প্রভাবশালী মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক



মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরাইলের সম্পর্কের একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।সেখানে বলা আছে” যুক্তরাষ্ট্র সর্বপ্রথম ১৯৪৮ সালে ইজরাইলকে এবং ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইজরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। সেখানে আরো বলা আছে “ইজরায়েলের আমেরিকার চাইতে আর কোন বড় মিত্র নেই”। বর্তমানে ইজরাইলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যেরূপ সম্পর্ক ঠিক প্রায় সেরকম সম্পর্ক বিদ্যমান ইজরায়েলের সাথে মুসলিম অধ্যুষিত প্রভাবশালী দেশগুলোর । প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলোর সাথে ইজরায়েলের সম্পর্কের স্বরূপ না জানলে বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের দুরাবস্থার কারণ অবলোকন করা দুরূহ হবে।



আসুন জেনে নেই বর্তমানে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর ইজরায়েলের কিরূপ সম্পর্ক বিদ্যমান…

তুরস্ক এবং ইজরাইলের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বছরে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইজরাইল হচ্ছে তুরস্কের চতুর্থ সর্বোচ্চ বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। করোনায় বিশ্বের অনেক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কে ছেদ পড়লেও ইজরায়েল তুরস্কের সম্পর্কের আরো উন্নতি হয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে তুরস্ক থেকে ইজরায়েল অস্ত্র বানানোর জন্য জ্বালানী, রাসায়নিক,লোহা এবং ইস্পাত,নিত্য প্রয়োজনীয় মেশিনারি প্লাস্টিক,সিমেন্ট এবং বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে। অর্থাৎ ফিলিস্তিনে ছোড়া রকেট গুলোর বেশীরভাগ তুরস্কের পাঠানো লোহা ইস্পাত ব্যাবহার করে তৈরি।

হ্যাঁ ফিলিস্তিনিতে ইজরাইলের অনবরত হামলা সত্ত্বেও তুরস্ক ইজরাইলের সাথে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আগের মতোই রেখেছে।



মিশরের সাথে ইজরায়েলের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে মিশর ইজরায়েলে প্রধান রপ্তানি পণ্য তেল ছাড়াও রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক সামগ্রী বিক্রি করে থাকে। কৃষিজ খাদ্যপণ্য ও রপ্তানি করে থাকে মিশর ইজরায়েলে।ইজরায়েল মিশরের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ন ব্যাবসায়িক মিত্র। ২০১৮ সালে ইজরায়েল মিসরে গ্যাস রপ্তানির জন্য ১৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে দশ বছরের জন্য । ২০০৪ সালে টেক্সটাইল পণ্য রপ্তানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাবস্থাপনায় মিসরে ইজরায়েল এবং মিশরের জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে মিশরের টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি কয়েক বিলিয়ন ডলারের ,আর এই পণ্যের অর্ধেকের বেশি যায় যুক্তরাষ্ট্রে যা করের আওতামুক্ত। বছরে প্রায় ৬০০$ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে মিশর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলে। মিশরের এই টেক্সটাইল খাত টিকে আছে ইজরাইলের পাঠানো গ্যাস এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির টেক্সটাইল যন্ত্রপাতির সাহায্যে।

সোর্স: trade Economics


অর্থাৎ মিশরের অর্থনীতিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে ইজরায়েলের। মিশরের পোশাক শিল্পে ইজরাইলি যে গুরুত্বপূর্ন অবদান তেমনি ইজরাইলের অস্ত্র কারখানাগুলোর অন্যতম প্রধান রাসয়নিক সরবারহকারী দেশ মিশর।এছাড়া মিশর অত্যাধুনিক সকল অস্ত্রশস্ত্র ইজরাইল থেকেই কিনে,উভয় দেশের সামরিক সম্পর্ক অসাধারণ।

হ্যাঁ ফিলিস্তিনিতে ইজরাইলের অনবরত হামলা সত্ত্বেও মিশর ইজরাইলের সাথে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আগের মতোই রেখেছে।

মুসলিম বিশ্বে ইজরায়েলের সবচেয়ে আস্থার নাম জর্ডান । ইজরায়েল জর্ডানের অন্যতম প্রধান ব্যাবসায়িক মিত্র। বছরে ৪০০$ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান উভয় দেশের মধ্যে। জর্ডানের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে সিংহভাগ রাসায়নিক ,প্লাস্টিক ধাতু , আইসোটপ , টেক্সটাইল এবং খাদ্য সামগ্রী। ইজরাইল ও জর্ডানে অস্ত্র, কৃষিজাত পণ্য এবং কাগজ রপ্তানি করে থাকে।বর্তমানে জেরুজালেমের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘ জর্ডানকে পরিদর্শক হিসেবে রেখেছে।মূলত জর্ডানকে পরিদর্শকের দায়িত্ব দিয়েছে ইজরায়েল।

