ভোটের রাজনীতিতে শুভংকরের ফাঁকি! ৭০ থেকে ২১।

১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব বাংলায় ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন জিতলেও এখানে শুভংকরের ফাঁক ছিল। ফলাফলে একচেটিয়া থাকলেও পরিসংখ্যান অন্য কথা বলে!

৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০% ভোট দিয়েছিল,এই ৪০% ভোটারের মধ্যে ৭৫% আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিল! আর বাকী ৬০% জনগণ ভোট দেয়নি এবং যারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন পূর্ব বাংলায় তাদের মধ্যে ২৫% ভোটার আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। অর্থাৎ শতকরা ৬০-৬৫ ভাগ লোকের কোন ভ্রুক্ষেপ ছিল না বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া,না হওয়া নিয়ে বা পাকিস্তানিদের থেকে মুক্ত হওয়া নিয়ে,অন্য চিন্তা দূরে থাক! মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এদের অনেকেই দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল বা পাকিস্তানীদের সাথে ছিল।পাকিস্তানীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ৪০% আওয়ামী সমর্থকদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খুঁজে খুঁজে অকথ্য অত্যাচার করে হত্যা করেছে।

এই ৬০-৬৫% লোকের অধিকাংশ চরম সম্প্রদায়িক ছিল এবং এদের মধ্যে প্রায় অনেকেই আওয়ামী বিদ্বেষী ছিল।আমরা মনে করি আমাদের দেশের মানুষ সাম্প্রদায়িক ছিলোনা,এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল কারণ বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছিলেন এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছিলেন যাতে সম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি না হয়।দেশ স্বাধীন হওয়ার সাথে এই সম্প্রদায়িক অপশক্তির নেতারা যারা রাজাকার ছিল বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গিয়েছিল,আর এদের অগণিত সমর্থক দেশে রয়ে গিয়েছিল এবং কয়েকবছর মৌনব্রত পালন করেছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থানের কারণে। কারণ দালাল আইনে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের পক্ষে অবস্থান করা এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখার কারণে অনেকেই শাস্তিপ্রাপ্ত হন।তবে বঙ্গবন্ধু উদারতা দেখিয়ে ৯২,০০০ হাজার রাজাকারকে ক্ষমা করে দেন,অবশ্য ১১,০০০ রাজাকারকে বিচারের মুখোমুখি করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে সম্প্রদায়িক অপশক্তি মাথাচড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর,মোশতাক,জিয়া,এরশাদ সরকারের সহতায় রাজাকারদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তাদের সমর্থকরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। জিয়াউর রহমান কুখ্যাত রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দেশের ইতিহাসকে লজ্জায় ফেলে দেন। এরপর থেকে বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিস্ফোরণ ঘটেছে বাংলদেশে আর প্রতিনিয়ত কমেছে আওয়ামী লীগের প্রকৃত সমর্থক সংখ্যা।

বর্তমানে আওয়ামী লীগের আদর্শ ধারণ করে সমর্থক সংখ্যা একেবারে তলানিতে ঠেকেছে, হুজুগের আওয়ামী লীগের সংখ্যা অবশ্য দেশের মোট জনসংখ্যার চাইতেও বেশি। বাংলাদেশের জন্মলগ্নে দেশের অর্ধেকের বেশী জনসংখ্যা স্বাধীনতার প্রশ্নে প্রতিক্রিয়াহীন ছিল এবং এই জনগোষ্ঠী পরবর্তীতে দেশে বিভিন্ন সময়ে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধংস করেছে। বর্তমানে কি অবস্থা সেটা হয়ত কল্পনার বাইরে।

এই অবস্থা পরিত্রাণের চেষ্টা তো করা হচ্ছেনা, বরং সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে এবং তাদের সাথে তাল মেলানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যাচ্ছে দায়িত্বশীলদের।

স্বদেশের মানচিত্র কিংবা মুজিব কোট পোড়ানো কাদের কাছে বিপ্লব?? রাজাকারদের পক্ষে সাফাই গাওয়া , যুদ্ধপরাধীদের বিচার বন্ধ করার প্রচেষ্টা কাদের কাছে বাকস্বাধীনতা কিংবা ন্যায়বিচার! বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচার এরাই অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। এরাই ঐ ৫০-৬০% ভ্রুক্ষেপ না থাকাদের বর্তমান উত্তরসূরী।এরা যদিও সংখ্যায় নগণ্য ,কিন্তু এদের সংখ্যা বাড়ছে তড়িৎ গতিতে!

আর যারা বঙ্গবন্ধু,বাংলাদেশ,মুক্তিযুদ্ধ,৩০ লক্ষ শহীদের পক্ষে আছে শুধু গুটিকয়েক তারা সংখ্যায়,দিনকে দিন কমছে!যারা আছে তারা বিলুপ্তপ্রায়,না আছে সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ না আছে অন্য কিছু উল্টো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে দেওয়া হচ্ছে প্রশ্রয়।