বাকশাল: সমাজব্যবস্থা বদলে দেওয়ার ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের অপপ্রচার


‘বাকশাল’ বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের মানুষের ঐতিহাসিক চাহিদা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ১৯৭৫ সালে এই ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্রীকরণ। দেশকে পুনর্গঠনের জন্য ৬১ জেলায় ভাগ করা হয়েছিল। প্রত্যেকটি জেলার প্রধান একজন করে গভর্নর। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুলাই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬১ জন গভর্নরের মধ্যে ৩৩ জন ছিলেন সংসদ সদস্য, ১৩ জন ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং বাকি ১৪ জন বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।



এছাড়াও উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে করা হয়েছিল প্রশাসনিক কাউন্সিল। স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি, রাজনৈতিক নেতানেত্রী, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় তরুণ-যুবকদের সদস্য করে এসব জেলা ও উপজেলা কাউন্সিল গঠনের বিধান করা হয়। এমনকি বিচারব্যবস্থার সংষ্কার করে উপজেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সুবিচার নিশ্চিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

এই বিপ্লবের অন্যতম আরেকটি দিক ছিলো অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামভিত্তিক সমবায় উৎপাদনব্যবস্থা চালু করা। যার মাধ্যমে দেশের ৬৫ হাজার গ্রামের প্রতিটিতে বহুমুখী সমবায় গঠন এবং জমির মালিকানা হস্তান্তর না করে যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে জমির মালিকেরা ছাড়াও গ্রামের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষ সমবায়ের সদস্য হয়ে উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন। সরকারি বরাদ্দের অর্থ, সার, টেস্ট রিলিফ ও ওয়ার্কস প্রোগ্রাম সরাসরি সমবায়ের কাছে পৌঁছানো, যাতে সেগুলো প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বিলোপ করা যায়। উৎপাদিত ফসল জমির মালিক, সমবায় এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামোকে শক্তিশালী করা।



১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত গভর্নরদের জন্য প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন। তিন সপ্তাহ পর, ১৬ আগস্ট, নিজ নিজ জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল তাদের। মূলত সেদিন থেকেই এই দ্বিতীয় বিপ্লবের বাস্তবায়ন শুরু হতো। কিন্তু ১৫ আগস্ট দেশবিরোধী চক্র কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিতভাবে সপরিবারে হত্যার পর দেশ ও মানুষের ভাগ্য বদলের এই বিপ্লব বিনষ্ট হয়ে যায়। সংবিধানকে পদদলিত করে দেশকে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে ফেলে সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধীরা। পরবর্তীতে এই চক্রই মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে রেখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার লোভে ‘সমাজব্যবস্থা বদলের ব্যবস্থাপনা’ তথা ‘বাকশাল’ নিয়ে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।

বাকশাল গঠনের মাধ্যমে, বঙ্গবন্ধু- দেশ ও মানুষের দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য, সংবিধানের চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হলে গণতন্ত্রকে অবদমন করা রাখা সম্ভব হতো না, অর্জিত হতো সামাজিক ন্যায় ও সাম্য, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিটি নাগরিক তীব্র জাতীয়তাবোধে উন্মুখ হয়ে কাজ করতো দেশের জন্য; যার দ্বারা উন্নত জীবনের সুবিধা পেতো প্রতিটি পরিবার। কিন্তু এই বিপ্লব সফল হলে পাকিস্তানিদের জান্তাদের ভূত হয়ে চেপে বসা স্বৈরাচারেরা সুবিধা করতে পারতো না, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হয়ে যেতো কট্টর উগ্রবাদীদের, বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে বিশ্বের বুকে চলতে দেখলে পরাজিত রাজাকারদের ঘুম হতো না। তাই সবাই চক্র একসঙ্গে হাত মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে দমনপীড়ন চালাতে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর। এরপর একচেটিয়াভাবে বছর পর বছর ধরে দেশজুড়ে অপপ্রচার চালায় বাকশাল নিয়ে। এই অশুভ শক্তির প্রোপাগাণ্ডার কারণে বাকশালে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্যই আর জানতে পারেনি মানুষ। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই বাকশালের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই জানে না।