এছাড়া জর্ডানে প্রায় ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলারের খনিজ সম্পদ ( তেল ,গ্যাস) আছে। এগুলো উত্তলোনের জন্য ইজরায়েল হচ্ছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দেশ। জর্ডানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১ বিলিয়ন সোলার প্রজেক্ট সম্পন্ন করার দায়িত্ব ইজরায়েলের হাতে পড়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকার কারণে জর্ডানের হাতে ইজরায়েল ছাড়া অন্য কোন বিকল্প হাতে নেই।

হ্যাঁ ফিলিস্তিনিতে ইজরাইলের অনবরত হামলা সত্ত্বেও জর্ডান ইজরাইলের সাথে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আগের মতোই রেখেছে। এছাড়া জর্ডানের কোন উপায়ও নেই…

মধ্যপ্রাচ্যে ইজরাইলের অন্যতম প্রধান ঘনিষ্ঠ মিত্র আরব আমিরাত। করোনার মধ্যেও ইজরায়েল- আরব আমিরাতের সাথে ২৫০$ মিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। তবে আরব আমিরাত এই ক্ষেত্রে আমদানি করে সকল পণ্য ইজরায়েল থেকে। ইলেকট্রনিক্স ,মিলিটারি, মেডিকেল সামগ্রী কিনে থাকে আরব আমিরাত ইজরায়েল থেকে। খাদ্যপণ্য এবং নির্মাণ সামগ্রীও কিনে থাকে আরব আমিরাত। ইজরায়েলের গোয়েন্দা মন্ত্রী এলি কোহেন সম্প্রতি বিবিসি রেডিওতে এক সাক্ষাৎকারে বলেন” আগামী ৩-৫ বছরের মধ্যে ইজরাইলের সাথে আরব আমিরাতের ব্যাবসার পরিধি চার বিলিয়ন ডলারে পৌঁছুবে”।আরব আমিরাত থেকে মূলত তেল আমদানির লক্ষ্য ইজরায়েলের।



আজারবাইজানের সাথে ইজরায়েলের বাৎসরিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২$ বিলিয়ন ডলারের অধিক। আজারবাইন ইজরাইলে জৈব রাসায়নিক এবং খনিজ পদার্থ( তেল ,গ্যাস,লোহা,ইস্পাত) রপ্তানি করে। করোনার প্রকোপে প্রায় গত বছর ৪৫০ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি বাণিজ্য হলেও আগের বছর গুলোয় ইজরাইলের সাথে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের অধিক মুদ্রার বাণিজ্য হতো আজারবাইজানের সাথে। ইজরাইলে অন্যতম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ হচ্ছে আজারবাইজান। ইজরাইল আজারবাইজানকে অস্ত্র ,মেডিকেল এবং প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সহায়তা করে।আজারবাইজানের অস্ত্রের মোট ৭০% সরবারহ করে ইজরায়েল।

মালয়েশিয়া ইজরাইলের একসময়কার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক মিত্র। ২০১৬-১৭ সাল পর্যন্ত বছরে ১.৪-১.৫ বিলিয়ন ডলারের অধিক আমদানি রপ্তানি হতো ইজরায়েল এবং মালয়েশিয়া মধ্যে।কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে এর মধ্যে এই বাণিজ্যিক সম্পর্কে স্থবিরতা চলে আসে। মূলত মালয়েশিয়া ইজরায়েল থেকে প্রযুক্তি খাতে সহয়তা নিতো… বর্তমানে উভয় দেশের মধ্যে শেষ চার বছর ধরে আমদানি রপ্তানির হার খুবই কম।



মরক্কো,পাকিস্তান ইজরায়েল থেকে রাডার ,নজরদারিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ক্রয় করে থাকে।সৌদী আরবের অফিসিয়ালি ইজরায়েলের সাথে কোন সম্পর্ক নেই যদিও।কিন্তু সৌদি আরবের মিলিটারি এবং সার্ভিলেন্স ইকুইপমেন্টের বেশিরভাগ ইজরাইলের প্রতিষ্ঠানের। যদিও বর্তমানে ইজরায়েল এবং সৌদীর মধ্যে দহরম মহরম চলছে।
সিরিয়া,কাতার ,ইরানের সাথে ইজরায়েলের কোন কূটনীতিক সম্পর্ক নেই কিন্তু থার্ড পার্টির মাধ্যমে ইজরায়েলে তৈরি অস্ত্র এবং নজরদারিতে ব্যবহৃত ডিভাইস কিনে থাকে তারা নিজের দেশের নাগরিকদের উপর নজরদারি করার জন্য।

