নেতাজীকে স্মরি

নে-তা-জি… সুভাষ চন্দ্র বসু…

অখন্ড ভারতবর্ষের পরাধীনতার শৃঙ্খল যিনি গুঁড়িয়ে  স্বাধীন করতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে। না তিনি পারেননি ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে তৎকালীন মসনদলোভী নেতাদের কারণে।নেতাজির অনবন্দ্য রাজনৈতিক,মানবিক অসাম্প্রদায়িক দর্শন উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে ব্রিটিশদের বোপিত সাম্প্রদায়িকতার বীজ এভাবে উপমহাদেশের পবিত্র মাটিকে বারবার কলুষিত করতে পারতো না। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের শিষ্য থেকে পুরো ভারতীয় উপমহদেশের অবিসংবাদিত নেতা কিংবা প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন সর্বোচ্চ আত্মমর্যাদা বোধ এবং  ব্যাক্তিত্বের পরীক্ষা দিয়ে।

আজাদে হিন্দ ফৌজ গঠন করে  তিনি জার্মান, জাপানের  দাস হননি , বরং তিনি তাদের কাছ থেকে সমমর্যাদা আদায় করে নিয়েছিলেন। নেতাজি যুদ্ধ ক্ষেত্রে কোন পরাশক্তির কাছে হাত পাতেননি।(১৯৪৩-৪৫) পরাশক্তিদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ( সাহায্য না) এবং উপমহাদেশের মানুষের সহয়তায় দীর্ঘ ৩  বছর যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। এমনও হয়েছিল তার গলার মালা ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছিল যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্য কিংবা নেতাজির প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে। ভারতবর্ষের মানুষ নেতাজীকে তখন এতটাই ধারণ করতো।

ভারতবর্ষের মানুষের আত্মমর্যাদা বোধ সিকিভাগ ও তিনি বিকিয়ে দেননি পরাশক্তিদের কাছে সেসময়কার রাজনীতিবিদের মতন।তিনি সফল হলে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

আজাদে হিন্দ ফৌজের যোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই নর্মান্ডি কিংবা পার্ল হারবার(Payback for Pearl Harbor) এর সম্মুখ যোদ্ধা কিংবা কিংবা বিমান সেনাদের চাইতে কোন অংশে কম না বরং যুদ্ধাস্ত্রের সংকট কিংবা পুরাতন অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে নেতাজির নেতৃত্বে আজাদে হিন্দ ফৌজের  লড়াই এবং আত্মত্যাগের ঋণ ভারতবর্ষ কখনো শোধ করতে পারবেনা । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির ভয়াবহ বিপর্যয় না ঘটলে এই উপমহাদেশ এক পরাশক্তি হতো বিশ্বে নেতাজির নেতৃত্বে।

উপমহাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতাদের অতিরিক্ত চাটুকারিতা কিংবা ব্রিটিশদের পদলোহন না করলে ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের চরম অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হত।কিন্তু তাদের অতিরিক্ত তোষামুদে মনোভাবের কারণে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা বিলম্বিত হয় এবং ব্রিটিশরা বুক ফুলিয়ে বিদায় নেয় এবং কয়েক খন্ডে ভাগ করে  দিয়ে যায় উপমহাদেশকে।

নেতাজী বলতেন ” তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিবো” ।  প্রায় ৫০ হাজারের মত দেশপ্রেমিক যোদ্ধা নিয়ে তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। সিঙ্গাপুর থেকে বার্মা হয়ে তিনি ভারতবর্ষের ১ লক্ষ ৫০ হাজার বর্গ মাইল স্বাধীন ও করেছিলেন।কিন্তু  রাজনৈতিক নেতাদের ব্রিটিশদের সাথে অতিরিক্ত সখ্যতার কারণে তিনি সফল হতে পারেননি।  নেতাজি কাগজে কলমে সফল হতে পারেননি ,কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের মানুষের মনে স্বাধীনতার সুপ্ত বাসনা জাগ্রত করে দিয়ে গিয়েছিলেন।

নেতাজি একজন নীতিবান মানুষ ছিলেন। কংগ্রেসের টানা দুবারের নির্বাচিত  সভাপতি ছিলেন। শেষবার যখন সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন গান্ধীজী ও তার বিরোধিতা করেছিলেন।কিন্তু সেই বিরোধিতাকে তিনি পাশ কাটিয়ে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বেশীদিন পদে থাকতে  পারেননি চক্রান্তের কারণে। কংগ্রেসের সভাপতি না থাকাটাই তার জন্য শাপে বর হয়েছিল  পরবর্তীতে তিনি এই উপমহাদেশের মানুষকে মুক্তির সংগ্রামে পথ দেখিয়ে উপমহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা হন(কাগজে কলমে অবশ্য তার কীর্তির কথা বেশি নেই)। একজন কেমব্রিজ স্কলার আবার আইসিএস এ রাঙ্ক করেও যিনি উপমহাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য  জন্য রাজনীতিকে ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন। এইরকম বীর এই ভূমে কজন আছে?

যদি এক কথায় প্রকাশ করতে হয় নেতাজীকে নেতাজী উপহাদেশের প্রথম সর্বাধিনায়ক , অবিসংবাদিত নেতা।

আর সবচে বড় গর্বের কথা উনি একজন বাঙালি,বাঙালি হওয়ার কারণে বারবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন।কিন্তু এরপরেও তিনি দমে যাননি বরং তিনি দোর্দণ্ড প্রতাপে ভারতবর্ষের ব্রিটিশ রাজের সিংহাসন গুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার মাধ্যমে। বাঙালি হিসেবে তিনি বারবার নিজের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছেন।

বঙ্গবন্ধু নেতাজীর অসাম্প্রদায়িক দর্শন নিয়ে বলেছিলেন..

“যে নেতা দেশ ত্যাগ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে পারেন, তিনি কোনোদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। মনে মনে সুভাষ বাবুকে তাই শ্রদ্ধা করতাম।” ~অসমাপ্ত আত্মজীবনী(পৃষ্ঠা নং:৩৬)

নেতাজী অসাম্প্রদায়িকতার অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ভারতবর্ষের হিন্দু ,মুসলিম , শিখ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য ধর্মের  সবাইকে নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ তৈরি করেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক যতটা  ছিলেন  রাজনীতিতে ঠিক ততটুকু  ধর্মনিরপেক্ষ থাকতেন। ভারতবর্ষে সর্বপ্রথম অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির সূচনা ঘটান নেতাজী।

এই সাহস একমাত্র বাঙালিরই আছে ,তাইতো বঙ্গবন্ধু বাংলাদশকে স্বাধীন করে প্রমাণ করেছিলেন বাঙালি বীরের জাতি। নেতাজি কীভাবে সফল সেটা চিন্তা করতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে ।১৯৭২ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কলকাতায় বঙ্গবন্ধু এক ভাষণে বলেন

“নেতাজি অমর! তাঁর প্রমাণ স্বাধীন বাংলাদেশ”

বঙ্গবন্ধুর ভাষায় বারবার বলতে চাই নেতাজি আপনি অমর । বাঙালি জাতির হৃদয়ের মণিকোঠায় কিংবা ভারতবর্ষের মুক্তিকামী জনতার আদর্শ হিসেবে আপনি চিরঞ্জীব ।

নেতাজি আপনি অমর ,আপনি মৃত্যুঞ্জয়ী … প্রতিবছর আপনার জন্মলগ্নে এই ভূমে আরো শত শত সুভাষ জন্ম নিক।