যুগে যুগে ধর্মব্যবসায়ীরা ( মুআবিয়া থেকে আজ অবধি)

খোলাফায়ে রাশীদিনের শেষ খলিফা হজরত আলী (রা) এর সাথে মুআবিয়া সিফিফিনের ময়দানে পরপর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হন। শেষ পর্যায়ে খলিফা আলী (রাঃ) এর সেনাপতি মালিক আল আশতারের অপ্রতিরোধ্য চাপের মুখে যখন মুআবিয়ার সৈন্যবাহিনী খড় কুটোর মত ভেসে যাচ্ছিল তখন মুয়াবিয়া নিজের সেনাবাহিনী ও হার বাঁচানোর জন্য ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে অবমাননাকর এক অপকৌশল অবলম্বন করে। মুআবিয়া তার সৈন্যদের বল্লমের মাথায় কোরান ঝুলিয়ে হজরত আলী (রা) এর বাহিনীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয় এবং চিৎকার করতে বলে” বিশ্বাসীদের রক্তপাত বন্ধ হোক ” “যদি সিরিয়ায় সৈন্যবাহিনী ধ্বংস হয় তাহলে গ্রিকদের বিরুদ্ধে কে সীমান্ত রক্ষা করবে,যদি ইরাকের সৈন্য বাহিনী ধংস হয় তাহলে কে তুর্কি ও পারসিকদের বিরূদ্ধে সীমান্ত রক্ষা করবে! আল্লাহর পাক কালাম আমাদের বিবাদের মীমাংসা করে দিক।” হজরত আলী (রা) ধূর্ত আমার বিন আসার এবং মুআবিয়ার চরিত্র সমন্ধে জানতেন তাই তিনি সহজেই মুআবিয়া এবং তার প্রধান চক্রান্তকারী আমর বিন আসের কূটকৌশল ধরতে পেরেছিলেন। খলিফা আলী তিনি মুয়াবিয়া এবং আমর বিন আসের অপকৌশল ও প্রতারণার কথা তার সৈন্যদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন এবং তাদেরকে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে বলেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার সৈন্যদের বল্লমের মাথায় কুরআন দেখে আলী(রা) সৈন্যদের একাংশ সম্মোহিত হল এবং আর যুদ্ধ চালিয়ে যেতে রাজি হলো না। আলী (রা) তার সৈন্যদের বারবার বোঝাতে চেষ্টা করলেন ” যে মুআবিয়া আবু সুফিয়ানের পুত্র ,তাকে বিশ্বাস করোনা সে তার সৈন্যদের এবং তার নিশ্চিত পরাজয় এড়ানোর জন্য কুরআনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে “
কিন্তু ঐ যে আলী (রা) এর সৈন্যরা মুআবিয়ার কূটচালে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল এবং সৈন্যদের একাংশ কুরআন অবমাননার আশংকায় আলী (রাঃ) এর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আদেশ অমান্য করে হুমকি দেয় “যুদ্ধ বন্ধ না করলে স্বপক্ষ ত্যাগ করবে তারা”।ফলে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য হন আলি (রাঃ)। পুরো যুদ্ধে একচেটিয়াভাবে জয়ী হয়ে ও ইসলামের চতুর্থ খলিফাকে হারের অনুভূতি নিয়ে সালিশে মীমাংসায় যেতে হয় এবং মুআবিয়া এবং তার সৈন্যদলকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত ঐ সালিশে কোন প্রকার মীমাংসা হয়নি।

এবং এই সালিশের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কারণে মুআবিয়া বেঁচে যায় এবং হযরত আলী (রাঃ) হাসান,হোসেন(রাঃ) এর হত্যাকান্ড সহ অনেক বিয়োগান্তক এবং মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে মুআবিয়ার বেচেঁ যাওয়ার কারণে।সেদিন যদি সিফফিনের ময়দানে মুআবিয়া কুরআনকে বল্লমের মাথায় রেখে যে কূট রাজনীতি না করতো,কুরআনের প্রকাশ্য অবমাননা যদি বাকিরা অনুধাবন করতে পারতো তাহলে হয়ত রাজনীতিতে,যুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহারের সূচনা ঘটত না।

আমাদের দেশেও গো আজম,কসাই কাদের,নিজামী,মুজাহিদ, সাইদী ,আজিজুল হক,মামুনুল হক প্রমুখ সহ ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ব্যাবসায়ীরা বিভিন্ন সময়ে কুরআন হাদীসকে মুআবিয়ার মতই ব্যবহার করছে নিজেদের ব্যবসার জন্য। রাজনীতি করবে ভাল কথা তাও ধর্মের লেবাস পরে রাজনীতি করবে! কিন্তু যখন ধরা খাবে তখন বলবে তারা রাজনীতিবিদ না তারা ইসলামের সেবক ,ধর্মীয় নেতা! এসব!অথচ এদের উদ্দেশ্য পুরোপুরি মুআবিয়ার মত।যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যেতে হবে! কোরআন ইসলাম অবমাননা করলেও বা কী সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান তো বুঝে না।

