আল আকসা মসজিদে ইজরায়েলি হামলার অদ্যোপান্ত – ফিলিস্তিন- ইসরাইল সংঘাত ( পর্ব -১)

ইজরায়েল এই সপ্তাহের শুক্রবার(৭ মে) এবং শনিবারে আল আকসা মসজিদে ইফতারের পর নামাজরত ফিলিস্তিনিদের উপর পৈশাচিক হামলা চালায়। এদিন শবে কদর পালন এবং ইতিকাফের উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় দশ হাজার মুসলিমরা সমবেত হয় আল আকসা মসজিদে। ইসরাইলের ডান উগ্রপন্থী ইহুদি সংগঠন জেডিএল আল আকসার নিকটে অবস্থান নেয় কারণ এদিন ইফতারের পরে হামাসের প্রতিবাদ সভা ছিল আল আকসা প্রাঙ্গনে ইসরাইলনের ফিলিস্তিন অবৈধ অধিগ্রহণের ৫৪ বছর পূর্তির প্রতিবাদে । কিন্তু হঠাৎ করে ইসরাইল হামলা চালিয়ে প্রথম দিন ২০০ জনের অধিক এবং দ্বিতীয় দিনে প্রায় ১০০ জনের অধিক ফিলিস্তিনিকে আহত করে! রবি ও সোমবারে ও ইসরায়েলের এই হামলা অব্যাহত থাকে.. রেড ক্রসের ভাষ্যমতে প্রায় ৩০০ জনের অধিক এখন পর্যন্ত হতাহত হয়েছে।

ইসরাইলের সেনারা নামাজরত অবস্থায় হামলা করে

এবার পুরো রমজানে ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরাইলের অন্যান্য বছরের তুলনায় হামলার সংখ্যা অনেক কম ছিল,এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল কারণ সৌদি আরব, বাহরাইন, আরব আমিরাত,কাতারের সাথে ইজরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে।ফিলিস্তিনিদের উপর এবার অত্যাচার কম হওয়ায় অনেকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ সালমানকে ক্রেডিট দিয়ে থাকেন। হ্যাঁ, ইজরাইলের সাথে সৌদি আরবের সম্পর্ক উন্নয়নের ফলে ফিলিস্তিনির জনগণ কিছুটা হলেও লাভবান হয়েছিল।কিন্তু সে লাভের রক্তে আল আকসা প্রাঙ্গন এখন রঞ্জিত…

হামলার পরে আল আকসা প্রাঙ্গন

শান্তিপূর্ন পরিবেশ করে উত্তপ্ত হলো কেন ? কেনইবা হঠাৎ করেই ইসরাইল হামলা করলো কেন নিরীহ নামাজরত মুসলিমদের উপর ? আসুন জেনে নেই পেছনের ঘটনা….

গত সপ্তাহে শুক্রবারে গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনিরা সাপ্তাহিক শান্তিপূর্ন প্রতিবাদ করছিলো ইসরাইলের শোষণের বিরুদ্ধে। মিছিলে অতর্কিত ইসরায়েলি সৈন্যরা গুলি করে এবং দুজন ফিলিস্তিনি আহত হয়। ফিলিস্তিনিরা ক্ষুদ্ধ হয়ে সীমান্তে ইসরাইলের সেনাদের গুলি করে গত রবিবার(২মে),এতে দুজন ইজরায়েলি সেনা আহত হয়। গত সপ্তাহে সোম,মঙ্গল বার পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত ছিল,কিন্তু সমস্যা বাঁধে যখন আহত একজন ইসরায়েলি সৈন্য মারা যায়। অবশ্য প্রত্যক্ষদর্শী এক ফিলিস্তিনি যুবকের ভাষ্য ইজরায়েলি সৈন্যরা নিজেদের নিজেরা গুলি করেছে!এদিকে ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে হামাস গাজা উপত্যকা থেকে ইসরাইলে অনবরত রকেট ছুড়তে থাকে ,প্রায় ৮০ থেকে ২০০ টির মত রকেট ছুঁড়ে ইসরাইলে,কিন্তু ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত হওয়ায় হামাসের রকেট কোন ক্ষতি করতে পারেনি ইসারাইলের,যদিও তিন ইসরায়েলি আহত হন। ইসরাইলের সেনারা পাল্টা জবাবে গাজায় কয়েকটি রকেট ছুঁড়ে এবং চার জন ফিলিস্তিনি নিহত হন,একজন গর্ভবতী মা তার মেয়েসহ মারা যান,১৩ জন আহত হন। ইসরাইলের হামলায় হামাসের স্বশস্ত্র সংস্থার অফিস ,তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদলুর অফিস এবং কয়েকটি ভবন একেবারে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। ইজরায়েলি রকেট হামলা এবং ফিলিস্তিনি জনগণ নিহত হাওয়ার শুক্রবারে ইফতারের পরে হামাসের প্রতিবাদ সভা এবং মিছিলের কর্মসূচি ছিল আল আকসা প্রাঙ্গনে । এই কর্মসূচি যাতে বিঘ্নিত হয় ইসরাইল এজন্য অতর্কিত হামলা চালায়। শুক্রবারে ইফতারের পর আল আকসা মসজিদের রাবার বুলেট ,স্টান গ্রেনেড ছুঁড়লে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত ৩০০ জনের অধিক মুসল্লি আহত এবং ৭ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গন বর্তমানে ইজরায়েলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে,তবে মসজিদে অসংখ্য মুসলমান এখনো অবরুদ্ধ।

