ফিলিস্তিনির ভবিষ্যত কি?শান্তি প্রতিষ্ঠায় ফাতাহ বা পিএলওর ভূমিকা! ফিলিস্তিনি- ইজরাইল সংঘাত(পর্ব-৩)

ফাতাহ! পিএলও জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। ফাতাহ ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফিলিস্তিনীদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার স্বার্থে পিএলও(Palestine Liberation Oganization) রাজনৈতিক জোট গঠিত হয়।প্রকারান্তে একমাত্র হামাস ছাড়া ফিলিস্তিনের সকল রাজনৈতিক দল এখন ফাতাহর আওতাধীন পিএলও জোটে আছে। ফাতাহ বা পিএলও জোটের বর্তমান লক্ষ্য শান্তিপূর্ন উপায়ে সমঝোতার মাধ্যমে “১৯৬৭ সালে যুদ্ধে হারানো ভূমি ফিরে পাওয়া”। আশি এবং নব্বইয়ের দশকে ইজরাইলের বিরুদ্ধে এই জোটের সামরিক তৎপরতা ছিল কিন্তু বর্তমানে নেই, প্রতিরক্ষা কাজে কিংবা হামাসকে মোকাবিলা করার জন্য ফাতাহর একটা মিলিটারি উইং আছে।বর্তমানে ফাতাহের মিলিটারি উইং ইজরাইলের সাথে সরাসরি কোন সংঘর্ষে জড়ায় না। এই দল পশ্চিম তীরে প্রভাবশালী,পশ্চিম তীরের জনগণ ইজরাইলি হামলার শিকার হয় কম। পুরো গাজায় ইজরায়েলি সেনারা রকেট হামলা করছে কিন্তু পশ্চিম তীরে করছেনা, কারণ ফাতাহ’র সমঝোতাপূর্ন মনোভাব!

এহুদ বারাক,বিল ক্লিনটন, ইয়াসির আরাফাত



বিল ক্লিনটনের একক প্রচেষ্টায় ১৯৯৩ সালে ফাতাহর নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাথে ইজরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনকে একই টেবিলে আলোচনায় বসাতে সক্ষম হন, আলোচনায় উভয় পক্ষই ছাড় দেন। ইজরায়েল কিছুটা নমনীয় হয় ফিলিস্তিনের জনগণের প্রতি এই আলোচনার পর। আইজ্যাক রবিন মারা গেলে এহুদ বারাক ক্ষমতায় আসে এবং বিল ক্লিনটনের মধ্যস্ততায় ইয়াসির আরাফাতের সাথে শান্তি আলোচনা অব্যাহত থাকে।আলোচনায় ১৯৬৭ সালের সীমান্ত এলাকার কিছু অংশ ছাড় দিতে রাজি হন এহুদ বারাক,কিন্তু সেটেলমেন্ট অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।কিন্তু ইয়াসির আরাফাত ১৯৬৭ সালের সীমান্ত ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে অনড় থাকেন,ইজরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানান,শুধুমাত্র সীমান্তে সহিংসতা বন্ধ করার আশ্বাস দেন। কোন পক্ষ সেভাবে ছাড় না দেওয়ায় সমঝোতা আগায়নি।এরপরও বিভিন্ন আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে কিন্তু সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি কখনো।

ইয়াসির আরাফাতের সাথে আলোচনায় বসা এবং ছাড় দিতে রাজি হওয়ার কারণে ইজরাইলে এহুদ বারাককে চরম সমালোচনায় পড়তে হয় এবং ডান উগ্রপন্থী ইহুদি সংগঠন তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

এহুদ বারাককে ২০০৩ সালে এক নির্বাচনী প্রচারণায় উগ্রপন্থী ইহুদি তাকে গুলি করে হত্যা করে ইয়াসির আরাফাতের সাথে আলোচনায় বসার কারণে। তারপরও কিছুদিন পরিস্থিতি কিছুটা ফিলিস্তিনির পক্ষে ছিল।দীর্ঘ দশ বছর ধরে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে ছিল।কিন্তু ইয়াসির আরাফাতকে ২০০৪ সালে রহস্যজনক ভাবে হত্যা করা হয় ( অভিযোগ মোসাদের দিকে) তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শান্তি আলোচনা চরমভাবে বিঘ্নিত হয় ফিলিস্তিনিদের উপর ইজরায়েলি অত্যাচারের কারণে এবং ইজরায়েলে ফিলিস্তিনিদের আত্মঘাতী বোমা হামলার কারণে। ঠিক এইরকম অস্থিতিশীল সময়ে ২০০৬ সালে ফিলিস্তিনের সাধারন নির্বাচনে হামাস ক্ষমতায় আসে। ফলে শান্তি প্রক্রিয়া আড়ালে চলে যায়। ইজরায়েল এবং ফিলিস্তিনি সীমান্তে প্রতিনিয়ত গোলাগুলিতে অসংখ্য ফিলিস্তিনী হতাহিত হয়। হামাস ক্ষমতায় আসলে ইজরায়েল গাজায় ৫০ দিন ব্যাপী বিমান হামলা চালিয়ে ২০০০ এর অধিক ফিলিস্তিনি কে হত্যা করে, এতে দশ হাজারের বেশি নিরীহ ফিলিস্তিনি আহত হয় হয়। ফলস্বরূপ শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়া একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু,বারাক ওবামা, মোহাম্মদ আব্বাস


ফিলিস্তিনের ভাগ্যে আবার আশার আলো ফোটে ২০০৮ সালে যখন বারাক ওবামা ক্ষমতায় আসেন। ক্ষমতায় এসেই ইজরায়েল এবং ফিলিস্তিনী সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি ক্ষমতায় এসেই মিশরে সফরে যান এবং ইজরায়েল সফরে যাওয়া বিরত থেকে কড়া বার্তা দেন ইজরায়েলকে। ফাতাহ নেতা মোহাম্মদ আব্বাসের সাথে বিভিন্ন সময়ে ওবামা আলোচনায় বসে এই সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেন কিন্তু হামাসের গাজা থেকে অনবরত রকেট হামলার অজুহাতে আলোচনা প্রক্রিয়া বারবার বন্ধ করে দেয় ইজরাইলের। ২০১৩ সালে ওবামা শেষ চেষ্টা করেন ফিলিস্তিনের জন্য । ইজরাইলের অবৈধ সেটেলমেন্টর বিরুদ্ধে ওবামা সিনেটে ঘোষনা দেন “যুক্তরাষ্ট্র ১৯৬৭ সালের ইজরায়েল ফিলিস্তিনি সীমান্তে বিশ্বাস করে”। এই ঘোষণায় ইজরাইলের টনক নড়ে,পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি নির্মাণ কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে। ওবামার এই ঘোষণায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু চরম বিপাকে পড়েন,এবং মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে গিয়ে বিনা নোটিশে প্রতিবাদ জানিয়ে আসেন। ওবামা তার শাসনামলে মোহাম্মদ আব্বাসের সাথে মিলে চেষ্টা করেছিলেন ফিলিস্তিনিদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে।ফিলিস্তিনিদের অধিকার ফিরিয়ে না দেয়ায় ওবামা বিভিন্ন আন্তজার্তিক সম্মেলনে নেতানিয়াহুকে এড়িয়ে যান মেয়াদের শেষ চার বছর,এমনকি ইজরায়েলে সফরে পর্যন্ত যাননি ওবামা তার মেয়াদকালে। দীর্ঘ সময় ধরে ফাতাহ কিংবা পিএলও অত্যন্ত চেষ্টা করছে রাজনৈতিকভাবে শান্তিপূর্ন উপায়ে সমঝোতার জন্য কিন্তু ,কিন্তু সেটা ইজরায়েলি শাসকদের একগুঁয়েমি এবং হামাসের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে পন্ড হয়ে যাচ্ছে। ওবামা তার ক্ষমতার মেয়াদে থাকা অবস্থায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন ফিলিস্তিনিদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে,কিন্তু পারেননি। কারণ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অত্যন্ত ঝানু রাজনীতিবিদ। আমেরিকায় বেড়ে উঠে নেতানিয়াহু মোসাদে যোগ দিয়ে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর এর হামলা থেকে শত শত ইহুদির জীবন বাঁচিয়ে হিরো হয়েছিলেন ১৯৭৩ সালে। আমেরিকার রাজনীতির পথঘাট নেতানিয়াহুর চেনা।বর্তমানে বাইডেন প্রশাসন পিএলওকে সহায়তা করবে ক্লিনটন কিংবা ওবামা প্রশাসনের মতোই কিন্তু রিপাবলিকানদের বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে ফিলিস্তিনীদের অধিকার রক্ষা করা প্রায় করা প্রায় অসম্ভব। ফলে ফিলিস্তিনিদের সমস্যা সমাধানের সম্ভবনা নেই বললে চলে। পরাশক্তিরা বিভিন্ন আশ্বাস দিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে ঘোরাবে নিজের রাজনৈতিক দর কষাকষির জন্য।বস্তুত এটা মূলা ঝুলিয়ে রাখার মত,কোন উপকারে আসবেনা পরাশক্তিদের আশ্বাস এই ফিলিস্তিনের জনগণের অধিকার রক্ষায় কারণ পরাশক্তিরা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ইজরায়েলের উপর কোন না কোনভাবে নির্ভরশীল। ফাতাহের শান্তি প্রচেষ্টা কোনদিনই আলোর মুখ দেখবেনা কারণ হামাস পুরোপুরি অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিবে।এই অসম যুদ্ধে হামাসের এই আত্মবিদ্ধংসী প্রচেষ্টা দিনশেষে আরো নিরীহ ফিলিস্তিনীদের রক্ত ঝরাবে,লাশের স্তূপ বাড়াবে।

