লৌহ মানবীর সংগ্রাম ও ভ্যাক্সিন বৃত্তান্ত

vaccine

বলিউডের একটি বিখ্যাত সিনেমা  রয়েছে  ‘দ্যা স্কাই ইজ পিঙ্ক’ নামে। এ ছবি অদম্যভাবে সাহস নিয়ে হাসিমুখে লড়াইয়ের গল্প বলে৷ কিভাবে হাসিমুখ নিয়ে শান্ত সাহসের সাথে লড়াই সংগ্রামে জীবনের বাজিতে আমাদের ঝুঁকতে হয় এ ছবি তারই এক অনবদ্য প্রতিফলন।এ ছবিটি মূলত বাস্তব জীবনের গল্প থেকেই নির্মিত। তবে নান্দনিকতার দিক থেকে এ ছবিটির আক্ষরিক ভাবানুবাদের বাস্তবিক রূপ এখনও জাজ্বল্যমান। আমাদের দেশের মাটি ও মানুষের দেখভাল করা হর্তাকর্তাদের যিনি কখনও বরফ শীতল পরশে মানুষের পাশে দাঁড়াবার আদেশ দেন আবার সেই তিনিই যেকোন অন্যায় অবিচার দেখলে সেসকল কিছু প্রতিকার, প্রতিরোধ, সুরাহার জন্য অগ্নি দাহ প্রবাহিত করে কঠোর নির্দেশ আরোপ করেন। ‘দ্যা স্কাই ইজ পিঙ্ক’ ছবিটির জাজ্বল্যমান বাস্তবিক ভাবানুবাদ আক্ষরিক অর্থেই ধারণ করেন বঙ্গবন্ধু আত্মজা দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

ভ্যাক্সিন যুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ অগ্রগামী সেখের বেটির নেতৃত্বে

বাংলাদেশ বরাবরই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির নৈরাশ্যবাদী টার্গেটের শিকার হয়েছে৷ যতবারই বাংলাদেশ শির উচু করে দাঁড়াবার প্রয়াস চালিয়েছে ততোবারই বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এদেশের প্রগতির পথে কাঁটা হয়ে প্রবৃদ্ধির পথকে মন্থর করে যাবার পায়তারা করেছে। খুদে খুদে পায়ে বাংলাদেশ গত এক দশকে যতগুলো সূচকে প্রবৃদ্ধির পরিমন্ডল অতিক্রম করেছে ততবারই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির গায়ে কালিমা লাগিয়েই বাংলাদেশ মস্তক উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আত্মজা দেশরত্ন শেখ হাসিনা যে অঙ্গীকার করেছিলেন ভূমিহীন গৃহহীন দের বাসস্থান তিনি নিশ্চিত করবেন সম্প্রতি সে অঙ্গীকারের প্রতিফলন আমরা দেখতে পেয়েছি। করোনা ভাইরাস মহামারীতেও যখন বিশ্ব অর্থনীতি ধুঁকে পড়েছে ঠিক সেসময়েও বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে রেকর্ড গড়েছে। নিন্দুকের চোখে চোখ রেখে প্রমত্তা পদ্মার বুকে সেতু এখন বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের আঁচলে কষাঘাত করছে।

করোনা ভাইরাস মহামারী থেকে বাংলাদেশকে চলমান রেখে কিভাবে এ থেকে দ্রুত নিষ্পত্তি লাভ করা যায় সে বিষয়ে সরকারের বিশেষজ্ঞ দল গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় যখন বিশ্ব বাজারে ভ্যাক্সিনের বাজারজাত শুরু হয় সেসময় দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য কার্যকরী ভ্যাক্সিন পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এই ভ্যাক্সিন নিয়ে যে রঙ্গতামাশার অভিপ্সা দেখাচ্ছে তাতে যে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তিই শুধু ক্ষুন্ন হচ্ছে ব্যাপারটা এমন নয় এতে করে দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরণের অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। যেটার সুযোগ নিয়ে এসকল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাদের সার্বিক স্বার্থান্বেষী কর্মপ্রণালী বাস্তবায়নের অভিপ্রায় চালাচ্ছে।

সম্প্রতি অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনেকার টিকা ‘কোভিশিল্ড’ বাংলাদেশের জনমানুষের জন্য অনুমোদন দেয়া হয় বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের মাধ্যমে। অক্সফোর্ডের এই ভ্যাক্সিনটি উৎপাদন করা হচ্ছে ইংল্যান্ড ও ভারতে। ইতিপূর্বে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল, মিডল ইস্ট ও ভারতে এই ভ্যাক্সিনের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়েছে৷ বর্তমান বিশ্ব বাজারে ফেজ থ্রি ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে তিনটি ভ্যাক্সিন – অক্সফোর্ড অ্যাস্ট্রোজেনেকা, ফাইজার বায়োন্টেক ও মডার্না। এর মধ্যে ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাক্সিন সংরক্ষণ করতে হয় মাইনাস ৭০ ডিগ্রি (-৭০•)সেলসিয়াস এ। যার ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এ ভ্যাক্সিনে অনীহা প্রকাশ করছে। আবার দামের বেলায় আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য ফাইজার ভ্যাক্সিনটির প্রায় ২০ ডলার এবং মডার্না ভ্যাক্সিনটির ৩২ ডলার। অপরপক্ষে অক্সফোর্ডের ভ্যাক্সিনটির প্রতিডোজ বাংলাদেশ কিনছে ৫ ডলার বা ৪২৫ টাকায়। অক্সফোর্ডের টিকা ‘কোভিশিল্ড’ উৎপাদন করছে ব্রিটিশ কোম্পানি অ্যাস্ট্রোজেনেকা ও ভারতীয় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইন্সটিটিউট যৌথভাবে। ইতিমধ্যেই ভারত বাংলাদেশকে ২০ লাখ ডোজ ভ্যাক্সিন উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকার ৩ কোটি ভ্যাক্সিন বিনামূল্যে বিতরণের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।

গুজবেও থেমে যায়নি অগ্রযাত্রা

গত ১৮ ডিসেম্বর দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকার এক রিপোর্টে দেখা যায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা প্রতিডোজ আমেরিকা কিনছে ৪ ডলারে এবং ইউরোপ কিনছে তার চেয়েও একটু কমে।বাংলাদেশকে কেনো এক ডলার বেশি দিয়ে এই টিকা কিনতে হচ্ছে তার কারণ না জেনেই সোশাল মিডিয়ায় শুরু হলো তুমুল সমালোচনা। আর এই সমালোচনার লাইন সেই একই আর তা হলো, বাংলাদেশ সরকার ভারতের কোম্পানিকে অযথা বেশি টাকা দিচ্ছে মানে ভারতকে সব দিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশ! কিন্তু কেনো এক ডলার বেশি দাম পড়েছে বা ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে এই টিকা না এনে যদি অন্য কোন দেশের কোম্পানি থেকে আনা হতো তাহলে যে আরো তিনগুণ বেশি দাম পড়তো সেব্যাপারে আমরা কর্ণপাতই করছি না! ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আমেরিকাতে যেকোন দেশের তুলনায় এই টিকা কম দামে পাওয়া যাবার পেছনে যে একটা বড় কারণ রয়েছে সে বিষয়টাও আমরা জানার দরকার মনে করছি না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার জন্য আলাদা তহবিল গঠন করেছে এবং তারা বিনিয়োগও করেছে। বিভিন্ন দেশের সরকার ও দাতারা টিকা তৈরি এবং তার পরীক্ষার প্রকল্পগুলোতে কোটি কোটি পাউণ্ড পরিমাণ অর্থ ঢেলেছে। ভ্যাক্সিন-উৎপাদক কোম্পানি আমেরিকার মডার্না তাদের টিকার পেছনে ৫৯ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ড অর্থ ব্যয় করেছে, জার্মানির বায়োএনটেক এবং তাদের অংশীদার বৃহৎ আমেরিকান কোম্পানি ফাইজার যৌথভাবে প্রায় ৪০ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ড এবং অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পেছনে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও দাতা প্রায় ১৬৫ কোটি পাউন্ড অর্থ ব্যয় করেছে। এখানে দাতারা ঝুঁকি নিয়েছে এবং ভ্যাক্সিন ব্যর্থ হলে তারা তাদের সম্পূর্ণ বিনিয়োগ কিন্তু হারাতো। তাই ইইউ, রাশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উদ্ভাবিত সফল টিকার সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও দাতা প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দামেই ভ্যাক্সিন পাবে। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার, টিকা উৎপাদনকালীন ট্রায়াল যদি অন্যদেশে হয় তবে টিকা দ্রুত এবং স্বল্পমূল্যে পাবার ক্ষেত্রে সেই দেশও অগ্রাধিকার পায়। যেমন সফল টিকার কোন একটির ট্রায়াল যদি বাংলাদেশে হতো তবে বাংলাদেশও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কম দামেই এই টিকা পেতো।

ভ্যাক্সিন মৈত্রীর আওতায় ভার‍ত সরকার বাংলাদেশসহ বন্ধুপ্রতীম ৬ দেশকে টিকা উপহার দিয়েছে। ভ্যাক্সিন কূটনীতির অংশ হিসেবে ভারত প্রতিবেশী বন্ধু দেশগুলোতে বিনা পয়সায় অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পাঠানোর যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার আওতায় বাংলাদেশ সরকার উপহার হিসেবে ২০ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে।

শেখ হাসিনা করে দেখিয়েছেন

ভ্যাক্সিন প্রয়োগের ব্যাপারে যখন দেশের সংশ্লিষ্ট গবেষকরা সরকারের হস্তক্ষেপ আশা করলেন ঠিক সেসময়ে সরকারের সর্বোচ্চ আধিকারিক জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা সবাইকে আশ্বস্ত করলেন যেন করোনা মোকাবিলায় সম্মুখ যোদ্ধাদের আগে ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় নিয়ে আসা হয়৷ কিন্তু সেসময়েও প্রতিক্রিয়াশীল একটি চক্র বলে উঠলেন কেন সরকার দলীয় লোকেদের আগে ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় আনা হচ্ছে না। এরকম বেফাঁস বুলি আওড়ানোর মাধ্যমে যে হাস্যরসের উদ্রেক ঘটানো হচ্ছে তা সত্যিই কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে খুবই বিব্রতকর। যদি ভিআইপিদের এই ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় আনা হতো তাহলে হয়তো হয়তো নিন্দুকেরা উল্টো পথেই হাটতেন।

সকল সংশয়ের দোটানাকে তুড়ি মেরে কেবল অদম্য সাহসের সাথে সংকল্প নিয়ে এদেশের মানুষের জন্য শাব্দিক অর্থেই বঙ্গবন্ধু তনয়া দেশরত্ন শেখ হাসিনা ঋজুভাবে সম্মুখপানে তাকিয়ে রয়েছেন। বাংলাদেশের সাহসী অভিযাত্রায় সকল কণ্টকাকীর্ণ পথে অম্লমধুর বাস্তবতার সত্ত্বেও দ্বিধাহীনভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যার হার না মানার এ সংগ্রাম জাতির জন্য সাফল্য আর সমৃদ্ধি বয়ে আনুক এটাই এখন প্রত্যাশা।

লেখক : আশিক অমি, শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।