ইতিহাস বিকৃতি এবং সিরাজুল আলম খান

সম্প্রতি কিছু চরম মাত্রায় ইতিহাস বিকৃতি দেখা যাচ্ছে সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে। অনলাইনে এসব বিতর্কের অবসান হওয়া জরুরি।

আমরা প্রায়ই বিভিন্ন সংবাদপত্র কিংবা মিডিয়ায় দেখে থাকি বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার প্রবণতা দেখা যায় বিতর্কিত ব্যাক্তিদের ।এর মাধ্যমে হয়ত সত্যকে লুকিয়ে রাখা যায় সাময়িকভাবে,কিন্তু সত্যের জয় অনিবার্য , মিথ্যা কোনদিন দাবিয়ে রাখতে পারেনা সত্যকে। তাইতো বিভিন্ন সময় অমুক তমুকের সাথে তুলনা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে তাদের। তবে এদের প্রচেষ্টায় একটা বিষয় লক্ষণীয় এখানে তাদের তুলনার বিষয় বঙ্গবন্ধু সব সময় ধ্রুব থাকেন , বঙ্গবন্ধুর সাথে যাদের তুলনা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হেয় করতে চান তারা সবসময় ভ্যারিয়েবল। একেক সময় একেক জনের সাথে তুলনা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়ায় ততই ইতিহাস বঙ্গবন্ধু সমন্ধে নির্মোহ সত্য সাক্ষ্য দেয় ইতিহাস। ইতিহাস ও সদর্পে সাক্ষ্য দেয় ” ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুকে দাবিয়ে রাখা যাবেনা”

বঙ্গবন্ধুর সাথে সিরাজুল আল্ম খান


সিরাজুল আলম খানকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার বলে নোংরা ইতিহাস বিকৃতিতে লিপ্ত।মিথ্যাচার গুলো কি কি ? আসুন ইতিহাসের আয়না দিয়ে সত্য মিথ্যা বিবেচনা করি…

অনেকে যুক্তি দিচ্ছেন সিরাজুল আলম খান স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ, জয় বাংলা শ্লোগান, বঙ্গবন্ধু উপাধির জনক।

ইতিহাস কি বলে?

জয় বাংলা স্লোগান একান্তই বঙ্গবন্ধুর। সেই ১৯৫০ এর পর থেকে অসংখ্য ভাষণে বঙ্গবন্ধু জয় বাংলা স্লোগান দিতেন, জয় বাংলা স্লোগান মূলত বঙ্গবন্ধু নেতাজি সুভাষ বসুর জয় হিন্দ শ্লোগানের অনুকরণে ছিল। নেতাজি যেমন অখন্ড ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন বঙ্গবন্ধু সেরকম বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্ন সেই ৬০ এর দশক থেকেই দেখতেন।

বঙ্গবন্ধু উপাধির জনক ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক রেজাউল হক চৌধুরী মোশতাক। তিনি শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন।ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাময়িকীতে উনি প্রকাশ করেন সর্বপ্রথম।উনি শেখ কামালের বন্ধু ছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা মূলত ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্ত ছিল। ১৯৭০ সালের ৭ জুন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত ছাত্রদের এক সামরিক কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অংশ গ্রহণের কথা ছিল। ছাত্রলীগের
নিউক্লিয়াসের সিদ্ধান্তে জয় বাংলা বাহিনীর একটি পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। এই লক্ষ্যে ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের (তৎকালীন ইকবাল হল) ১১৬ (বর্তমান ১১৭-১১৮) নং কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনিরুল ইসলাম পতাকার পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে বসেন। এ বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা স্বপন কুমার চৌধুরী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) ছাত্রলীগ নেতা নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতা শিবনারায়ন দাশ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সাধারণ সাধারণ সম্পাদক হাসানুল হক ইনু ও ছাত্রনেতা ইউসুফ সালাউদ্দিন আহমেদ।

পতাকার প্রস্তাবনা মূলত কাজী আরেফ দিয়েছিলেন এবং শিবনারায়ণ দাস পতাকার মাঝে মানচিত্র এঁকে দিয়েছিলেন ,এক বিহারী দর্জি পতাকা সেলাই করে দিয়েছিলেন। জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা পরবর্তীতে বাঙলাদেশের পতাকা হিসেবে বঙ্গবন্ধু পছন্দ করেন।

জাতীয় সংগীত পছন্দ বা নির্বাচিত করেছিলেন বঙ্গমাতা। “ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা” ছিল ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের পছন্দ কিন্তু বঙ্গমাতার পছন্দ ছিল আমার সোনার বাংলা তাই বঙ্গবন্ধু “আমার সোনার বাংলা জাতীয়” সংগীত হিসেবে বাছাই করেন ।

অনেকে বলে থাকেন

২রা মার্চ আ স ম আব্দুর রব কর্তৃক স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন, ৩রা মার্চ শাজাহান সিরাজ কর্তৃক স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, ৭ই মার্চ শেখ মুজিব কর্তৃক “এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”- এই ঘোষণা ছাড়াও অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনায় অনেকে সিরাজুল আলম খানকে মূল প্রভাবক হিসেবে সাফাই গাইতে গিয়ে আরেক বিতর্কের সূচনা করেন।

আসলে সত্য কি?

স্বাধীনতার ইশতেহাের রচনা করেছিলেন সিরাজুল আলম খান,আবদুর রাজ্জাক তোফায়েল আহমদ, আ.স.ম আব্দুর রব মিলে।কাজেই এটা ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের সম্মিলিত ইশতেহার ছিল।

বঙ্গবন্ধু ৭ ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ নিয়ে অনেকের সাথে আলোচনা করেছেন আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের নেতাদের সাথে। কিন্তু তিনি কি ভাষণ দিবেন একমাত্র তিনিই জানতেন। সবচেয়ে বেশি আলোচনা করেছেন বঙ্গমাতার আর তাজ উদ্দিনের সাথে ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে। বঙ্গবন্ধু পুরোপুরি এ ভাষণ বাস্তবতা থেকে তত্কালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে দিয়েছিলেন কোন লিখিত স্ক্রিপ্ট ছাড়াই দিয়েছিলেন।
” এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম” এই উক্তির মাধ্যমে বাঙালিকে বঙ্গবন্ধু মুক্তিসংগ্রামের বার্তা দিয়েছিলেন।


অনেকে মিথ্যাচার করে থাকেন সিরাজুল আলম খান শ্রমিক লীগ, ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস, বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা???

এখানে কিছু তথ্য আংশিক সত্য..

কাজী আরেফ,সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক


যেমন পরাধীন বাংলাদেশে শ্রমিকরা যে একটি গুরুত্বপূর্ন রাজনৈতীক শক্তি সেটা সিরাজুল আলম খান বুঝেছিলেন এবং শ্রমিকদের সংগঠিত করেছিলেন তিনি। তার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা আসে এবং তারা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সিরাজুল আলম খান শ্রমিক লীগের প্রতিষ্ঠাতা এটা সত্যই।

ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসের মূল কারিগর মূলত কাজী আরেফ । তবে নিউক্লিয়াসের অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন সিরাজুল আলম খান।
কিন্তু ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াস কাজী আরেফ,সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক,আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে একটি গুপ্ত সংগঠন ছিল ছাত্রলীগের।

এ বিষয়ে কাজী আরেফের ভাষ্য
তাঁর ভাষ্য ছিল এ রকম:

এটা ঠিক যে আমরা নিউক্লিয়াস তৈরি করেছিলাম। চিন্তাটা হয়েছিল ১৯৬২ সালে। ১৯৬৪ সালে তার একটা কাঠামো দাঁড় করানো হয়। সিরাজ ভাই রূপকার, বিষয়টা এমন নয়। আমাদের মধ্যে কাজ ভাগ করা ছিল। সিরাজ ভাই ছিলেন আমাদের থিওরেটিশিয়ান। আমি রিক্রুটিংয়ের কাজ দেখতাম। আরেফ ছাত্রলীগের মধ্যে আমাদের চিন্তার প্রসার ঘটাত। এরপর চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয় আবুল কালাম আজাদ। আমরা আঙুল কেটে রক্ত দিয়ে শপথ নিই, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত আমরা ব্যক্তিগত সুখ-সুবিধার পেছনে ছুটব না। বিয়ে করব না। আমাদের না জানিয়ে আবুল কালাম আজাদ স্কুলপড়ুয়া একটা নাবালিকাকে বিয়ে করলে আমরা তাকে বহিষ্কার করি। মুজিব ভাইকে সামনে রেখেই আমরা এটা শুরু করি। তিনিই আমাদের নেতা। এ ব্যাপারে তাঁকে আমরা কিছুটা জানিয়েছিলাম ১৯৬৬ সালে। ১৯৬৯ সালে তাঁকে ডিটেইল জানানো হয়।”

