“ধর্মান্ধ বাঙালির মূর্খতা এবং সাম্প্রদায়িকতা “



লেখক :– রাজিত তাহমীদ জি



———————————————————-
পৃথিবীর অনেক রাষ্টের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অবদান যিনি রাখেন, যার অসামান্য নেতৃত্ব একটি জাতিকে এনে দেয় পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি, জাতির সেই মহান নেতাকে রাষ্ট্র কর্তৃক “জাতির পিতা” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।যেমন — আমেরিকার জাতির পিতা জর্জ ওয়াশিংটন, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীজি, পাকিস্তানে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, তুরস্কে আতাতুর্ক কামাল পাশা, ভিয়েতনামে হো চি মিন প্রমুখ। প্রত্যেক রাষ্ট্রের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে সেই রাষ্টের জাতির পিতাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে। জাতির জনক যে রাজনৈতিক দলের বা যে সম্প্রদায়েরই হন না কেন, এই জাতির মুক্তির সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি অবদান যিনি রেখেছিলেন, তিনিই তো জাতির পিতা। দল-মত নির্বিশেষে, রিপাবলিকান ক্ষমতায় থাকুক আর ডেমোক্র‍্যাট ক্ষমতায় থাকুক,জর্জ ওয়াশিংটন যে আমেরিকার জাতির জনক ও আমেরিকার স্থপতি, সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক আমেরিকানের কাছে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। ঠিক একইভাবে ভারতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপি ক্ষমতায় এসে মুসলিম নিধন শুরু করুক, বিজেপির সহযোগী আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংস্থা) ভারতীয় মুসলিমদেরকে জাতিগতভাবে নিধনের কর্ম শুরু করুক, মহাত্মা গান্ধীকে কিন্তু যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে “জাতির জনক” হিসেবেই তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা হয়। বিজেপি ক্ষমতায় এসে তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা অটল বিহারী বাজপেয়ীকে ভারতীয় জাতির পিতা ঘোষণা করার ঘৃণ্য প্রয়াস করতে কখনোই দেখা যায়নি।যদিও গান্ধীজি কিন্তু ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি এই আরএসএসের সদস্য নথুরাম গডসের গুলিতেই প্রাণ হারান।বলা হয়, গান্ধীজি নাকি অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের পক্ষপাতিত্ব করেছেন। মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ছিলেন।বিজেপি যতই কংগ্রেসের রাষ্ট্র পরিচালনা, ধর্মীয় প্রভাব ইত্যাদি নিয়ে সমালোচনা করুক, গান্ধীজিকে জাতির জনক হিসেবে অস্বীকার করার দুঃসাহস তারা দেখায় নি।

আর আমাদের বাংলাদেশ, যে রাষ্টের জন্ম হয়েছে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, সেই রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দলের ভিত্তিতে জাতির পিতার স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতি নির্ভর করে।এ বাঙালি জাতির জন্য চরম লজ্জার বিষয়! বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,যিনি সারাজীবন সমগ্র বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন,তাকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জাতির পিতা হিসেবে স্বীকার করেনা। পৃথিবীতে অন্য কোন দেশ নেই, যে দেশে জাতির জনকের প্রশ্নে মতভেদ রয়েছে, একনাত্র এই বাংলাদেশে জাতির পিতার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল ব্যতীত অন্য বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো জাতির পিতাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে না শুধু তাই নয়, বিএনপি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তুলনা করার এবং জিয়াউর রহমানকে অধিক প্রাধান্য দেয়ার মত দুঃসাহসও দেখিয়েছে।এ আমাদের জাতির জন্য লজ্জার বিষয়। হয়তো জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করার পরে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক শ্রম দিয়েছেন, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন, তবে স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর নিকটে তার অবদান নগণ্যমাত্র। বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবী গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড.জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্যার যথার্থই বলেছিলেন, “জিয়ার স্থান হওয়া উচিত বঙ্গবন্ধুর পায়ের নিচে”। তারপরেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দলীয় স্বার্থের কারণে জাতির চরম অবমাননা করে জিয়াউর রহমানকে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তুলনা করার মত চরম অপমানজনক কাজও করেছে।যাই হোক, এতো গেল রাজনীতির কথা। এবার একটু ভিন্ন বিষয়ে আসি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে বলার সময় এই দেশের কিছু সংখ্যক মানুষের মাথায় জ্বালা ধারা শুরু হয়।তাদের ঘুরে ফিরে একটাই উক্তি, জাতির পিতা তো ইব্রাহীম (আ), বঙ্গবন্ধু নন।অবাক হয়ে চিন্তা করি, আজ স্বাধীনতার এত বছর পরেও কেন একজন বাঙালির মুখে এই কথা??? এই গণ্ডমূর্খ, ধর্মান্ধদের মধ্য দিয়ে এখনো পাকিস্তানি ভাবধারা, সাম্প্রদায়িকতার বীজ এই বাংলাদেশ ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিষ্কার ভাবে তাদেরকে বলতে চাই, শুনে রাখুন,, আগে জ্ঞান অর্জন করে কথা বলবেন। আগে বুঝুন “জাতি” এবং “জাতির পিতা” কাকে বলে?? তারপর শেখ মুজিব না ইব্রাহীম (আ) জাতির পিতা সেইটা বিবেচনা করে কথা বলুন।

