স্বাধীনতার ঘোষণা এবং বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে অনেক ধরণের কথাবার্তা শোনা যায়। সে কথাগুলোর ভিত্তিই বা কি? কোন বিশেষণ কিংবা আলোচনায় না গিয়ে তথ্য উপাত্ত দিয়ে জানতে চেষ্টা করি বঙ্গবন্ধু কি সত্যিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে!

আসুন একটু ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি।

অপারেশান সার্চলাইট এর ঘনঘটাঃ

২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পূর্ব পাকিস্তান বেতারে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়নি। এদিন সকাল ৯টা ২০ মিনিটে পল্টন ময়দানে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি গেয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে,যেখানে বঙ্গবন্ধু প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। একই দিন বঙ্গবন্ধু তার বাসভবনে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করে বুঝিয়ে দেন, বাঙালির মুক্তি আসন্ন।

২৩ ও ২৪ মার্চে ইয়াহিয়ার উপদেষ্টাদের সাথে আওয়ামী লিগের নেতাদের চিঠি চালাচালি ও বৈঠক হয়। কিন্তু পাকিস্তানীরা কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিল না। তাই কোনো দফারফা ছাড়াই আলোচনা আবার ভেস্তে যায়। আসলে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে নীরবে গণহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। গণহত্যার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মার্চের ২৪ তারিখে ইয়াহিয়া টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলীকে নির্দেশ প্রদান করেন অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার জন্য। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া গোপনে পাকিস্তান চলে যান অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার আগে।

২৫ শে মার্চের বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার সময়কার পরিস্থিত নিয়ে ড. কামাল হোসেন বিবিসিকে বলেন তারা সেসময় নিরাপদ জায়গায় গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ পেয়েছিলেন।গ্রেফতারের কয়েক ঘন্টা আগে রাত ন’টার দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে শেষ দেখা করে বিদায় নিয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ, ড. কামাল হোসেন এবং আমীর-উল ইসলাম। তাদের বিদায় দেবার সময় শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন তিনি থেকে যাচ্ছেন অন্য এক হিসাব থেকে, বলেন ড. কামাল হোসেন।

“বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, দেখ, আমার সারা জীবনে আমি ঘন ঘন অ্যারেস্ট হয়েছি। আমি জানি আমাকে ধরলে হয়ত তাদের আক্রমণের তীব্রতা অন্তত কিছুটা কমবে। আর আমাকে যদি না পায়, তাহলে প্রতিশোধ নেবে তারা এলোপাথাড়ি আরও লোক মেরে।”



২৫শে মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা

২৩ তারিখ থেকেই বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মণি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদসহ অনেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি সিরাজুল আলম খানকে ২৪ মার্চ একান্তে কাছে ডেকে নিয়ে বলেন,


“ইয়াহিয়া আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে, ওরা আগামীকাল রাতেই আক্রমণ করবে, প্রথম পর্যায়ের প্রতিরোধ যেন শক্তিশালী হয়। কাউকে বলিস না, আমি বাসাতেই থাকব। আমাকে না পেলে ওরা উন্মাদের মতো আচরণ করবে, আর সে সুযোগে আমাকে মেরে ফেলবে।”



বঙ্গবন্ধু গণহত্যার প্রস্তুতি আঁচ করে ২৪ মার্চ থেকেই আওয়ামীলীগ ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সকল নেতাকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন।

২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণার ২-৩টি খসড়া তৈরি করেন এবং সিরাজুল আলম খান ও তাজউদ্দিনের সাথে আলোচনা করে স্বাধীনতার ঘোষণা চূড়ান্ত করেন। ২৪ মার্চ রাও ফরমান আলী লে. কর্নেল এ জেড খানকে ২৫ তারিখে বঙ্গবন্ধুকে জীবিত গ্রেপ্তার করতে নির্দেশ দেন। ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির আশপাশে রেকি করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। এরপর তাঁর বাড়িতে প্রচণ্ড গুলিবর্ষণ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি বুঝে পুলিশের সাহায্যে ওয়ারলেস ব্যবহার করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে। ঘোষণাটি ছিল,

“The enemy has struck us. Hit them back. Victory is ours. Insha Allah. Joy Bangla” Mujibur Rahman


(“শত্রুরা আমাদের আঘাত করেছে। আপনারা পাল্টা আঘাত করুন। ইনশাল্লাহ বিজয় আমাদের হবেই। জয় বাংলা।” মুজিবুর রহমান)

