শুভ নববর্ষ ১৪২৮,কালো ঘুচে আসুক আলো,নবপ্রভাত হোক আলোয় আলোময়।

পহেলা বৈশাখ হাজার বছর ধরে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির উচ্ছাসিত হওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ…

ব্রিটিশরা এই উপমহদেশ দখল করার আগ পর্যন্ত  উপমহাদেশে তেমন সাম্প্রদায়িক হানাহানি ছিল না।
ব্রিটিশরা নিজেদের শোষণের সুবিধার্থে হিন্দু,মুসলিমদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ায় কিন্তু সফল হতে পারেনি পুরোপুরি। ব্রিটিশদের শোষণ অতিষ্ঠ হয়ে বাঙালিরা হিন্দু,মুসলিম নির্বিশেষে সর্বপ্রথম প্রতিবাদ করেছিল।ব্রিটিশরা বাঙালিদের প্রচন্ড ঘৃণা করতো,কারণ বাঙালি জাতি যেকোন ইস্যুতে ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে এক হয়ে যেত। কারণ এই উপমহাদেশে অন্যান্য জাতি সমূহ যখন ব্রিটিশদের তোষণে ব্যাস্ত ছিল,বাঙালিরা ব্রিটিশদের খেদানোয় দৃঢ়তা  দেখিয়েছিল।তিতুমীর,ক্ষুদিরাম,সূর্যসেন, প্রীতিলতা প্রত্যেকে এই মাটির  সন্তান।ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা  বাঙালিদের শোষণ করতে যেমন কম যায়নি তেমনি ভারতীয় এবং পাকিস্তানী রাজনীতিবিদেরা বাঙালিদের সহ্য করতে পারতেন না। জিন্না যেমন মুসলিম লীগ থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হক কে রাজনীতি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন বাঙালি হওয়ার অপরাধে তেমনি গান্ধীও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং নেতাজি সুভাষ বসুকে কংগ্রেসের রাজনীতি থেকে ঝেঁটিয়ে বিদেয় করেছেন শুধু মাত্র বাঙালি হওয়ার কারণে।একদিকে ব্রিটিশরা শোষণ করেছিল বাঙালি হওয়ার অপরাধে অন্যদিকে একই মহাদেশের অন্যরাও শোষণ করেছে বাঙালি হওয়ার কারণে!ব্রিটিশদের লাগিয়ে দেওয়া বিভিন্ন সময়ে সংঘঠিত  সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ অঞ্চল হচ্ছে বাংলা, কারণ দাঙ্গা ছড়িয়ে তাদের মসনদ পাকাপোক্ত করার অপচেষ্টা দেখা যায় ইতিহাসে। ব্রিটিশদের এই নির্লজ্জ রাজনীতির উত্তরাধিকার ছিল পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী। জিন্না এবং তার সাগরেদরা যেমন বাঙালি নেতাদের সাথে রাজনীতিতে পেরে না উঠে তাদের হিন্দু এবং ভারতের দালাল আখ্যা দিতো,তেমনি বাঙালি সংস্কৃতি,ভাষার উপর চরম আগ্রাসন চালানো শুরু করে  হিন্দুয়ানী ট্যাগ লাগিয়ে। এক পর্যায়ে তো রবীন্দ্র সংগীত নিষিদ্ধ করে দেয়!

পাকিস্তানিরা আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছিল শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ায়।টানা ২৪ বছর আমাদের শোষণ করে গেছে বাঙালি পরিচয়ের কারণে।বাঙালি মুসলমানদের তারা মুসলমান হিসেবে গোনায় ধরত না বাঙালি হওয়ার কারণে সে সময় তাদের শোষণের একমাত্র হাতিয়ার ছিল বাংলা ভাষায় যারা কথা বলে, পহেলা বৈশাখ  বা বাঙালি সংস্কৃতি যারা লালন করে তারা  ভারতের চর এবং হিন্দুয়ানী ভাষা,সংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে বাঙালিদের বিভক্ত করা ,এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো। না তারা সফল হতে পারেনি বাঙালিরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি জাতি হিসেবে ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে জন্মযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানিদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করে  দেয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের শক্ত ভিত মজবুত করে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ৭২-৭৫ অন্তত আমাদের দেশে কোন সাম্প্রদায়িক  সাম্প্রদায়িক হানাহানি ছিলো না ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার কারণে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে আইয়ুব খানের এবং মুসলিম লীগের উত্তরসূরিরা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করে। অথচ যারা এই অপচেষ্টার হোতা তারা স্থায়ীভাবে  বাংলদেশে এসেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর! অর্থাৎ যারা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ দাঁড় করাতে চেয়েছে তারা  বাংলাদেশে বেড়ে উঠেনি কখনো।তারা তাদের অবৈধ শাসনামলে বাঙালি সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছে  একাত্তরের পরাজিত শক্তিকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে। না তারাও সফল হতে পারেনি,ইতিহাস ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে তাদের। ১৯৮৯ সালের পহেলা বৈশাখে এরশাদকে বিদায় করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এক অভিনব সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে,এরশাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ আনন্দ শোভাযাত্রা ( পরে নাম মঙ্গল শোভযাত্রা) , পরে এটি আস্তে আস্তে পহেলা বৈশাখের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠে…

পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতিকে একসূত্রে গাঁথার প্রধান উৎসব। পহেলা বৈশাখের  শহুরে রূপ পহেলা বৈশাখের আসল সৌন্দর্য প্রকাশ করেনা, কারণ শহুরে বৈশাখ উচ্চবিত্তের জন্য,কিন্তু পহেলা বৈশাখের আসল প্রকৃত রূপ দেখা যায় বাঙালি কৃষক পরিবারে, গ্রামের মেলায় কিংবা দোকানির নতুন হালখাতায়।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে,পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার একমাত্র  যোগসূত্র একই জাতি এবং সংস্কৃতি অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ। অবৈধ স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়েছি আমরা বাঙালি জাতিসত্ত্বার অন্যতম অনুষঙ্গ পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে… ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় পহেলা বৈশাখ আমাদের ঐক্যের প্রতীক, শোষণের বিরুদ্ধে লড়ার প্রতীক।

এক শ্রেণীর উগ্রবাদী ধর্ম ব্যাবসায়ী পহেলা বৈশাখকে ধর্মের বিরুদ্ধে  দাঁড় করিয়ে দেয় শুধু মাত্র রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য ঠিক তাদের পূর্বপুরুষদের মত।পহেলা বৈশাখকে তারাই ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে যাদের পূর্ব পুরুষ ব্রিটিশদের তাবেদারী করেছে, পাকিস্তানীদের তাবেদারী করেছে ,সামরিক স্বৈরশাসকদের তাবেদারী করেছে। হ্যাঁ এরা তারা যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নাম করে উপমহাদেশে ধর্মীয় সংঘাত সৃষ্টি করে ধর্মকে কলুষিত করেছে বারবার।

পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমরা বাঙালিদের ধর্মের পার্থক্য থাকতে পারে, বর্ণের পার্থক্য থাকতে পারে,মতের পার্থক্য থাকতে পারে।কিন্তু দিনশেষে আমরা সবাই বাঙালি।

বাংলা নববর্ষ প্রচলন করেছিলেন একজন মুসলিম শাসক সম্রাট আকবর ১৫৫৬ সালে( সেসময় তিনি মুসলিম ছিলেন)।বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজি সম্রাট আকবরের আদেশে সৌর সন ও হিজরি সন এর ভিত্তিতে বাংলা সন তৈরি করেন।তখন চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা ও শুল্ক দিতে হতো কৃষকদের। এরপরের দিন, পয়লা বৈশাখে জমি মালিকরা নিজের এলাকার অধিবাসীদের মিষ্টি খাইয়ে আপ্যায়ন করতেন। বিভিন্ন উৎসব আয়োজিত হত সেই উপলক্ষে। সম্রাট আকবর বাংলা নববর্ষের প্রচলন করেছিলেন রাজস্ব আদায়ে  সুবিধার জন্য  যাতে বাঙালি কৃষকদের ফসল চাষ সংক্রান্ত দ্বিধা বা ভ্রান্তি দূর হয়! কারণ আরবী বর্ষের সাথে বাঙালি কৃষকদের  চাষের সময় এবং শাসকদের খাজনা আদায়ে অসুবিধা হয়। অনেকে বলে থাকেন রাজা শশাঙ্ক বাংলা নববর্ষ প্রথম প্র্ণয়ন করেন,তবে এই মতের গ্রহণযোগ্যতা কম।

এখন অনেকেই( উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী) প্রশ্ন তুলে এই দিনে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশেষ  পূজা পালন করে ,ওরা পহেলা বৈশাখকে হিন্দুদের উৎসব ট্যাগ লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসবে চিত্রিত করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায়।পহেলা বৈশাখে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে কমপক্ষে ২০ টি উৎসব পালিত হয়। নবরাত্রি উৎসব, বিহু উৎসব, খামের উৎসব,পান সংক্রান্তি,তামিল নববর্ষ, সংক্রান এবং ভিসু উৎসব, চেতি চাঁদ এবং নবরেহ উৎসব,খামের নববর্ষ সহ অসংখ্য জাতি এবং ধর্মীয় উৎসব দেখা যায়। এবারের পহেলা বৈশাখ সিয়াম সাধনার মাস রমজানের প্রথম দিনে এসেছে , যা বাঙালি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত খুশির। কিন্তু পহেলা বৈশাখ পড়েছে রমযানের প্রথম দিনে,তাই বলে পহেলা বৈশাখ মুসলমানদের হয়ে যায়নি।রমজান মাস যেমন ধর্মপ্রাণ  মুসলিমদের.. তেমনি পহেলা বৈশাখ ও বাঙালির। পহেলা বৈশাখ কোন ধর্মীয় অনুসারীদের অনুষ্ঠান বা বর্ষ না এটা সমগ্র বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সূত্র বা শেকড় ,এই পহেলা বৈশাখ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বিভিন্ন ধর্ম,বর্ণ এবং মতের বাঙালির ঐতিহাসিক যোগসূত্র নির্দেশ করে।

কালো ঘুচে আসুক আলো, নবপ্রভাত হোক আলোয় আলোময়,শুভ নববর্ষ ১৪২৮।