মিশর,তুরষ্ক,জর্ডান,আজরবাইজান ইজরাইলের কাছে অস্ত্র তৈরির জন্য রাসায়নিক এবং ধাতব পদার্থ বিক্রি করে।এগুলো ব্যবহার করে ইজরায়েল মরণঘাতী অস্ত্র তৈরি করে। সেগুলো নিরীহ ফিলিস্তিনিদের উপর নিক্ষেপ করে এবং মুসলিম দেশগুলোর কাছে বিক্রি করে।বাংলাদেশ সহ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রায় ৩০ টি দেশ ইজরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করেনা।কিন্তু এতে ইজরায়েলের কিছু আসে যায় না…কারণ যারা ইজরায়েলের অস্তিত্ব স্বীকার করেনা তাদের গন্ডি সীমাবদ্ধ এবং ইজরায়েলের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য বিবৃতি দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাদের।

মুসলিম দেশগুলোর কাঁচামাল,খনিজ সম্পদ ব্যবহার করে ইজরাইল অস্ত্র বানায় এবং তাদের পাঠানো খাদ্যসামগ্রী কিনে ইজরাইল টিকে আছে। ইজরাইলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে তুরস্ক,মিশর,জর্ডান কিংবা আজারবাইজান লাভবান হচ্ছে অনেক দিক দিয়ে।তার উপর এসকল দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নেই। অর্থনীতিতে ভারসাম্যের জন্য এবং দেশের মানুষকে খাওয়ানো,পরানো কিংবা নিরাপত্তার জন্য এসকল মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলো পুরোপুরি ইজরাইলের উপর নির্ভরশীল।

অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিলে পুরো ফিলিস্তিনিকে গুড়িয়ে দিলেও কোন প্রভাবশালী মুসলিম দেশ কোন পদক্ষেপ নিবেনা শুধুমাত্র বিবৃতি দিয়েই সটকে পড়বে। জাতিসংঘের ১৯৪ টি সদস্য দেশের মধ্যে ১৬৭ টি দেশ ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মিশর, তুরষ্ক,আরব আমিরাত, আজারবাইজান, তিউনিশিয়ার সাথে ইজরাইলের সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে।সৌদি আরব,ইয়েমেন,লিবিয়া,সুদান, মরক্কো,লেবানন,বাহারাইন,ওমানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পথে আছে ইজরায়েল। কাতারের সাথে ১৯৯০-২০১০ পর্যন্ত ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল, আড়ালে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল ।পরে হামাসমুখী হয়ে যায় কাতার , ফলে পুরোপুরি ইজরায়েলকে বর্জন করে কাতার। গত দশ বছরে ফিলিস্তিনিদের জন্য ৪০০ মিলিয়ন ডলারের অধিক সহায়তা দিয়েছে কাতার যার সিংহভাগ পেয়েছে হামাস। তবে বর্তমানে কাতারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে ইজরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

ইরান ইজরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে পরে অবশ্য প্রত্যাহার করে নেয় এই স্বীকৃতি। প্রভাবশালী দেশের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের জন্য যাদের মন কাঁদার কথা সেসকল প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই,আপনার আমার প্রতিবাদ ফিলিস্তিনীদের কোন উপকারেই আসবে না…….



প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো যদি ইজরায়েলকে ব্যবসায়িক,অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বর্জন করতে পরে তখন ইজরায়েল বেকায়দায় পড়বে!কিন্তু বর্তমান বিশ্বে কেউই নিজের অর্থনীতিকে বেকায়দায় ফেলবেনা কারণ প্রায় প্রত্যেক সেক্টরে ইজরাইলের অত্যাধিক সক্ষমতা। তাই টু স্টেটস সলুশন ছাড়া ফিলিস্তিনিদের কোন গতি নেই। যত দেরি হবে মধ্যস্থতা করতে তত লাভ ইজরাইলের। তাড়াতাড়ি সীমান্ত নির্ধারণ করে দুটি আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণা করলে ইজরাইল গাজা,পশ্চিম তীর এবং জেরুজালেমে ভূমি অধিগ্রহণে নিবৃত্ত হবে….. তবে সেটা অতি শ্রীঘ্রই হচ্ছেনা হলফ করে বলা যায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের নির্লিপ্ততা ,অন্যদিকে মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ফিলিস্তিনিদের আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে।