বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি

প্রশাসনিক একটি আদেশের ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারত-প্রত্যাগত উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও দেশের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী অসহায়দের সাহায্যের জন্য সব নাগরিকের সহায়তা কামনা করেন। সারা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি পরিচালনার জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিকের সক্রিয় সহযোগিতা অত্যাবশ্যকীয় বলে বিবেচনা করা হয়। এভাবে সরকারি আদেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ে প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা ও জেলা পর্যায়ে একটি করে কমিটি গঠনের জন্য সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।গ্রামের আয়তন ও লোকসংখ্যার ভিত্তিতে ৫ থেকে ১০ সদস্যের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি গঠন করা হয়। এগুলো জনগণের কাছে পরিচিত হয় ত্রাণ কমিটি হিসেবে। স্থানীয় নেতারা, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় কর্মীদের মধ্য থেকে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা এই ত্রাণ কমিটির সদস্যদের নিয়োগ করেন। একই পদ্ধতিতে এবং প্রায় একই পন্থা অনুসরণ করে ইউনিয়ন, থানা এবং মহকুমা পর্যায়ে অনুরূপ কমিটি গঠন করার জন্য নির্দেশ জারি করা হয়। জেলা পর্যায়ের কমিটিতে ছিলেন ৫ জন জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। এই কমিটির অন্যান্য সদস্য জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য কর্তৃক মনোনয়ন লাভ করতেন। মহকুমা ত্রাণ কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন এই জেলা কমিটির একজন সদস্য। সরকারি লোকজনের মধ্য হতে পাঁচজন নন-অফিশিয়াল সদস্যকেও এই কমিটির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা জেলা কমিটির চেয়ারম্যানও নিয়োগ করতেন। পুনর্বাসনের শুরুতে গৃহীত কার্যক্রম: প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯৭২ সালের জুন পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য ১০৭ কোটি টাকার একটি স্বল্পমেয়াদি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় এবং এতে দুই কোটি স্থানচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন ও অন্নসংস্থানের বিষয়টিকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে এই কর্মসূচির ছিল নিমোক্ত লক্ষ্যসমূহ অর্জন : – ভারতের শরণার্থী শিবির থেকে লোকজনদের প্রত্যাগমনের পথ সুগম করা- গৃহহীন জনসাধারণের জন্য অস্থায়ী গৃহসংস্থান- শরণার্থী ও সর্বহারা মানুষদের নগদ অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সাময়িকভাবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ দেওয়া- চাষি ও সহায়-সম্বলহারা কামার-কুমার-তাতি, মিস্ত্রি ও কারিগরদের অর্থনৈতিক জীবনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা- শিক্ষা ও শিক্ষকতা পুনঃআরম্ভ করতে অসমর্থ ছাত্র-শিক্ষকদের অর্থনৈতিক সাহায্য দান- মহকুমা সদর দফতরে এতিম ও অভিভাবকহীন নারীদের পুনর্বাসনের জন্য এতিমখানা ও আশ্রয় শিবির স্থাপন- চলাফেরায় অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য ঢাকায় একটি পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা – শিল্প উৎপাদন পূর্বতন স্বাভাবিক হারের শতকরা অন্তত ৫০ ভাগে উন্নয়ন- ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় বিদ্যুৎ শক্তির মাসিক কমপক্ষে শতকরা ৬০ ভাগ উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিতকরণ- পণ্যসামগ্রীর স্বাভাবিক চলাচল অক্ষুন্ন রাখার জন্য পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনরুদ্ধার- খাদ্যোৎপাদন সর্বোচ্চ পরিমাণে নিশ্চিত করার জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থাগ্রহণ এবং – মহামারি রোধ করার জন্য শহরাঞ্চলে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংস্থানবোধগম্য কারণেই শুরুতে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের সংস্থান এবং খাদ্য সরবরাহের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। এই উদ্দেশ্যে অন্যান্য ব্যবস্থার পাশাপাশি মুখ্যত যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয় তার মধ্যে টেস্ট রিলিফ, পূর্ত কর্মসূচি ও গৃহনির্মাণ প্রকল্প অন্যতম। টেস্ট রিলিফের ১৭ কোটি টাকায় ২ কোটি ৩০ লাখ লোক এবং ২৫.৭৫ লাখ একর জমিতে কৃষি উৎপাদন উপকৃত হয়। এছাড়া সাহায্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের ৭১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিবিধ সমস্যা প্রভৃত পরিমাণে সমাধান করতে সক্ষম হয়।

এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত দেশবাসীর জন্য ১ কোটি ৪১ লাখ ৮১ হাজার ৮৮৫ মণ খাদ্যশস্য ছাড়াও বিপুল পরিমাণ গুঁড়া দুধ, শিশুখাদ্য, তাঁবু, ত্রিপল ও শাড়ি বিনা মূল্যে বিতরণ করে।একইভাবে জাতীয় পুনর্বাসন বোর্ড পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের হাতে নির্যাতিত হাজার হাজার নারীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করে। এজন্য চারটি বৃত্তিমূলক ট্রেনিং কেন্দ্র এবং সাতটি সেলাই ও হস্তশিল্প শিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হয়। এছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েদের রিলিফ প্রদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কেন্দ্রীয় মহিলা সংস্থার মতো স্বেচ্ছাসেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহকে মাসিক মঞ্জুরি বরাদ্দ করে। সহায়-সম্বলহারা নারী ও শিশুদের পরিচর্যা এবং নিরাপত্তার জন্য মহকুমা পর্যায়ে ৬২টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

সূত্র: বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ (পৃষ্ঠা- ৪৯, ৫০)