বঙ্গবন্ধুর প্রত্যুৎপন্নমতিতায় মাত্র ৯০ দিনে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার!

পাকিস্তানের জেল থেকে মুক্তির পর, লন্ডন হয়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি প্রথমে বাংলাদেশে  রাখেন। তার ঠিক ঘণ্টাখানেক আগে দিল্লিতে যাত্রবিরতি করে বঙ্গবন্ধুকে বহন করা ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানটি।
বঙ্গবন্ধু কীভাবে বাংলাদেশে আসবেন তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা চলছিল।

প্রথমে ভারত ঘোষণা দিয়েছিল ভারতের এয়ারলাইন্সের বিমানে করে বঙ্গবন্ধু ব্রিটেন থেকে ভারতে আসবে । কিন্তু  ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানী বিমান বাহিনীর হামলার আশংকায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথকে অনুরোধ করেন ” যেন ব্রিটিশ বিমানে করে বঙ্গবন্ধু ভারতে আসেন”
এখানে অবশ্য ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের জন্য অনেক উপকার করে দিয়েছিলেন ,তার উদ্দেশ্য ছিল ” ব্রিটিশ বিমানে করে আসা মানে ব্রিটেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হবে এবং ইন্দিরা গান্ধী এডওয়ার্ড হিথকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি দিতে আহবান করেছিলেন” জবাবে হিথ ইন্দিরা গান্ধীর রাজনীতি বুঝতে পারে বলেন “বাংলাদেশ থেকে ভারত সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার পর আমরা স্বীকৃতির বিষয় বিবেচনা করবো,আপনারা কবে সৈন্য প্রত্যাহার করবেন?”। ব্রিটিশ-ভারত রাজনীতির ফলে সবচেয়ে বড় সুবিধা হয় বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করছেন বঙ্গবন্ধু

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে লন্ডন থেকে ওই বিমানে উঠেছিলেন দেশটির কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি। বিমানেই বঙ্গবন্ধু তাকে বলেন, ‘দিল্লিতে ইন্দিরার সঙ্গে বৈঠকের আগেই তার কাছে একটি খবর পৌঁছানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে মিত্রবাহিনী সদস্যদের ৩১ মার্চের মধ্যে ভারতে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।’

দিল্লির বিমানবন্দরে এই মহামানবকে নিজে উপস্থিত হয়ে অর্ভ্যথনা জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী । এরপরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বঙ্গবন্ধু অসামান্য কূটনৈতিক দক্ষতা দেখান  সৈন্য প্রত্যাহার নিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ।।বঙ্গবন্ধু ও এই সুযোগ লুফে নেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের বিষয়ে আলোচনা করেন।


এম আখতার মুকুলের ভাষ্যমতে ঐ ঐতিহাসিক বৈঠকের বিবরণ যিনি বঙ্গবন্ধুর নিজ মুখ থেকে ঘটনার বিবরণ
..
প্রথমে
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে সাহায্য করার জন্য ভারতের জনগণ, ভারত সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু হঠাৎ  করে আসল কথাটা উত্থাপন করলেন।

মুজিব : ম্যাডাম, আপনে কবে নাগাদ বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করবেন?

ইন্দিরা : বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি তো এখন পর্যন্ত নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। পুরো ‘সিচুয়েশন’ বাংলাদেশ সরকারের কন্ট্রোলে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা কি বাঞ্ছনীয় নয়? অবশ্য আপনি যেভাবে বলবেন, সেটাই করা হবে।

মুজিব : মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রায় ৩০ লাখ লোক আত্মাহুতি দিয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আইন ও শৃঙ্খলাজনতি পরিস্থিতির জন্য আরো যদি লাখ দশেক লোকের মৃত্যু হয়, আমি সেই অবস্থাটা বরদাশত করতে রাজি আছি। কিন্তু আপনারা অকৃত্রিম বন্ধু বলেই বলছি, বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করলে আমরা কৃতজ্ঞ থাকব।

ইন্দিরা : এক্সিলেন্সি, কারণটা আরেকটু ব্যাখ্যা করলে খুশি হব।

মুজিব : এখন হচ্ছে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের সময়। এই মুহূর্তে দেশে শক্তিশালী রাজনৈতিক বিরোধিতা আমাদের কাম্য নয়। কিন্তু ভারতীয় সৈন্যের উপস্থিতিকে অছিলা করে আমাদের বিরোধীপক্ষ দ্রুত সংগঠিত হতে সক্ষম হবে বলে মনে হয়। ম্যাডাম, আপনেও বোধ হয় এই অবস্থা চাইতে পারেন না। তাহলে কবে নাগাদ ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করছেন?