সংঘর্ষ চলছে

এর আগে গত মাসে এপ্রিলের ২৪ তারিখেও একই ধরণের ঘটনা ঘটে ।এদিন বিকেলে ফিলিস্তিনিরা আল আকসা প্রাঙ্গনে যাওয়ার পথে জেরুজালেমে প্রবেশমুখে ইসরাইলের সেনাদের সাথে সংঘর্ষে জড়ায়,এবং পুলিশ টিয়ারশেল ,জলকামান ,স্টান গ্রেনেড ছুড়ে তাদের আটকাতে চেষ্টা করে , ফলশ্রুতিতে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ,অনেক ফিলিস্তিনী আহত হয় সেদিন।এদিন ইসরাইলের ডান উগ্রপন্থী ইহুদি সংগঠন লাহাবা আল আকসার নিকটে অবস্থান নেয় ফিলিস্তিনির জনগণের উপর হামলা করার জন্য , ইজরাইলি সৈন্যরা তাদের উপর টিয়ারশেল ,জলকামান ,স্টান গ্রেনেড ছুঁড়ে ইহুদীদের নিবৃত্ত করে এবং সরিয়ে দেয়।এই ঘটনার প্রতিবাদে হামাস কয়েকবার রকেট ছুঁড়ে ইসরাইলে। শেষ দুই সপ্তাহ ধরে খুব উত্তেজনা চলছিল গাজা উপত্যকায়,একবার হামাস হামলা করে ইজরায়েলে,আবার ইজরায়েলি সেনারা রকেট ছুঁড়ে গাজায়।এভাবেই চলে উত্তেজনা চলছিল পুরো রমজান মাস জুড়ে। অবশেষে মে’র প্রথম সপ্তাহে ইজরায়েলি সেনার মৃত্যু এবং হামাসের রকেট হামলাকে কেন্দ্র করে ইজরায়েল আল আকসা মসজিদে হামলা চালায় প্রতিশোধ নিতে।

ইসরায়েলের আল আকসা মসজিদে হামলা চালানোর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ইসরায়েল হিব্রু বর্ষ অনুসারে ১০ মে অর্থাৎ সোমবারে “১৯৬৭” সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ জয়ের ৫৪ তম বর্ষ পালন করছে …এদিন যাতে ইজরায়েলের ইহুদিরা তাদের বিজয় উৎসব ভালোভাবে পালন করে।পরপর দুটি সংঘর্ষ মূলত ইজরায়েলের জয় উৎসবের আমেজ আরো বাড়িয়ে দেয়। ফিলিস্তিনিরা এবং হামাসের সদস্যরা বিশেষ করে মিলিটারি উইং আরেকবার শিন বেত এবং মোসাদের পাতা নির্ভূল ফাঁদে পা দিয়েছে… প্রতিনিয়ত হামাসের রাজনৈতিক এবং সামরিক ভুলের চোরাবালিতে হাজার হাজার মুসলমানের রক্তে ভাসছে ফিলিস্তিনি কিংবা জেরুজালেমের মাটি।

কীভাবে হামাস ফাঁদে পা দিয়েছে এবং ভুল করছে সেটা আগামী পর্বে ব্যাখ্যা করবো!