টিক্কা খানের ভাষ্যে ২৫ শে মার্চ গণহত্যা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা

২৫ শে মার্চ গণহত্যা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘােষণা নিয়ে টিক্কা খানের সাক্ষাৎকারঃ

সাংবাদিক মুসা সাদিক ও রেজাউর রহমান সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত স্বাধীনতা ঘােষণা সম্পর্কে সাক্ষাৎকারটিতে টিক্কা খানের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রয়েছে। মুসা সাদিক ভূমিকাসহ সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ এভাবে প্রকাশ করেন: ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সার্ক রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে বাংলাদেশের এক সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সাথে লাহাের, করাচী হয়ে আমি তখন [১৯৮৮] ইসলামাবাদে। বেনজীর ভুট্টো সেসময় প্রথমবারের মতাে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সার্ক সম্মেলন উদ্বোধন করলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবের গভর্নর হিসেবে জেনারেল টিক্কা খানও সেখানে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথিদের আসনে উপবিষ্ট। বাংলাদেশের গণহত্যার নায়ক জেনারেল টিক্কা খানকে চোখের সামনে দেখে অজান্তে চোখের পাতা ভারী হয়ে এলাে। ২৬শে মার্চ ঘুমন্ত ঢাকাবাসীর ওপর ঐ আইখম্যান কিভাবে গণহত্যা শুরু করেছিল জানবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠলাম। সাংবাদিক দলের অন্য সদস্য সাপ্তাহিক ‘এখনই সময়’ পত্রিকার সাংবাদিক এবং আইন আদালত খ্যাত এডভােকেট রেজাউর রহমানকে শুধালাম তিনি যদি সঙ্গী হন তাহলে টিক্কা খানের কাছে একটা ইন্টারভিউ দেবার জন্য যৌথ অনুরােধ করতে পারি। জনাব রেজাউর রহমান প্রস্তাব শুনে উৎসাহী হয়ে উঠলেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে তার কাছে দু’জনে গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রস্তাব শুনে দুবার না, না’ করে নাছােড়বান্দা আমাদের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন।

জেনারেল টিক্কার সম্মতি মােতাবেক ইসলামাবাদের হােটেল ‘হলিডে ইন থেকে দুপুরের পর পরই আমরা দুজনে রওনা হই। ৩১শে ডিসেম্বর আমরা দু’জনে সন্ধ্যায় তার পাঞ্জাবের সরকারি গভর্নরের হাউজের দোতলায় তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্যে উপস্থিত হই।

তার একান্ত সচিব গাড়ি বারান্দায় আমাদের রিসিভ করে নিয়ে গেলেন দোতলায়। অবশ্য সিঁড়ির মুখে জেনারেল টিক্কা আমাদের দু’জনকে রিসিভ করলেন।

গভর্নরের ড্রইংরুমে ঢােকার সাথে সাথে আমাদের দু’জনকে নিয়ে তাঁর বাবুর্চি, খানসামারা পেল্লায় মেহমানদারি শুরু করলেন। থরে বিথরে সাজানাে লােভনীয় সুস্বাদু সব খাবার এবং হরেক রকমের ফুটস এনে তারা আমাদের সামনে রাখল। যেন গলাধঃকরণ করে আমরা তাদেরকে ধন্য করি ও নিজেরা ধন্য হই। কিন্তু সেসব ফেলে আমরা আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগুতে লাগলাম। আমাদের মূল টার্গেট বাংলাদেশের ২৬শে মার্চে গণহত্যা শুরুর কারণ জানা।

দীর্ঘ দু’ঘণ্টা ধরে আমাদের নেয়া তার ইন্টারভিউ থেকে এখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের অংশবিশেষ তুলে ধরছি। আমি ইংরেজিতে প্রশ্ন করছিলাম এবং তিনি উর্দুতে উত্তর দিচ্ছিলেন।

ইতােপূর্বে আমাদের সাংবাদিক দলের করাচী সফরকালে পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট-এর সেক্রেটারি জেনারেল করাচী সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা জনাব হাবিব খান গােরী এবং পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক জনাব নিসার ওসমানীর সাথে আমার পূর্ব আলােচনার জের ধরে জেনারেল টিক্কা খানকে প্রশ্ন করলাম, Mr. Ghori, Secretary General of Pakistan Federal Union of Journalists and prominent journalist of Lahore Mr. Nisar Osmani told me that common people of West Pakistan did not support the military action in East Pakistan in ’71. After more than two decades do you still think that the action taken was justified, Sir?