২৬,২৭ মার্চের বিদেশী পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা

  • মুজিবনগর সরকারের ঘোষণা পত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • বিদেশী বিভিন্ন পত্রিকায় স্বাধীনতার ঘোষণা
  • ২৬ শে মার্চ এর প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠানো বঙ্গবন্ধুর তারবার্তা
  • Satarday morning পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর দ্বাধিনতার ঘোষণা
  • বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার লিখিতরুপ
  • THE Times পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা



সিরাজুল আলম খানের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ২৬ মার্চ ভোর ৫টা পর্যন্ত লালবাগ থানার ওসির রুমে ছিলেন এবং সেখান থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা শোনেন। এরপর থেকে শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ।

২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে আরেকটি স্পষ্ট তথ্য জানা যায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে, তার ভাষ্য অনুযায়ী,

“১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ গুলির আঘাতে ঝাঁঝরা হয়েছিল আমাদের বাড়ি। রাত ১২-৩০ মিনিটে আব্বা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার নির্দেশ দেন। আর সেই খবর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পৌঁছে দেওয়া হলো পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। এ খবর পাকিস্তানী সেনাদের হাতে পৌঁছাল। তারা আক্রমণ করল বাড়িটিকে। ১টা ৩০ মিনিটে তারা আব্বাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেল। আজো মনে পড়ে সেই স্মৃতি। লাইব্রেরি ঘরের দক্ষিণে যে দরজা, তার পাশে যে টেলিফোন সেটটি ছিল, ঐ জায়গায় দাঁড়িয়েই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়েছেন। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বার নির্দেশ দিয়েছিলেন।”



১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর, গণপরিষদে সংবিধান বিল গৃহীত হওয়ার পর এক ভাষণে শেখ মুজিব ২৫শে মার্চ রাতের কথা স্মরণ করে বলেন,



“যখন আমি বুঝতে পারলাম, আমার আর সময় নেই এবং আমার সোনার দেশকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, তখন আমার মনে হলো, এই বুঝি আমার সময় শেষ। তখন আমি বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম, কেমন করে বাংলার মানুষকে এ খবর পৌঁছিয়ে দিব এবং আমি তা দিয়েছিলাম তাদের কাছে।”

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহম্মদ এর ভাষ্য

“ওই অনুষ্ঠানেই স্বাধীনতার সেই ঘোষণা প্রথম সম্প্রচার করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন রাজনীতিকদের মধ্যে চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান।

“সকালবেলা ২৬শে মার্চ আমরা শুনতে পেয়েছি একটা মাইকিং যে গত রাতে ঢাকায় আকস্মিকভাবে পাকিস্তান আর্মি নিরস্ত্র জনপদে আক্রমণ করেছে। এবং খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলছে। এই অবস্থায় আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এইটুক মাইকিং আমরা শুনেছি।

“ওই সময় দুপুরবেলা একটা লিফলেট পেলাম হাতে। আওয়ামী লীগের ইউনিয়ন পর্যায়ের ড. আনোয়ার আলি একটা কাগজ আমার হাতে দিলেন। উনি নিজে বললেন একটা তারবার্তা এসেছে ঢাকা থেকে। আমরা এটার অনুবাদ করে এখন লিফলেট আকারে ছেড়েছি আর মাইকিংও করেছি আমরা।”



এম আর আখতার মুকুল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচারিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের চরমপত্রের পরিচালক, লেখক ও কথক ছিলেন। তার ভাষ্যমতে,

“২৫ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি টেলিফোনে সেন্ট্রাল টেলিগ্রাফ অফিসে জানান। সেখান থেকে এটি চট্টগ্রামের এম এ হান্নান এর কাছে পৌঁছায়, যা তিনি বেতারে পাঠ করেন”

চট্টগ্রাম শহরে যখন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে পর্যদুস্ত করে রেখেছিলো লে.কর্নেল রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে। তখন মেজর রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতাদের তথা এম. এ হান্নান, জহুর আহম্মেদ চৌধুরী,এম আর সিদ্দিককে বলেন চট্টগ্রামে বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে সেটা প্রচার করতে এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে সেটা ঘোষণা করতে।বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ইপিআরের ওয়্যারলেসে চট্টগ্রামে পৌঁছে। সেই বার্তা পাঠানো হয় দামপাড়াস্থ আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসায়।

কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র।ছবি : ইন্টারনেট

চট্টগ্রামে বাঙালি সেনাদের মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ.হান্নান ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ দুপুর ২ টা ১০ মিনিটে এবং ২ টা ৩০ মিনিটে কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। তিনি ‘ জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন ‘।এম.এ হান্নান তার ঘোষণায় বাঙালিকে আহবান জানান “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে” এবং বিশ্ব বাসীকে পাকিস্তানীদের বর্বর হত্যাকাণ্ড সমন্ধে অবহিত করা অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ক্ষমতা ছিল ১০ কিলোওয়াট যার ব্যাসার্ধ ছিল ৬০ মাইল পর্যন্ত। ফলে বেশিদূরের মানুষ এম এ হান্নানের ঘোষণা শুনতে পায়নি।তবে চট্টগ্রাম বন্দরে মাল খালাসের দায়িত্বে থাকা জাপানি জাহাজ আব্দুল মান্নানের ভাষণটি শুনতে পায় এবং রেকর্ড করে। এম.এ হান্নান ঘোষণাটি চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতারা বঙ্গবন্ধুর পাঠানো নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি করে দেন এবং চূড়ান্ত ভাবে সংশোধন করেন ডা.জাফর।

চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ অফিসের প্রয়াত বেয়ারা নূরুল হক। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতর ঘোষণার বার্তা পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি রিকশায় করে পুরো চট্টগ্রাম শহরে মাইকিং করেছিলেন এই নূরুল হক। সে সময় চট্টগ্রাম শহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছিল। যেকোনো মুহূর্তে তার বুকে গুলি হতে পারে সেটা জেনেও সেদিনকার তরুণ নূরুল মানুষকে ঘোষণাটি শুনিয়েছিলেন পথে প্রান্তরে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পরে সর্বপ্রথম বাক্তি হিসেবে চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতা এম এ হান্নান ২৬ শে মার্চ দুপুর ২টা ১০ ও ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র এবং সন্ধ্যায় কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরিত স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। এ বার্তা ছিল গ্রেফতার হওয়ার আগে বাংলাদেশের জনগণের কাছে শেষ বার্তা বা স্বাধীনতার ঘোষণা। এরপর শুরু হয় বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর আদেশে বাংলার জনসাধারণ যার যা কিছু ছিল, তা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের অস্তিত্ব ও মাতৃভূমির সম্মান রক্ষার্থে।

২৬ শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার কথা ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর সরকা্রের বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের শুরুতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে

অপারেশান সার্চলাইট এর হোতা রাও ফরমান আলি তার “বাংলাদেশের জন্ম” বইতে উল্লেখ করেছেন তিনি ২৫ শে মার্চ রাতে শেখ মুজিবের স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেই তাকে টিক্কা খান গণহত্যা চালানোর নির্দেশ দেন। পাক হানাদার বাহিনীর প্রেস সহকারি সিদ্দিক সালিক তার বই “A WITNESS TO SURRENDER” বইতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা উল্লেখ করেছেন অপারেশান সার্চলাইটের প্রাক্কালে।

কীভাবে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন শুনুন প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়ঃ

শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নুরুল হক সম্পর্কে আমাদের অনেকেই কিছু জানেন না। হয়তো এ কারণেই জানেন না যে তার সম্পর্কে বিস্তারিত প্রকাশ পেলে অনেক হাড়ি ভেঙে যাবে হাটে, যার অন্যতম হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। অত্যন্ত মেধাবী নুরুল হক ১৯৭১ সালে ছিলেন টিএন্ডটি বোর্ডের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তিনি একটি রেডিও ট্রান্সমিটার যোগাড় করেছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে বলদা গার্ডেন (এটা কোড নেম, আসলে ট্রান্সমিটারটি টিঅ্যান্ডটিতেই বসানো হয়েছিলো) থেকে বঙ্গবন্ধুর রেকর্ড করা ভাষণটি প্রচার করেন তিনি। ২৭ মার্চ তার বাড়িতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হানা দেয়। গোপন সূত্রে তারা খবর জেনেছিলো। নুরুল হকের বাড়ির দেয়াল ভেঙে বের করা হয় সেই ট্রান্সমিটার এবং আনুষঙ্গিক কিছু জিনিসপত্র যা তাদের চোখে চরম রাষ্ট্রদোহিতা। এরপর তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। আর হদিস মেলেনি। না লাশ, না কংকাল।… ©Omi Rahman Pial



বিদেশী গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬ মার্চ এবং ২৭ মার্চের সংখায় প্রকাশিত হয়। আসুন দেখে নেই সেসময়কার পেপারকাটগুলো।