বর্তমানে ইসরায়েলি অত্যাচার বা হামলার জবাব দেওয়ার কারণে হামাস খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ফিলিস্তিনি যুবকদের কাছে। কারণ তরুণ যুবারা মরীচিকা দেখে বিভ্রান্ত হয় সহজে,তার উপর হামাস সাথে সাথে হামলার জবাব দেয় তাই তরুণেরা হামাসকে খুব পছন্দ করে।কিন্তু হামাসের অক্ষমতা খতিয়ে দেখেনা তারা । হামাসের আন্তজার্তিক রাজনীতিতে নাজুক অবস্থা,নাজুক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোন কিছুই তাদের চিন্তায় আসেনা, ইজরাইলের বুলেটের বিরুদ্ধে পাথর মেরে তারা জিহাদ করতে চায়! এটা মুসলিম ব্রাদারহুডের ভ্রান্ত মতবাদের ইনপুটের হামাসের কর্তৃক সফল বাস্তবায়ন। ইজরাইলি আগ্রাসন এবং অত্যাচারে অতিষ্ট ফিলিস্তিনী তরুণদের এই ছাড়া আর কোন বিকল্প ও হাতে নেই। ইজরাইলি তরুণদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে হামাস তাদের দলাভারী করে। আর তরুণেরা অন্ধকারে পথ হারায় ,একটি পাথর ছোড়ার জন্য গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ে।

ইজরাইলের সামরিক বাজেট বাৎসরিক



পুরো মুসলিম বিশ্বে সকল দেশ মিলিয়ে মোট প্রতিরক্ষা বাজেট ইজরায়েলের বাৎসরিক বাজেটের কাছাকাছি । ইজরায়েলের বাৎসরিক সামরিক খাতে বাজেট ৭২.৯ বিলিয়ন ডলার। মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, গত এক বছরে ৫২.৬ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ক্রয় করেছে সৌদি আরব যার বেশিরভাগের বিক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র ।
ইরান,তুরস্ক,মিশর,পাকিস্তান কাতার সামরিক খাতে বাৎসরিক বাজেট সবমিলিয়ে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হবেনা।ইজরায়েল পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ইজরাইলের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এই মুসলিম দেশগুলোই।বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র রপ্তানি করে ইসরায়েলিরা।

বেশীরভাগ মুসলিম রাষ্ট্র ইজরায়েলের অস্ত্রের প্রধান ক্রেতা

সামরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে ইজরায়েল বিশ্বের ২০ তম শক্তিশালী দেশ।আমেরিকা থেকে বছরে ৭-৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র পেয়ে থাকে ইসরাইলিরা। আর ফিলিস্তিনিদের কি অবস্থা ভাবুন! বছরে ৭-৮ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সাহায্য পায় না আবার নিজেরা অস্ত্র তৈরি করতেও পারেনা। এই ভাঙ্গা থালা নিয়ে হামাস একা বিচ্ছিন্নভাবে ইজরায়েলের সাথে কি লড়াই করবে সেটা সহজেই অনুমেয়। সর্বোচ্চ এক দুজন ইজরায়েলি সেনা হত্যা করবে রকেট ছুঁড়ে ,আর ইজরায়েল এই হত্যার জবাব দিবে শত শত রকেট ছুঁড়ে ,বিমান হামলা করে সাথে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি হত্যা করে।

