভাই বোনেরা। পা কিস্তানী সমর নায়কেরা আজ সারা উপমহাদেশে এক সর্বনাশা যুদ্ধ ডেকে এনেছে। বাংলাদেশে তাদের ভ্রান্তি ও অপরাধের পরিনতি যে এই পথেই ঘটবে গত কয়েক মাস থেকেই তা বুঝা যাচ্ছিললও” এক দিকে মুক্তি বাহিনীর হাতে পাকিস্তানী সৈন্যদের লজ্জাজনক বিপর্যয় এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসাধারনের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামের প্রতি ভারতের আন্তরিকতাপূর্ণ সমর্থন। এই পটভূমিকায় পাকিস্তান ভারতকে আক্রমন করেছে। ভারত ও বাংলাদেশের বিপদ এসেছে একই শত্রুর কাছ থেকে। এর ফলে দুই দেশের মানুষের সম্পর্ক নিবিড়তর হয়েছে। মুক্তি বাহিনী এবং ভারতীয় সৈনিকেরা এখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করছে। উভয়ের মিলিত রক্তধারায় রঞ্জিত হচ্ছে আমাদের দেশের মাটি। ভারতের জনসাধারণঅনেক আগেই আমাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের অন্তরে। এখন তাদের সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সর্বশ্রেনীর জনসাধারণের পক্ষে এ এক বিজয়। বিজয় তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আর বিজয় তাদের মুক্তিবাহিনীর। স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি হিসেবে আমাদের কূটনৈতিক স্বীকৃতি লাভ আজ সম্ভবপর হলো অগনিত শহিদের রক্তের বিনিময়ে। মুক্তি বাহিনীর দুঃসাহসিক তৎপরতা অপূর্ব আত্মত্যাগ ও দুর্ভেদ্য ঐক্যের ফলে। ভারতের পরে ভুটান স্বীকৃতি দিয়েছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে। এর জন্য আমরা ভুটানের রাজা ও জনসাধারণের নিকট কৃতজ্ঞ।

৮ ডিসেম্বরে জাতির উদ্দেশ্যে বঙ্গ তাজের ভাষণ

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে সকল প্রগতিশীল রাষ্ট্রেরই স্বাগত জানানো উচিৎ। আমাদের এই নতুন রাষ্ট্র্বের আদর্শ হলো শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোট নিরপেক্ষতা এবং সর্ব প্রকার সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরোধিতা করা। আমরা গণতন্ত্র ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। সাড়ে সাত কোটি মানুষের বাস্তব অস্বিত্বকে স্বীকার করে ভারত ও ভুটানের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার জন্য আমি সকল রাষ্ট্রকে আহ্বান করছি। পশ্চিম পাকিস্তানসরকার যে অমঙ্গলের সূচনা করেছে বাংলাদেশে পরিণামে তাই আজ তাকে ধ্বংস করতে চলেছে। এই অবশ্যম্ভাবী পরিনতি থেকে তার পৃষ্ঠপোষকেরা তাকে বাঁচাতে চেয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। কিন্তু সে প্রয়াস ব্যার্থ হয়েছে। বাংলাদেশের সংঘর্ষের মূল কারণ বিবেচনা না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই উপমহাদেশে যুদ্ধ বিরতির যে প্রস্তাব করেছে তা মার্কিন সরকারের অন্ধতা ও বিকৃত বিচার বুদ্ধির পরিচায়ক। চীনও একই ধরনের বিচার বুদ্ধি হীনতার পরিচয় দিয়েছে। তাই নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো প্রয়োগ করায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞ। ইতিহাস আমাদেরকে যে দায়িত্বভার অর্পণ করেছে এখন তা সম্পন্ন করতে হবে আমাদেরকেই। উন্মত্ত যুদ্ধবাদীদের নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রকে কবর দিতে হবে আমাদেরকেই। চারপাশে মৃত্যুর জালে শত্রু জড়িয়ে পড়ছে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রশক্তির মিলিত আঘাতে শত্রু এখন সম্পূর্ণ পর্যদুস্ত, পলায়নপর। বাংলাদেশের ভাই বোনেরা এখন সময় এসে গেছে। একযোগে শত্রুকে প্রবলআঘাত হানুন। এই শেষ আঘাতে তার সমাধি রচনা করুণ। সকল সম্ভাব্য উপায়ে মুক্তিযুদ্ধাদের সাহায্য করুন। শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখুন। বাংলাদেশ সরকারের প্রশাসনের সঙ্গে সকল প্রকার সহযোগিতা করুন। ভবিষ্যৎ যেন এ কথা না বলে যে চরম আহ্বান যখন এলো তখন আমাদের কর্তব্যে ত্রুটি হয়েছে। সকল শত্রু সৈন্য ও রাজাকারদের কাছে আমার আহ্বান অস্ত্র ফেলে দিন। আত্নসমর্পন করুন। এই উপায়ে এখনো আপনারা আত্নরক্ষা করতে পারেন। সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের কাছে আমার আহ্বান কোন অবস্থাতেই নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন না। মনে রাখবেন যে অপরাধীকে আইন মোতাবেক শাস্তি দেয়ার দ্বায়িত্ব আপনার সরকারের এবং সে দায়িত্ব সরকার পালন করবেন। ভাষাগত বা অন্যরকম ভিন্নতার জন্য বাংলাদেশের একটি নাগরিক ও বিপদগ্রস্ত হন তাহলে জানবেন তা হবে এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার আদর্শের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা। তা হবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার অবমাননা। দীর্ঘ্যদিন ধরে দখলদার সৈন্য বাহিনী যে পিড়ন চালিয়েছে তার ক্ষতচিহ্নব বাংলাদেশের সর্বত্র দেখা যাবে। তবু আশ্বাস ও আনন্দের কথা এই যে হানাদারদের শেষ সময় এসে গেছে। বাংলাদেশের সমগ্র ভূখণ্ড শত্রুমুক্ত হতে চলেছে। এবং দেশের গৃহহারা নিপীড়িত সন্তানেরা দুঃখ ও নির্বাসনের কাল কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে আসতে যাচ্ছেন। যুদ্ধ জয়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিকেও জয় করে আনতে হবে। নিষ্ঠুর যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষের উপর সোনার বাংলার সৌধ নির্মান করতে হবে। পুনর্ঘটন ও উন্নয়নের এই আনন্দদায়ক ও মহান কাজের অংশ নিতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি সন্তানকেই। জয় বাংলা।”

অডিও সৌজন্যেঃ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র।