  • ফ্রান্সের পত্রিকায় প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • আইরিশ টাইমসে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতার ঘশ্না,২৭ মার্চ,১৯৭১
  • ভারতীয় পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ২৬/৩/১৯৭১
  • রাশিয়ার পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ,২৭/৩/১৯৭১
  • ব্রিটিশ পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • রাশিয়ার পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ,২৭/৩/১৯৭১
  • ব্রাজিলের পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ,২৭/৩/১৯৭১



বিবিসির খবরে তখন বলা হয়, “…কলকাতা থেকে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের খবরে প্রকাশ যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।…”

১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ‘দি টাইমস’ ও ‘দি গার্ডিয়ান’ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলাম শিরোনাম দিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার সংবাদ এবং এ সম্পর্কে সম্পাদকীয় মন্তব্য প্রকাশিত হয়। সংবাদে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাত্রিবেলা শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর ‘গৃহযুদ্ধ’ শুরু হয়।’

ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়: “…ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের নিকট সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।…”

দিল্লির দ্য স্টেটসম্যান-এর খবর ছিল: “বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।”

দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন: ২৭শে মার্চের পত্রিকায় ‘সিভিল ওয়ার ফ্লেয়ারস ইন ইস্ট পাকিস্তান: শেখ এ ট্রেইটর, সেইস প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা ও ইয়াহিয়া খান তার বেতার ভাষণে শেখ মুজিবকে বিশ্বাসঘাতক বলার কথা উল্লেখ করা হয়।

ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় ২৭শে মার্চের এক খবরে বলা হয়, “…২৬শে মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশ্যে রেডিওতে ভাষণ দেয়ার পরপরই দ্য ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর এই ঘোষণা অপর এক ব্যক্তি পাঠ করেন।”



এর বাইরে ভারতের বহু সংবাদপত্র এবং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, ক্যানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশের খবরে স্থান পায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ারস হেরাল্ডের ২৭শে মার্চের সংখ্যার একটি খবরের শিরোনাম ছিলো, “বেঙ্গলি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডিক্লেয়ার্ড বাই মুজিব।”

নিউইয়র্ক টাইমস-এও শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়ার ছবি ছাপানো হয়। পাশেই লেখা হয় “স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শেখ মুজিব আটক”।

বার্তা সংস্থা এপির খবর ছিল: “ইয়াহিয়া খান পুনরায় মার্শাল ল দেয়ার ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।”

আয়ারল্যান্ডের দ্য আইরিশ টাইমস-এর শিরোনাম ছিল – পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা আর সাথে ছিল শেখ মুজিবের ছবি।

ব্যাংকক পোস্ট-এর খবরে বলা হয়, “শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ নাম দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।”

  • বিদেশী পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • আর্জেন্টাইন পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • বিদেশী পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • বিদেশী পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা
  • স্বাধীনতার ঘোষণার নথি
  • The age পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা

৭ ই মার্চের ঘোষণার পর কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আর আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না ,কিন্তু বঙ্গবন্ধু ২৬ শে মার্চে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালিকে জন্মযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন টেলিফোনে,তারবার্বতাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে।

তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ শেষে প্রকৃত সত্য নিরিখের দায়ভার পাঠকের উপর দিয়ে দিলাম।

সুত্রঃ

১. শেখ মুজিব আমার পিতা, লেখক- শেখ হাসিনা; ৬৯-৭০ পৃষ্ঠা

২. আমি সিরাজুল আলম খান, লেখক- শামসুদ্দিন পেয়ারা; ১৪৬-১৫২ পৃষ্ঠা

৩. আওয়ামীলীগ: যুদ্ধ দিনের কথা ১৯৭১; লেখক- মহিউদ্দিন আহমদ

৪. অপারেশন সার্চলাইট; ৪০-৭২ পৃষ্ঠা

৫. স্বাধীনতার ঘোষণা; ৭৩-৯০ পৃষ্ঠা

৬. আমি বিজয় দেখেছি; লেখক- এম আখতার মুকুল

৭.“বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা: ফ্যাক্টস অ্যান্ড উইটনেস (আ.ফ.ম সাঈদ)

৮. লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে – মেজর রফিকুল ইসলাম

৯.”A WITNESS TO SURRENDER”-সিদ্দিক সালিক

১০.”বাংলাদেশের জন্ম”-রাও ফরমান আলি

১১.বিবিসি বাংলা

১২. ইন্টারনেট