জেনারেল টিক্কা খানের উত্তর (তিনি উর্দুতে উত্তর দিচ্ছিলেন) : “সেভেনটি ওয়ান ক্রাইসিসকে বারে মে জ্যায়েসে পাকিস্তানছে মােখতালিব খ্যেয়ালাত হায়, কুচ্ছ লােক আর্মিকে জিম্মাদার ঠাহরেতে আউর কুচ্ছ লােক পলিটিশিয়ানস কো জিম্মাদার ঠাহরেতে হেয়, আউর এ্যাইসি ত্যরা বাংলাদেশ সে বহূত সারে লিডার হামারে সাথ মে থ্যে। বাংলাদেশেকে আওয়াম অ্যাভি বি মায়সুস করতে হেঁ কে হামলােক স্যাহি থে। গােলাম আজম সাব আওয়ার অ্যাম আদমাওঁনে কভি নেহি কাহা কে হাম লােগােনে কুয়ি গলতি কি”। (একাত্তরের সংকটের জন্য কিছু লােক সেনাবাহিনীকে দায়ি করেছে, আবার কেউ কেউ দায়ি করছে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক নেতাও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। এমনকি বাংলাদেশের মানুষ এখনাে বিশ্বাস করে যে, আমরা সঠিক ছিলাম। গােলাম আজম সাহেবসহ সাধারণ মানুষ এখনাে মনে করেন না আমরা ভুল করেছি।)

প্রশ্ন : When did you exactly start the genocide in Dhaka, Sir?
জেনারেল টিক্কা : “মায়নে কুইয়ি জেনোসাইড নেহি করােআয়া। জগন্নাথ হল মে কুচ সরপছন্দ আনসার পােরট্রোল ফোর্স কি উপার গােলাবারুদ ছে হামলা করনে কি তৈয়ার কর রাহে থ্যে। উসকে বাদ ম্যায়নে কুচ্ছ ফোর্স জগন্নাথ হল মে ভেজা। ইয়ে সহি হেঁয় কে উসমে কুচ হিন্দু লােগ ম্যারে গ্যায়ে। উসকে বাদ বরাবর ঝড়প হােতা রাহি। উসমে হামারি লােক ভি মারে গ্যায়ে আওর মুক্তিবাহিনীকে লােক ভি মারে গ্যায়ে। যাহা দো গ্রুপ মে আমনে সামনে ঝড়প ইয়া লড়াই হােত্যি হ্যায় উও জেনােসাইড নেহি হ্যায়।” (আমি কোন গণহত্যা করাইনি। আমাদের টহলদার বাহিনীর ওপর গােলাবারুদ নিয়ে হামলা করার জন্য জগন্নাথ হলে কিছু অবাঞ্ছিত লােক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাে। এরপর আমি জগন্নাথ হলে কিছু সৈন্য পাঠাই। এটা সত্য যে, তাতে কিছু হিন্দু লােক মারা যায়। এরপর কিছু কিছু সংঘর্ষ হয়। তাতে আমাদেরও কিছু লােক মারা গেছে এবং মুক্তিবাহিনীর লােকও মরেছে। যেখানে দু’পক্ষের মধ্যে মুখােমুখি সংঘর্ষ হয় তাতাে গণহত্যা নয়।)