ইন্দিরা : (ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটু চিন্তা করলেন) এক্সিলেন্সি, আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আগামী ১৭ই মার্চ বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে।

মুজিব : ম্যাডাম, কেন এই বিশেষ দিন ১৭ই মার্চের কথা বললেন?

ইন্দিরা : এক্সিলেন্সি প্রাইম মিনিস্টার, ১৭ই মার্চ আপনার জন্ম তারিখেই আমাদের সৈন্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরে আসবে।

১৯৭২ সালের ১২ মার্চ, ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশ থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

ইন্দিরা গান্ধী তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছিলেন। ভারত সরকারের আমলাতন্ত্র এবং দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক মহলের বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে যেদিন ভারতীয় সৈন্যদের শেষ দলটি বাংলার মাটি ত্যাগ করে সেদিন ছিল ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। পৃথিবীর ইতিহাসে এই ঘটনা একেবারে বিরল, যুদ্ধ পরবর্তী সাহায্যকারি  বন্ধুপ্রতিম দেশের সেনাবাহিনী  স্বাধীন হওয়ার মাত্র নব্বই দিনের মধ্যে  স্বাধীন ভূখণ্ড ছেড়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধীর ভাতৃপ্রতিম মনোভাব এবং বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণে ভারতীয় সৈন্যরা  ১৭ মার্চ বাংলাদেশ ছেড়ে যায়।

১২ মার্চ,১৯৭১ এ ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়

১৯৪৫ সালে জার্মানিতে ঢুকেছিল মিত্র বাহিনী, ছিল ১৯৫৫ পর্যন্ত, এই ১০ বছরে সেখানে লাখ লাখ মার্কিন, ব্রিটিশ ও রুশ সৈন্য ঘাঁটি গেড়েছিল। সেই ঘটনারই পরোক্ষ জের ধরে এখনো জার্মানিতে আছে পাঁচটি মার্কিন সেনানিবাস, সাড়ে ৩৮ হাজার সৈন্য। আর রুশদের তো পূর্ব জার্মানি ছেড়ে যেতে সময় লেগেছে পাক্কা ৫০ বছর। প্রতিবেশী পোল্যান্ডে রুশরা ছিল ৪৮ বছর, হাঙ্গেরিতে ৪৬ বছর। আর সেই যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢুকেছিল, এখনো জাপানের কয়েকটি দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে আছে মার্কিন সৈন্য। দেখা যাচ্ছে দখলমুক্ত করতে গিয়ে নিজেরাই দখলদার বনে যাওয়াটা কি সমাজতান্ত্রিক কি ধনতান্ত্রিক মোড়ল রাষ্ট্রের একটি স্বীকৃত রীতি। এদিক থেকে স্বাধীনতার ৯০ দিনের মাথায় সদ্যস্বাধীন একটি দেশের মাটি থেকে বিদেশি একটি দেশের সৈন্য প্রত্যাহার করিয়ে নেওয়া বিরল এক ঘটনা এবং এটি সম্ভব হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি বুদ্ধিতিপ্ত প্রয়োগের কারণে।  বঙ্গবন্ধু একজন স্টেটসম্যান হিসেবে অন্যন্য ছিলেন এই ঘটনা তাই প্রমাণ করে। বঙ্গবন্ধুর এই প্রত্যুৎপন্নমতি সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ অনেক জটিলতা থেকে বেঁচে যায়।

সূত্রঃ মুজিবের রক্ত লাল – এম আখতার মুকুল
বেলা অবেলা – মহিউদ্দিন আহমেদ