জাতিভেদ বিভিন্নভাবে হতে পারে।যথা — (১)ধর্মের ভিত্তিতে, (২) একক ভাষা ও সংস্কৃতিগত ঐক্যের উপর ভিত্তি করে, (৩)একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডে বসবাসকারী ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জনগোষ্ঠীর একক ভূখণ্ডের অধিবাসী হিসেবে ঐক্যের উপর ভিত্তি করে।

ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপর ভিত্তি করে জাতিভেদ হতে পারে।ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম পালন কারী এক-একটা সম্প্রদায় এক একটি ভিন্ন জাতি।যেমন — মুসলিম একটি জাতি, ইহুদী একটি জাতি, ধর্মভেদে। ধর্মের উপর ভিত্তি করে বিশ্বের সকল দেশের সব মুসলিম একটি জাতির অন্তর্ভুক্ত।সকলে আল্লাহর ইবাদতকারী, রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর অনুসারী।এভাবে ধর্মপালনের ভিত্তিতে সম্প্রদায়গত যে ঐক্য পরিলক্ষিত হয়, তার ভিত্তিতে বিশ্ব মুসলিম একটি একক জাতির অন্তর্ভুক্ত। এই মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.)।অর্থাৎ, পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের সকল মুসলিম, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, সৌদি আরব সকল দেশের সকল মুসলিম জনগণ মিলে একটি মুসলিম জাতি।মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ)।

এবার আসি একক ভাষা ও সংস্কৃতি গত ঐক্যের ভিত্তিতে জাতিভেদ।বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র, যে দেশে কিছু ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী ব্যতীত সমগ্র জনগণই বাঙালি।এদেশ বাঙালি জাতি রাষ্ট্র।কিছু উপজাতি এবং আটকে পড়া কিছু উর্দুভাষী বিহারী শরণার্থী ব্যতীত বাংলা ব্যতীত এই রাষ্ট্রে অন্য কোন ভাষা নেই।এই দেশ ভারতবর্ষের ন্যায় বহুভাষাভাষী ও বহুসংস্কৃতির দেশ নয়।এই দেশ একক বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির দেশ।ভাষা ও সংস্কৃতিগত মিল এবং ঐক্যের দিক দিয়ে বাঙালি একটি স্বতন্ত্র জাতি।ভাষা ও ঐতহ্যগত ঐক্যের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান নির্বিশেষে সমগ্র বাংলা ভাষাভাষী জনগন একটি একক জাতি।

এই বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।আপনি মুসলিম হতে পারেন, হিন্দু হতে পারেন, কিন্তু একক ভাষাগত ঐক্যের ভিত্তিতে আপনি বাঙালি।হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র বাঙালির জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, দল-মত নির্বিশেষে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান-বৌদ্ধ নির্বিশেষে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বসবাসকারী সকল মানুষের জাতির পিতা, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিনুর রহমান।

জনগণের মুক্তির জন্য তিনি সারাজীবন লড়াই করেছেন।আসলে, বাঙালি এক বেহায়া জাতি।পৃথিবীর সকল দেশ ধর্ম-দল নির্বিশেষে জাতির পিতাকে সম্মান করে। ডেমোকর‍্যাট আসুক আর রিপাব্কান জর্জ ওয়াশিংটনই আমেরিকার স্থপতি, পাকিস্তানের জাতির পিতা জিন্নাহ (তার প্রতিষ্ঠিত দল ক্ষমতায় থাকুক আর না-ই থাকুক), তুরস্কের আতাতুর্ক কামাল পাশা। আর বেহায়া বাঙালি দলের উপর ভিত্তি করে জাতির পিতাকে সম্মান করে!! ছি!! ছি!! আরে বিএনপি থাক, আর আওয়ামী লীগ,এই জাতিকে মুক্তি দিতে শেখ মুজিবের চাইতে বেশি অবদান কেউ রাখেনি।