পরে অবশ্য আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ , অসম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ নিউক্লিয়াসে যুক্ত হন।

বি এল এফ বা মুজিব বাহিনীর প্রধান সংগঠক ছিলেন শেখ ফজলুল হক মণি,এর পাশাপাশি অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ছিলেন সিরাজুল আলম খান , আবদুর রাজ্জাক,তোফায়েল আহমেদ,কাজী আরেফ ও ছাত্রলীগ এর সেসময়কার নেতৃত্ব স্থানীয়রা।

এগুলো ইতিহাসের স্বীকৃত সত্য,এসব নিয়ে মিথ্যাচার করে তারাই যারা জিয়াকে বারবার বঙ্গ বন্ধুর বিপরীতে দাড় করাতে চায়, এরাই আবার তাজউদ্দিনকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে দাড় করাতে চায় ,অথচ সে চেষ্টায় ও তারা বিফল কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গতাজ অভিন্ন সত্ত্বা। বঙ্গবন্ধুকে ছোট করার প্রচেষ্টা হিসেবে তারা সর্বশেষ দাঁড় করিয়ে দিতে চাচ্ছে সিরাজুল আলম খানকে। বিস্ময়কর হলেও সত্যি সিরাজুল আলম খান বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার সর্বাধিনায়ক হিসেবেই মানেন।
এ চেষ্টায় তারাও বিফল হতে যাচ্ছে আবারো। কারণ সত্যের জয় অনিবার্য।

স্বাধীনতা পরবর্তী সিরাজুল আলম যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আফিম খাইয়ে হাজার হাজার তরুণকে পথভ্রান্ত করেছেন। উনার কারণে স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই সন্ত্রাস শুরু হয়। উনার হঠকারিতার কারণে জিয়া ৩,১৮৬ জন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের বিনা বিচারে হত্যা করে ,তিনি তখন জাসদের মাথা হয়েও জিয়ার সাথে আঁতাত করে নিজের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। অথচ তাকে কখনো জিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলতে বা তার জাসদের কর্মীদের হত্যার বিচার চাইতে দেখা যায় না? বলতে গেলে সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অফিমের কারণেই বাংলদেশ বিরোধী শক্তি শক্তিশালী হয় স্বাধীন বাংলাদেশে। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের বর্বর হত্যাকাণ্ড কিংবা চার নভেম্বর এর জেল হত্যার সুযোগ পায় ঘাতকেরা সিরাজুল আলম খানের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণেই।


এটা সত্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল সংগঠক ছিলেন সিরাজুল আলম খান।এটা অস্বীকার কোনভাবেই করা যাবেনা। কিন্তু যারা সিরাজুল আলম খানকে টেনে নিয়ে এসে বিতর্ক সৃষ্টি করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য বোঝা যায় এরা বাংলদেশে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায় বারবার। তথাকথিত নব্য পাকি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নব্য উত্থান বাংলদেশের জন্য অশনিসংকেত।

তথ্যসূত্রঃ
•আওয়ামী লীগঃ উত্থান পর্ব- মহিউদ্দিন আহমেদ
• জাসদের উত্থান-পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি- মহিউদ্দিন আহমেদ

•আমি সিরাজুল আলম খানঃ একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য- শামসুদ্দিন পেয়ারা

• আওয়ামী লীগঃ যুদ্ধ দিনের কথা- মহিউদ্দিন আহমেদ


লেখক – শিক্ষার্থী, বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।