বঙ্গবন্ধু হত্যা পরবর্তী জিয়ার ভূমিকা, কয়েকটি প্রশ্ন এবং মরণোত্তর বিচার

কোনপ্রকার রাজনৈতিক দোষারোপ বা দায়ারোপ না কিছু প্রশ্ন এসে যায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়ার ভূমিকা নিয়ে।ধরে নিলাম জিয়ার কোন ভূমিকা নেই বঙ্গবন্ধু হত্যায় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যায় কোনভাবেই জড়িত ছিল না জিয়া।কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে জিয়ার ভুমিকা অবলোকন করলে অনেক জট সহজে খুলে যায়। আসুন দেখে নেই জিয়ার পঁচাত্তর পরবর্তী ভুমিকা…

দৃশ্যপট এক

বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় জিয়া উপ-সেনাপ্রধান ছিল, ধরলাম জিয়া একেবারে বঙ্গবন্ধু পন্থী ব্যাক্তি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বঙ্গবন্ধুর উপ- সেনাপ্রধান জিয়ার কি করা উচিৎ ছিল? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সাথে সাথে গ্রেপ্তার করে বিচারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু জিয়া তা না করে কি করে শুনুন শাফায়েত জামিলের ভাষ্যে..

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়ার বাড়িতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যান শাফায়েত জামিল। শাফায়েত জিয়াকে বললেন, ‘অ্যাপারেন্টলি দুই ব্যাটালিয়ন স্টেজড্ এ ক্যু। বাইরে কী হয়েছে এখনো আমরা কিছু জানি না। রেডিওতে অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতেছি প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন।’ উত্তরে জিয়া বলে,

“IF THE PRESIDENT IS NO LONGER THERE, THEN THE VICE PRESIDENT IS THERE. GO TO YOUR HEADQUARTERS AND WAIT THERE”।

তার মানে জিয়া জানত বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে আদ্যোপান্ত, অন্যরকম স্বাভাবিক আচরণ করে জিয়া বুঝিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল খবর তার নখদর্পণে ছিল।

দৃশ্যপট দুই

সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ৯ দিন পর জিয়া বাংলাদেশের সেনাপ্রধানের পদ দখল করে নেয়।আবারও ধরলাম জিয়া অন্তপ্রাণ বঙ্গবন্ধুর লোক। বঙ্গবন্ধুর খুনীরা তখন গণভবনে ছড়ি ঘোরাচ্ছিল, সেনা প্রধান হিসেবে জিয়ার তো তখন উচিৎ ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার মাস্টারমাইন্ড রশিদ ফারুককে বিচারের আওতায় আনা! কই জিয়া তো তা করেনি!!! উল্টো তাদের আশকারা দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছিল। ছোট্ট একটা তথ্য অবশ্য সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেঃ ১৫ আগস্টের মাস্টারমাইন্ড রশিদ-ফারুক পাকিস্তানের মিলিটারি একাডেমিতে জিয়ার সরাসরি ছাত্র ছিল।

দৃশ্যপট তিন

পঁচাত্তরের নভেম্বরের শুরুতে খুবই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল দেশে,সেসময় দেশ চা্লাত জিয়া।সেসময় ইচ্ছে করলেই জিয়া খুনীদের বিচার করতে পারতো ,কিন্তু তখনো করেনি এমনকি বিচারের আওয়াজ তুলেনি একটিবারের জন্য! এরপর পাল্টা বিদ্রোহ শুরু হলে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের প্রাইভেট বিমানে করে বিদেশে পালিয়ে যেতে সর্বোচ্চ সাহায্য করা হয়,হ্যাঁ সেসময় ও সেনা প্রধান ছিল স্বঘোষিত জেনারেল জিয়া। জিয়া কখনো খুনীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আশ্বাস ও দেয়নি অবশ্য।

দৃশ্যপট চার

নভেম্বরে প্রাণে বেঁচে গিয়ে জিয়া ক্ষমতায় আরো পোক্ত হয়ে বসে। ধরলাম বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক মহান সেনা নায়ক ক্ষমতায় খুব শক্ত করে বসেছে। জিয়া ক্ষমতা পোক্ত করেই কি করলো!! টেলিভিশন, বেতার,পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর সকল ভাষণ, বক্তৃতা ,ছবি ভিডিও প্রকাশ বন্ধ করে দিল। বঙ্গবন্ধুর ছবি,ভিডিও সিনেমা থেকেও কেটে দেওয়া হলো জিয়ার নির্দেশে। বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে দিতে যা যা করার সবটুকুই করলো জিয়া!

দৃশ্যপট পাঁচ

ধরলাম জিয়া বঙ্গবন্ধুর প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুই মেয়ের প্রতি খুবই স্নেহপরায়ন ছিল। তাই তো জিয়া বিদেশে বঙ্গবন্ধুর কন্যাদের পেছনে গুপ্ত ঘাতক লেলিয়ে দিয়েছিল তাদের দেখাশুনা করার জন্য। ঘাতকেরা দেখাশুনা করতে পারেনি বলেই এখনো টিকে আছেন বঙ্গবন্ধুর তনয়ারা। জিয়া কি কখনো বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যাবস্থা করেছিল?

দৃশ্যপট ছয়

ধরলাম জিয়া অনেক বড় আওয়ামী লীগার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগের হাল ধরতে চেয়েছিল।ধরলাম বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া দলকে ভেঙে নিজস্ব অর্থায়নে মিজান আওয়ামী লীগ গঠন করে আওয়ামী লীগকে খন্ড বিখন্ড করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে জিয়া। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রকাশ্যে জিয়ার পক্ষ নেওয়া ওসমানীকে আওয়ামী লীগের মুখোশ পরিয়ে হ্যাঁ না ভোটের নির্বাচনে দাড় করিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বানানো কিংবা আওয়ামী লীগ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মোছার জন্য ব্যাক্তির নাম দলের গঠনতন্ত্র থেকে বাদ দেওয়ার রীতি চালু করেছিল জিয়া।একমাত্র বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দেওয়ার জন্য এই কাজ করেছিল জিয়া।

দৃশ্যপট সাত

ধরলাম জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের জন্য অনেক চেষ্টা করেছিল ,কিন্তু তার চেষ্টার স্বরূপ কি ছিল দেখে নেই –
বঙ্গবন্ধুর খুনের যেন বিচার না হয় সেজন্য জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত করে ১৯৭৯ সালে। এই অধ্যাদেশের ফলে জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার প্রক্রিয়া রুদ্ধ করে দেয়।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে নিয়োগ দিয়ে পুরস্কৃত করে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা রশিদ ফারুককে লিবিয়ায় দূতাবাসে চাকুরী এবং ব্যাবসা করার সুযোগ দেয় জিয়া সেখানে তার পৃষঠপোষকতায় এবং এরা পরবর্তীতে এরাই ফ্রীডম পার্টি গঠন করে। এই দলটি বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে কয়েকবার হত্যা করতে চেষ্টা করে।

জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যায় ধরলাম একেবারেই জড়িত ছিল না।কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর জিয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর নিয়োগকৃত উপ-সেনাপ্রধান,এরপর জোর করে হয় সেনাপ্রধান এবং অবৈধ স্বৈরাচারী সামরিক শাসক। এই তিন ভূমিকায় থাকাকালীন জিয়া তার দায়িত্ব কতটুকু সঠিকভাবে পালন করেছিল? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শাস্তির কি ব্যবস্থা করেছিল জিয়া?
জিয়া তিন ভূমিকায় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সর্বোচ্চ সাহায্য এবং পৃষ্ঠপোষকতা করেছে । জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পুরস্কৃত করেছে, বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে ফেলতে চেয়েছিল বাংলাদেশ থেকে এমনকি বঙ্গবন্ধুর নিজ হাতে গড়া আওয়ামী লীগ থেকেও!

কয়েকটি নিরপেক্ষ প্রশ্ন!এইসকল ঐতিহাসিক দায়িত্বহীনতার জন্য জিয়ার জন্য জিয়ার কি বিচার হওয়া উচিৎ নয়? বঙ্গবন্ধুর খুনিদের লালন পালন করে পুরস্কৃত করার জন্য জিয়ার কি বিচার হওয়া উচিৎ নয়? বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করার জন্য জিয়ার কি বিচার হওয়া উচিৎ নয়???

আমরা অনেকে বলি বঙ্গবন্ধুর সাথে তার নিজের লোক বেইমানি করেছে,জিয়াকে তো বঙ্গবন্ধু নিজের লোক ভেবেই উপ-সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিয়েছিলেন !! জিয়া বঙ্গবন্ধুর লোক হয়ে বঙ্গবন্ধুর বানানো উপ-সেনাপ্রধান হয়ে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্বের অবহেলা কিংবা বঙ্গবন্ধু হত্যায় ভূমিকা রেখে কি বঙ্গবন্ধুর সাথে বিশ্বাসঘাতক তা করেনি? জিয়ার এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য কি মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিৎ নয়?

ভাবুন আরও গভীরে ভাবুন। নিজের বিবেককে প্রশ্ন করুন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য না শুধু ৭৫ পরবর্তী ভুমিকার জন্য কয়েকবার জিয়াকে বিচারের আওতায় আনা কি উচিৎ?জিয়ার অপকর্মের তুলনায় খেতাব বাতিল খুবই তুচ্ছ ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর সাথে বিস্বাসঘাতকতা করার জন্য জিয়ার বিচার কি হওয়া উচিৎ না?

জিয়া বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছে কিংবা বঙ্গবন্ধুর খুনীদের যেভাবে রক্ষা করেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন।জিয়া যদি বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত না থাকতো তাহলে জিয়া ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে খুনীদের ফাঁসির আদেশ দিতো ঘাতকদের পূনর্বাসন না করে।

লেখকঃ রেদওয়ান ইবনে সাইফুল , শিক্ষার্থী ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়