মুয়াবিয়া নিয়ম ভেঙে যুদ্ধ করবে,কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে না পেরে পর্যদুস্ত হয়ে গেলে তখন ঢাল হিসেবে কুরআনের অপব্যবহার কিংবা নিজে হেরে গেলে ইসলাম ভাগ হয়ে যাবে এই কুযুক্তি দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভক্ত করে নিজে ফায়দা নিয়েছিল,যে কারণে মুসলিমদের এবং ইসলামের অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যায়।

বর্তমানের মামুনুল বা সকল ধর্মব্যবসায়ীরাও ঠিক এইরকম।প্রচার করবে কোরআনের তাফসীর মাহফিল,অথচ করবে রাজনৈতিক সমাবেশ,ধর্মীয় বক্তব্য বলে চালিয়ে দিবে রাজনৈতিক বক্তব্য রাজনৈতিক ইস্যুতে আন্দোলন করবে অথচ সাধারণ মানুষকে বলবে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় অরাজনৈতিক উদ্দেশ্য তাদের। রাজনৈতীক স্বার্থের জন্য ঘরবাড়ি ,সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পদ ভাঙবে, পুড়িয়ে দিবে আর বলবে আমাদের কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই। ফলে সাধারণ মানুষ এদের ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ধরতে পারে না এবং বিভ্রান্ত হয় ।

যখন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের অপরাজনীতি এবং অপকর্মের জন্য ধরবে এরা এবং এদের সমর্থকরা আবার রব তুলে ইসলামের খেদমতের জন্য জুলুমের স্বীকার হচ্ছি ,ইসলাম বাঁচাতে হলে আমাদের অপকর্ম চেপে যান,আমরা রাজনীতি করিনা আমরা ইসলামের সেবক। অথচ এরা প্রত্যেকে একেকটা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা! এরা ঠিক মুআবিয়ার মত কপট এবং ধূর্ত।ইচ্ছেমত অপকর্ম করবে এবং অপকর্মের জন্য ধরা পড়ে যখন তখন আচরণ করবে ঠিক মুআবিয়ার মতন। এদের মধ্যে আর মূয়াবিয়ার পার্থক্য হচ্ছে মুআবিয়া নিজেকে বাঁচানোর জন্য কুরআনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল আর ধর্ম ব্যাবসায়ীরা ঢাল হিসেবে পুরো ইসলামকে ব্যবহার করছে। মুআবিয়া নিজে যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে তখন দাবি করে নিজে বিলুপ্ত হলে ইসলাম অস্তিত্ব সংকটে পড়বে , ইসলাম বিলুপ্ত হতে পারে! এখনকার ধর্মব্যবসায়ীরা নিজে অপকর্ম করে ধরা পড়লে একই অজুহাত দেয় ,তাদের গ্রেপ্তার করা মানে ইসলামের উপর জুলুম,তারা এদেশের ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যে অপরিহার্য!মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাজনীতি করাবে,তাদের অর্ধাহারে অনাহারে রেখে বলাৎকর করবে,কিন্তু ভিকটিমকে প্রতিবাদ করার সুযোগ দেয় না! অনেকে তো মাঝে মধ্যে বলাৎকার কারীদের গ্রেপ্তার করলেও মনে করে এটা মিডিয়ার চক্রান্ত,সরকারের জুলুম। তারা হারিয়ে গেলে ইসলাম ও হারিয়ে যাবে,তাদের অপকর্মের জন্য শাস্তি দেওয়া মানে ইসলামের উপর জুলুম সহ এরকম লাখ লাখ অজুহাত তাদের তৈরি। এই জঘন্য ব্যবসায়ীরা তাদের অপকর্ম বিভিন্ন সময়ে কুরআন হাদীসের রেফারেন্স নিজের সুবিধা মত বিকৃত করে নিজের অপকর্মকে জাস্টিফাই করে নেয়।

এরা মুআবিয়া এবং খারিজিদের উত্তরসূরি এই নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।ইসলামের স্বর্ণযুগে যেমন মুআবিয়ার মত ধর্মব্যবসায়ী যেমন ইসলাম রক্ষার নাম করে সমাজের শান্তি নষ্ট করেছিল ,ইসলামের ক্ষতি করেছিল ,বর্তমানেও এরা আছে,এরাই ইসলামের ক্ষতি এবং ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে এবং শান্তিপ্রিয় মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে যুগে যুগে ইসলাম রক্ষার নাম করে।