এই জাতি মানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালি জাতি। তাই তিনি বাঙালি জাতি আপনার শুধু কথায় কথায় ইব্রাহীম (আ) কে টানেন,আরে তিনি মুসলিম জাতির পিতা। আর বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।কেবল ধর্ম দিয়ে জাতিভেদ হয়না, তাই যদি হতো তাহলে বাংলাদেশ স্বাধীন করার কী দরকার ছিল? মুসলিম জাতির রাষ্ট্র পাকিস্তান থাকলেই তো হতো??বাঙালি জাতি রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কেন ১৯৬২ সালে সিরাজুল আলম খান নিউক্লিয়াস গড়ে তুললেন, কেন বঙ্গবন্ধু স্বাধিকার আন্দোলমে নেতৃত্ব দিলেন। সমগ্র বাঙালি কে হিন্দু, কে মুসলিম, সবার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি এক, সবাই বাঙালি আর এই জাতিত্ববোধে উদ্বুদ্ধ হয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনলতা অর্জিত হয়েছিল।এটাই বাঙালি জাতীয়তবাদ।যারা বাঙালিত্বের চাইতে মুসলমানী কে প্রাধান্য দেন, তারা তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী।বারবার গণ্ডমূর্খ এর মত ইব্রাহীম (আ) কে টেনে মুসলিম জাতির অবমাননা আর করেন না। ইব্রাহীম (আ) মুসলিম জাতির পিতা, আর ধম-বর্ণ নির্বিশেষে দল নির্বিশেষে বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু।
বিষয়টা আপনাদের,ধর্মান্ধদের মাথায় ঢোকেইনা।

“আমরা হিন্দু বা মুসলিম যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি” — ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। আর আপনার কাছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চাইতে মুসলিম যদি বড় হয়, তবে বলব আপনাকে আপনি সাক্ষাৎ রাজাকার। কেননা, ধর্মকে যদি বড় করে দেখা হতো, তাহলে বাঙালি ১৯৫২ সালে ধর্মের উর্ধে উঠে বাংলা ভাষার জন্য রক্ত দিত না।তারা উর্দুকেই মেনে নিত। কারণ উর্দু তো ইসলামী ভাষা। কিন্তু বাঙালি তার জাতির জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।আপনাদের কাছে তো ধর্মই বড়। তাহলে আপনারা নিশ্চয় বিশাল ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তান চাইবেন, বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ চাইবেন না।আর আপনাদের মত মানসিকতার লোকেরাই আল বদর, রাজাকার বাহিনী গঠন করে নারী ধর্ষণ, বাঙালি নিধনে পাকসেনাদের সহায়তা করেছিল।
ধর্মভেদে মূল্যায়ন না করে জাতিভেদে মূল্যায়ন করুন।

অনেক ত্যাগ-তীতিক্ষা, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির রাষ্ট্র বাংলাদেশকে মুক্ত করেছি।আর কোন
পাকিস্তানি মৌলবাদী দালালদের এই বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ছড়াতে দেব না।মনে রাখবেন, এটা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ,এটা পাকিস্তান বা আফগানিস্তান নয়, এটা “মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ”। এদেশের মুক্তির সংগ্রামে মুসলমানেরই কেবল নয়, এদেশের মাটিতে হিন্দু-খ্রিষ্টানের পূত-পবিত্র রক্ত লেগে রয়েছে, পাকসেনাদের বিরুদ্ধে কেবল মুসলমান নয়, হিন্দুও অস্ত্র নিয়ে গর্জে উঠেছিল। এক বাঙালি জাতিত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে ধর্ম-দল নির্বিশেষে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে ঝাপিয়ে পড়েছিল। কাজেই যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বিনষ্ট করে,, মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বিনষ্ট করে, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে মৌলবাদী শক্তির উত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, ধর্মের নামে মানুষের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির বা অসাম্প্রদায়িক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে খন্দকার মোশতাকের ” ইসলামিক রিপাবলিক” কিংবা আফগানিস্তান, পাকিস্তান করার অপপ্রচেষ্টা চালালো হয়, দেশপ্রেমিক বাঙালি মৌলবাদী অপশক্তিকে সমুচিত জবাব প্রদান করবে।