সামরিক খাতে ইজরায়েকের বাজেটের বিবরণ



ফাতাহ এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই সমঝোতার চেষ্টা করে যাচ্ছে ইজরাইলের সাথে অস্ত্রের জবাব ছেড়ে দিয়ে।এজন্য ফাতাহ ইজরায়েলে হামলা করেনা,পশ্চিম তীরের জনগণ এজন্য তুলনামূলকভাবে শান্তিতে আছে। অন্যদিকে হামাসের রকেট হামলার জবাবে ইজরাইলের রকেট কিংবা বিমান হামলায় গাজায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ হতাহত হচ্ছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের এখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনীদের সাথে ইজরায়েলের যতগুলো শান্তি চুক্তি হয়েছে সবগুলোই ফতাহর অবদান। কিন্তু বর্তমানে ফাতাহ কিছুটা জনবিচ্ছিন্ন। আন্তজার্তিক পরাশক্তিরা শান্তি আলোচনা করার জন্য ফিলিস্তিনের প্রতিনিধি হিসেবে এখনো পি এল ও নেতা মোহাম্মদ আব্বাসকে ডাকে। কিন্তু পিএলও এর ব্যর্থতা এবং আন্তজার্তিক কূটনীতিতে বারবার ইজরায়েলি লবি ও অর্থের কাছে হেরে যাচ্ছে তারা।ফিলিস্তিনীরা এখন পিএলওর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে তাদের ক্রমাগত ব্যর্থতার কারণে।মূলত ফাতাহ’র ব্যার্থতার কারণে তরুণ সমাজ প্রলুব্ধ হচ্ছে হামাসের দিকে।

বর্তমানে ফিলিস্তিনির বাস্তবতা বিবেচনায় এই পরিস্থিতিতে হামাসের রকেট হামলা কোন সমাধান বয়ে আনবেনা ,উল্টো নিরীহ ফিলিস্তিনিরা হতাহত হবে,পুরো ভূখন্ড ইজরায়েলের করায়ত্ব হয়ে যাবে। সমাধানের পথ একটাই বাস্তবতা মেনে নিয়ে ফাতাহর সাথে আলোচনা করে হামাস ফাতাহ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে ইজরায়েলের সাথে আলোচনায় বসা। ১৯৬৭ সালের সীমান্তের আশা বাদ দিয়ে ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়ে ইজরাইলকে আগ্রাসন বন্ধের আহ্বান জানানো উচিৎ ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদদের এবং মুসলিম বিশ্বের।এটা ছাড়া কোন সমাধান নেই ফিলিস্তিনিদের হাতে ইজরাইলিদের সাথে তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও। তিক্ত সত্য হলেও স্বীকার করতে হবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সকল আরব দেশ ইজরাইলের সাথে শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে ইয়ম কিপুরের যুদ্ধে মিশর সিরিয়া আবার শোচনীয়ভাবে হারে হাবার ইজরায়েলি সেনাদের কাছে। ইসরাইল উভয় যুদ্ধে জিতে মিশর, জর্ডান, লেবাননের বিস্তৃত ভূমি দখল করে নেয়। পরে নম্বইয়ের দশকে শান্তি চুক্তির আওতায় ইসরাইল মিশরের সিনাই উপত্যকা এবং জর্ডানের গোলান হাইটস ছেড়ে দেয়।২০০০ সালে লেবাননকে তাদের অধিকৃত জায়গা ছেড়ে দেয়। বর্তমানে জর্ডান,মিশর লেবাননের সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ন ইজরায়েলের অধিকৃত ভূমি ছাড় দেয়ার কারণে। ইজরায়েল শুধুমাত্র ফিলিস্তিন দখল করে রেখেছে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে জয়ী হিসেবে। আমাদের দৃষ্টিতে ওরা দখলকারী হলেও ইসরায়েলি দৃষ্টিকোণে ওরা বিজেতা। তাই ইজরাইলি প্রশাসনের ভাষ্যমতে “ছাড় দেয়ার প্রশ্ন আসেনা কিংবা সুযোগ নেই”। ইসরাইল পুরো ফিলিস্তিনিকে হামলা করে গুড়িয়ে দিলেও মিশর,জর্ডান ,লেবানন সাহায্য করতে এগিয়ে আসবেনা সহসা পূর্ব নির্ধারিত চুক্তির কারণে। ইসরায়েলের সাথে এই যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সাথে কোন নিকটতম প্রতিবেশী দেশ নেই ,ফিলিস্তিনিরা এই সংগ্রামে নিঃসঙ্গ শেরপা হয়ে লড়ে যাচ্ছে ,যাবে।