গণহত্যাকারী টিকার উত্তরে আমি ও রেজাউর রহমান যুগপৎ বিস্ময়ে পরস্পরের দিকে তাকাই। এরকম জ্বলজ্যান্ত মিথ্যা তাঁর পি এস (স্লিম, সুঠামদেহী সিভিল ড্রেস পরিহিত আমাদের পার্শ্বে দাঁড়ানাে) পর্যন্ত বিশ্বাস করছে কিনা বােঝার জন্য আমি তাঁর দিকে তাকাই। মনে হলাে, সেও আমাদের ন্যায় কিছুটা বিস্মিত এবং এতকাল পরেও টিক্কার মিথ্যা ভাষণে বিব্রত। কেননা, পাকিস্তানী আর্মি বাংলাদেশে লাখ লাখ লােক হত্যা করেছে, যার শুরু জেনারেল টিক্কা করে গেছেন- তা কে না জানে? এ নিয়ে পাকিস্তানে কমিশন গঠিত হয়েছে এবং ‘৭১-এ এখানে জেনােসাইড ও রেপ করার সুনির্দিষ্ট কারণে উক্ত কমিশন পাকিস্তান আর্মির অনেককে কোর্ট মার্শাল করার জন্য সুপারিশ করে। যদিও তা কার্যকরী হয়নি।

তাহলে তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী ২৬ মার্চ রাতে তিনি গণহত্যা করেননি, তাহলে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে কেন গ্রেফতার করলেন সে-বিষয়টি মনে উদয় হওয়ায় আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, Then Sir, why did you arrest Sheikh Mujib on 26th March from his Dhanmandi Residence?
জেনারেল টিক্কা : “মেরে কডনে দেঁড়াতে হুয়ে এক থ্রি ব্যান্ড রেডিও লা কর দিয়া আওর কাহা স্যার, সুনিয়ে, শেখ সাব আজাদী কা এলান কর রাহে হেঁয়। আওর মাইনে খােদ শেখ সাব কো রেডিও পর এক ফ্রিকোয়েন্সীছে Independence কা এলান করতে হুয়া সুনা । জিসকো বাগাওয়াত কাহা যা সেকতা হেয়। চুকে ম্যায়ে শেখ সাব কি আওয়াজ আচ্ছি তেরা পেহছান তা থা। And I had no option but to arrest him.” (আমার কো-অর্ডিনেশন অফিসার একটি থ্রি ব্যান্ড রেডিও এনে বললাে স্যার শুনুন, শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘােষণা করছেন। আমি নিজে রেডিওতে শেখ সাহেবকে স্বাধীনতার ঘােষণা দিতে শুনলাম, কারণ শেখ সাহেবের কণ্ঠস্বর আমি ভাল করেই চিনতাম। যে-ঘােষণা তখন দেশদ্রোহিতার শামিল ছিল। সেক্ষেত্রে শেখ সাহেবকে গ্রেফতার করা ছাড়া আমার কোন বিকল্প ছিল না।)

প্রশ্ন : If Sheikh Mujib had gone to India along with Mr. Tajuddin in that case what you would have done, Sir?
জেনারেল টিক্কা : “ম্যায় আচ্ছি তেরা জানতা থ্যে মুজিব য্যায়সা লিডার আপনি আওয়াম কো ছােড়কে নেহি যায়েঙ্গি। ম্যায় শেখ মুজিব কো গ্রেফতার করণে কে লিয়ে ঢাকাসে হার জাগা তালাসি লেতা। আওর কোয়ি কোনা, কোয়ি ঘর নেহি ছােড়তা। তাজউদ্দিন আওর ইন য্যায়ছে দোসরে লিডারকে গ্রেফতার করণে কে মেরা কুই ইরাদা নেহি থ্যে। ইস লিয়ে ও লােগ আহসানিসে ঢাকাসে চলি গ্যায়ে”। (আমি ভাল করেই জানতাম শেখ মুজিবের মতাে নেতা তাঁর নিজের লােকদের ছেড়ে যাবেন না কোথাও। আমি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করার জন্য ঢাকার সমস্ত জায়গায় প্রতিটি বাড়ি-ঘরে, এমনকি প্রতিটি কোণায় কোণায় তল্লাশি চালাতাম। তাজউদ্দিনের মতাে অন্য কোন নেতাদের আমার গ্রেফতার করার ইচ্ছা ছিল না। এজন্য তাঁরা সবাই খুব সহজেই ঢাকার বাইরে চলে যেতে পেরেছিলেন।) [প্রাগুক্ত]।
সূত্রঃ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষনার দুর্লভ দলিল, শামসুল আরেফিন

সূত্রঃ ইতিহাসের পাতা থেকে