রাজনৈতিক, কূটনৈতিক , অর্থনৈতিক সামরিক দিক বিবেচনা করলে ইজরায়েলের সামনে হামাস খড়কুটো। বাস্তবতার নিরিখে হামাসের উচিৎ ফিলিস্তিনী জনগণের জানমাল রক্ষার্থে অন্তত রকেট হামলা ও স্বশস্ত্র কার্যক্রম পরিত্যাগ করা।ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক দলগুলোর একাত্ম হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য।আধুনিক শিক্ষা,দীক্ষা-জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির চর্চা করে সাবলম্বী হওয়া ছাড়া ফিলিস্তিনির জনগণের হাতে কোন বিকল্প নেই। সামরিক দিক দিয়ে সক্ষমতার বিচারে মুসলিম দেশগুলো সবগুলো একসাথে হলেও ইজরাইলের সাথে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা নেই তাদের। কারণ অত্যাধুনিক প্রযুক্তি,মারণাস্ত্র সবকিছু ইজরায়েলের হাতে… মারণাস্ত্রের ঝনঝনানির এই লড়াইয়ে ফিলিস্তিনি জনগণ ইজরায়েলের কাছে কোন গুরুত্ব রাখেনা,স্রেফ খড়কুটো!মুসলিম দেশগুলোর উচিৎ হামাস বা ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র কিংবা মারণাস্ত্র কেনার জন্য অর্থায়ন না করে ফিলিস্তিনিদের শিক্ষা,গবেষণাও স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন করা। বাস্তবতা অনুধাবন না করলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী মারা যাবে কোন ফায়দা হবেনা।

আল্লাহ কুরআনে এই নিয়ে অনেক আগেই বলে দিয়েছেন
“আল্লাহ অবশ্যই কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজের অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে” সূরা হৃদ -১১



জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে বশ মানানোর আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনিদের হাতে কোন বিকল্প নেই ,এটা ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেও যেমন প্রযোজ্য পুরো বিশ্বের মুসলমানদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইসলামের স্বর্ণযুগের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ইসলাম পুরো বিশ্বে তখনই রাজত্ব করেছে যখন জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় তারা পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতাকে পেছনে ফেলেছে।সেজন্য এক হাজার বছর পৃথিবীব্যাপী একচেটিয়া রাজত্ব করতে পেরেছে।বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা নেই তাই সারা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ক্রমাগত শোষিত এবং অত্যাচারিত হচ্ছে…. কারণ জ্ঞান বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে যারা এগিয়ে তারাই পৃথিবী শাসন করে,এটাই পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।

ফিলিস্তিনি কেন সারা বিশ্বেই মুসলমানরা কয়েক ভাগে বিভক্ত,ফিলিস্তিনি জনগণকে বাঁচানোর সদিচ্ছা থাকলে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। প্রযুক্তি,জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার সাথে ঐক্যবদ্ধ না হলে অতলে হারিয়ে যেতে হবে কারণ আল্লাহ বলেই দিয়েছেন কুরআনে “আল্লাহ অবশ্যই কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজের অবস্থা নিজে পরিবর্তন করে”

বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা করলে সহজেই অনুধাবন করা যায় ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন ঘটবেনা খুব শীঘ্রই।ফিলিস্তিনিদের রক্ষার জন্য আল্লাহর অসীম কৃপা কিংবা অলৌকিক ঘটনা ঘটা লাগবে,এই ছাড়া ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেছে ।